বিজ্ঞাপন

ভুক্তভোগী শিবির নেতা

‘হাঁটুতে বন্দুকের নলের স্পর্শ পাই, আমার পায়েও গুলি করা হয়’

‘হাঁটুতে বন্দুকের নলের স্পর্শ পাই, আমার পায়েও গুলি করা হয়’

চোখ বাঁধা আর হাতে হাতকড়া। চারপাশের নিস্তব্ধতায় শুধু পুলিশের কণ্ঠস্বর। কানে ভেসে আসে গুলির শব্দ। হঠাৎ পাশ থেকে ‘মাগো বলা বন্ধুর আর্তচিৎকার। কয়েক সেকেন্ড পর নিজের হাঁটুতেও ঠেকে বন্দুকের নল। এরপর বিকট শব্দ। রক্তে ভেসে যায় পা। সেই রাতেই শেষ হয়ে যায় স্বাভাবিক জীবনের পথচলা। প্রায় এক দশক পর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দাঁড়িয়ে সেই বিভীষিকাময় বর্ণনা দিতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন মো. ইসরাফিল হোসেন।

যশোরের চৌগাছায় গ্রেপ্তারের পর বন্দুকযুদ্ধের নাটক সাজিয়ে ছাত্রশিবিরের দুই নেতাকে গুলির ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় তৎকালীন এসপি আনিসুর রহমানসহ আটজনের বিরুদ্ধে সাক্ষ্যগ্রহণের দিন ধার্য ছিল মঙ্গলবার (১৬ জুন)। এদিন প্রথম সাক্ষী হিসেবে ভুক্তভোগী ইসরাফিলের জবানবন্দি রেকর্ড করেন ট্রাইব্যুনাল-১।

২৯ বছর বয়সী ইসরাফিল বর্তমানে যশোর শহরে ইবনে সিনা হাসপাতালে পাবলিক রিলেশন অফিসার হিসবে কর্মরত রয়েছেন। ২০১৬ সালে পুলিশের গুলিতে নিজের একটি পা হারান এই যুবক।

জবানবন্দিতে ইসরাফিল বলেন, ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ সরকার আসার পর ক্ষমতা চিরস্থায়ী করতে বিএনপি, জামায়াত-শিবিরসহ ভিন্নমতের লোকদের তুলে নিতেন পুলিশ, র‍্যাব ও গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা। এরপর গুম-খুন ও ক্রসফায়ারের নাটক সাজিয়ে পায়ে গুলি চালিয়ে চিরতরে পঙ্গু করে দেওয়া হতো। ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের এসব কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে আমরা আন্দোলন গড়ে তুলি। ২০১৪ সাল থেকে আমি এ আন্দোলনে অংশ নিই। তখন বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির যশোরের চৌগাছা থানার সেক্রেটারি ছিলাম।

আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীরা অনেকবার তার বাসায় হামলা করেছে উল্লেখ করে সাক্ষী বলেন, পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কয়েকবার আমার বাড়িতে গিয়েছিল। আমাকে না পেয়ে পরিবারের লোকজনের কাছে গুম ও ক্রসফায়ার করে হত্যার হুমকি দিয়েছিলেন তারা। ২০১৬ সালের জানুয়ারিতে নিরাপত্তাহীনতার কারণে যশোর শহরের একটি মেসে আশ্রয় নিই। কিন্তু সেই মেসেও পুলিশ তল্লাশি চালিয়ে আমাকে না পেয়ে মেসের আরেকজন সদস্যকে আটক করে।

ইসরাফিল বলেন, ২০১৬ সালের ৩ আগস্ট দুপুরের পরে সাংগঠনিক কাজ শেষে মোটরসাইকেলে যশোর শহর থেকে চৌগাছা থানার নারায়ণপুর গ্রামের উদ্দেশে রওনা দেই আমি ও আমার বন্ধু ছাত্রশিবিরের থানা সাহিত্য সম্পাদক রুহুল আমিন। বিকেল সাড়ে চারটার দিকে চৌগাছা থানার বন্দলিতলা গ্রামের শফি মল্লিকের ইটের ভাটার কাছে পৌঁছাতেই আমাদের পথ আটকায় পুলিশ। তারা আগে থেকেই ওত পেতে ছিল। আমাদের থামিয়েই পুলিশ সদস্যরা বলেন, ‘তোদের অনেকদিন ধরে খুঁজছি’। একপর্যায়ে আমাদের সঙ্গে থাকা ব্যাগ তল্লাশি চালিয়ে বাইতুলমাল আদায়ের একটি রশিদ বই ও দলীয় কয়েকটি বই পান। পরে তারা আমাদের থানায় নিয়ে যান।

তিনি বলেন, আটককারীদের মধ্যে এসআই মোখলেস, এএসআই মাজেদ ও এএসআই সিরাজুল ইসলামকে আমি চিনতে পারি। এর মধ্যে সিরাজুল ছাড়া বাকিরা সাদা পোশাকে ছিলেন। তারা আমাদের রাত ১১টা পর্যন্ত থানা হাজতে রাখেন। এরপর ওসি মশিউর রহমানের কক্ষে নেওয়া হয়। সেখানে চর-থাপ্পড়, কিল-ঘুষিসহ বুট দিয়ে লাথি ও লাঠি দিয়ে মারধর করা হয়। নির্যাতনের একপর্যায়ে আমরা অজ্ঞান হয়ে যাই। জ্ঞান ফিরলে ভিডিও কলে এসপি আনিসুর রহমানকে আমাদের দেখান ওসি মশিউর। তিনি তাকে বলেন, ‘স্যার আপনার নির্দেশনামতে এই দুজনকে গ্রেপ্তার করেছি’। তখন এসপি আনিসুর বলেন, ‘সকালে আমার কাছে পাঠিয়ে দাও’।

সাক্ষী উল্লেখ করেন, নির্যাতনের একপর্যায়ে ওসিকে এসআই আকিকুল বলেন, ‘স্যার এদের ব্রেনওয়াশ করা। এরা কিছু বলবে না। এদের গুলি করে দেন’। মূলত সরকারবিরোধী আন্দোলনে কারা কারা আমাদের সঙ্গে জড়িত তারা তা জানতে চেয়েছিলেন। রাত ১২টা থেকে সাড়ে ১২টার দিকে আমাদের পুনরায় হাজতখানায় নেওয়া হয়। পরদিন সকালে আমাদের পরিবারের লোকজন ও সাংবাদিকরা থানায় এলে সাক্ষাৎ করতে দেওয়া হয়নি। পরে এসআই আকিকুলের নেতৃত্বে যশোর ডিবি অফিসে আমাদের নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে ডিবির একজন সদস্য আমাদের বলেছিলেন, ‘রাতে তোদের ক্রসফায়ার দেওয়ার জন্য এসপির নির্দেশ আছে।’

শিবিরের এই নেতা বলেন, ৪ আগস্ট সন্ধ্যার পর এসআই আকিকুলের নেতৃত্বে ডিবি অফিস থেকে আমাদের নিয়ে চৌগাছা থানার উদ্দেশ্যে রওনা দেওয়া হয়। পথে রাত সাড়ে ৯টায় আমাদের হাতে হাতকড়া ও গামছা দিয়ে চোখ বেঁধে দেন তারা। তখন নিজেরা বলাবলি করছিলেন, আমাদের বন্দলিতলা মাঠে নিয়ে যাবে। ওই মাঠের পাশে তোতা মিয়ার বাড়ির সামনে আমাদের গাড়ি থেকে নামানো হয়। একইসঙ্গে রাস্তার পাশে দাঁড় করানো হয়। সেখানে আমরা গুলির শব্দ পাই। তখন একজন বলেন, ‘ফায়ার অফ’। কণ্ঠ শুনে বুঝতে পারি তিনি ছিলেন ওসি মশিউর। ভাবলাম আমাদের গুলি করা হবে না। এর অল্প কিছুক্ষণ পর ওসি মশিউর বললেন, সাজ্জাদ, জহুরুল ‘ফায়ার’। সঙ্গে সঙ্গে একটি বিকট শব্দ হয়। আমার বন্ধু রুহুল আমিন ওমাগো বলে চিৎকার করে ওঠেন। তখন আমি বুঝতে পারি তাকে গুলি করা হয়েছে। কিছুক্ষণ পর আমিও নিজের বাঁ পায়ের হাঁটুতে বন্দুকের নলের স্পর্শ পাই। বিকট শব্দে আমার পায়েও গুলি করা হয়। এ পর্যায়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন সাক্ষী ইসরাফিল।

তিনি আরও বলেন, গুলি করার পর আমি পড়ে যাই। তখন পুলিশ সদস্যরা আমার হাতের হাতকড়া ও চোখের বাঁধন খুলে দেন। এ ছাড়া, আমার ক্ষতস্থানে কিছু ধুলাবালি মেখে গামছা দিয়ে বেঁধে দেন তারা। আমি চোখ খুলে দেখি, পাশে পড়ে রয়েছেন রুহুল আমিন। তার পায়েও গুলি করা হয়েছে। ঘটনাস্থলে ওসি মশিউর, এসআই আকিকুল, এএসআই মাজেদ, কনস্টেবল জহুরুল ও সাজ্জাদকে দেখতে পাই। পুলিশের বেশ কিছু গাড়ি ছিল। আশপাশে অনেক লোকজন ছিলেন। পুলিশই নিজেদের গাড়িতে করে আমাদের চৌগাছা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যায়। প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে যশোর সদর হাসপাতালে নেওয়া হয়। তবে দুদিন আমাদের কোনো ধরনের চিকিৎসা দেওয়া হয়নি।

ইসরাফিল বলেন, ক্ষতস্থানে বালু দেওয়ার কারণে ইনফেকশন হলে আমাদের উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা পঙ্গু হাসপাতালে পাঠানো হয়। পঙ্গু হাসপাতালে ১৫ দিন চিকিৎসার পর পায়ে পচন ধরে যায়। ফলে আমার বাঁ পা হাঁটুর ওপর থেকে কেটে ফেলা হয়। সেখানে আমরা পুলিশি পাহারায় প্রায় দেড় মাস চিকিৎসা নেই। চিকিৎসা শেষে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র দিলে আমাদের গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠায় পুলিশ। এরপর দুজনকেই কারাগারে পাঠান আদালত। আমাদের বিরুদ্ধে অস্ত্র আইনে একটি ও বিস্ফোরক দ্রব্য আইনে একটি মিথ্যা মামলা করে পুলিশ। তবে ৩৩ দিন পর আমরা জামিনে মুক্ত হই।

নিজের সঙ্গে ঘটে যাওয়া পুরো ঘটনার জন্য এসপি আনিসুর রহমান, ওসি মশিউর রহমান, এসআই আকিকুল ইসলাম, এএসআই মাজেদ, কনস্টেবল সাজ্জাদ ও কনস্টেবল জহুরুল হকের শাস্তি চান ভুক্তভোগী ইসরাফিল।

ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানি করেন প্রসিকিউটর আবদুস সাত্তার পালোয়ান। সঙ্গে ছিলেন প্রসিকিউটর মঈনুল করিম, মামুনুর রশিদ ও তারেক আবদুল্লাহসহ অন্যরা।

এদিন ট্রাইব্যুনালের বিচারকার্যের দ্বিতীয়ার্ধে এ মামলায় প্রথমে সূচনা বক্তব্য উপস্থাপন করে প্রসিকিউশন। এরপর শুরু হয় সাক্ষ্যগ্রহণ। পরবর্তী সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য আগামী ২৫ জুন দিন ধার্য করেছেন ট্রাইব্যুনাল।

বর্তমানে গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে রয়েছেন চৌগাছা থানার তৎকালীন এসআই আকিকুল ইসলাম, কনস্টেবল সাজ্জাদুর রহমান ও কনস্টেবল জহরুল হক।

পলাতকরা হলেন— তৎকালীন এসপি আনিসুর রহমান, চৌগাছা থানার তৎকালীন ওসি মশিউর রহমান, এসআই মোখলেছ, এসআই জামাল ও এসআই মাজেদুল।

গত ২০ এপ্রিল আট আসামির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ (ফরমাল চার্জ) গঠনের মাধ্যমে বিচার শুরুর আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল।

এমআরআর/এসএএস/জেডএস