বরিশালের আগৈলঝাড়ায় ক্রসফায়ারে ছাত্রদল নেতাসহ দুজনকে হত্যার ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলায় বিস্ফোরক জবানবন্দি দিয়েছেন পুলিশ কর্মকর্তা অসীম কুমার সিকদার। তার দাবি, ওই দুই নেতাকে ‘ক্রসফায়ার’ দিতে তাকে নির্দেশ দিয়েছিলেন তৎকালীন পুলিশ সুপার এহসান উল্লাহ। তবে তিনি অস্বীকৃতি জানিয়ে বলেছিলেন, ‘চাকরি ছেড়ে দিতে রাজি আছি। কিন্তু এ কাজ করতে পারব না’।
বুধবার (১৭ জুন) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন বিচারিক প্যানেলে অসীম কুমারের জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়।
এ মামলায় মোট আসামি চারজন। এর মধ্যে গ্রেপ্তার রয়েছেন উজিরপুর থানার সাবেক এএসআই মো. মাহাবুল ইসলাম ও এএসআই জসিম উদ্দিন।
পলাতকরা হলেন- বরিশাল-১ আসনের সাবেক এমপি আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ ও বরিশালের সাবেক পুলিশ সুপার (এসপি) এহসান উল্লাহ।
অসীম কুমারের বর্তমান বয়স ৪৮ বছর। বর্তমানে বরিশাল সদর নৌ-থানায় অফিসার ইনচার্জ (পুলিশ পরিদর্শক) হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। ২০১৪ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর থেকে ২০১৫ সালের ১২ মে পর্যন্ত বরিশালের আগৈলঝাড়া থানায় এসআই হিসেবে কর্মরত ছিলেন তিনি।
জবানবন্দিতে অসীম কুমার বলেন, ২০১৫ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি আগৈলঝাড়া থানার দক্ষিণ শিহিপাশা এলাকার আগৈলঝাড়া-গৌড়নদী মহাসড়কে আমার দায়িত্ব ছিল। ৯ ফেব্রুয়ারি দায়িত্বে থাকাকালীন রাত ১টা ৩৫ মিনিটে আগৈলঝাড়া থানার অফিসার ইনচার্জ মনিরুল ইসলামের মাধ্যমে জানতে পারি যে, আগৈলঝাড়া থানাধীন বুধার সাকিনের বাইপাস মহাসড়কে কে বা কারা একটি পিকআপভ্যানে আগুন দিয়েছেন। এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য ঘটনাস্থলে যেতে বলা হয়। সঙ্গীয় ফোর্সসহ পুলিশভ্যানে রাত ১টা ৪৫ মিনিটে পৌঁছাই। সেখানে একটি ফলবাহী পিকআপে আগুন জ্বলতে দেখতে পাই। তখন পিকআপভ্যানের মালিক, চালক, ফলের মালিক ও স্থানীয় লোকজন নিয়ে রাস্তার পাশের ডোবা থেকে পানি দিয়ে আগুন নেভানোর চেষ্টা করি। এর মধ্যেই গৌরনদী থানা থেকে ফায়ার সার্ভিস এসে রাত ২টার সময় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে।
পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, আগুন নেভানোর পর ফলের মালিক, পিকআপের মালিক ও চালকদের খুঁজে পাইনি। ঘটনার বিস্তারিত ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানানো হয়। এরপর দায়িত্ব পালন শেষে থানায় গেলে অফিসার ইনচার্জ বলেন যে, ‘আগুনের ঘটনায় কোনো বাদি নেই। ওই এলাকায় রাত্রীকালিন দায়িত্বে ছিলেন বিধায় আপনাকেই বাদি হয়ে মামলা করতে হবে’। বরিশাল জেলার তৎকালীন পুলিশ সুপার এহসান উল্লাহর নির্দেশে নিজেদের মনমতো কম্পিউটারে একটি এজাহার লিখে আমাকে স্বাক্ষর করতে বলেন অফিসার ইনচার্জ (ওসি)। তখন বাধ্য হয়েই সেই এজাহারে স্বাক্ষর করি। ওই এজাহার ভিত্তিতে আগৈলঝাড়া থানায় বিশেষ ক্ষমতা আইনে মামলা রুজু হয়। মামলার তদন্তভার দেওয়া হয় এসআই নজরুল ইসলামকে।
তিনি আরও বলেন, মামলা হওয়ার পরপরই আসামিদের ধরতে থানা পুলিশের ওপর চাপ দিতে থাকেন পুলিশ সুপার। একপর্যায়ে ১২ ফেব্রুয়ারি এসপির নির্দেশে আসামি ধরতে ঢাকায় যান এসআই নজরুল। ২০ ফেব্রুয়ারি আগৈলঝাড়া থানায় আসেন এসপি এহসান উল্লাহ। এরপর ওসির কক্ষে আমাকে ডেকে নেন তিনি। তখন আমাকে উদ্দেশ করে এসপি বলেন- 'অগ্নিকাণ্ডের মামলায় ঢাকা থেকে দুজন আসামি গ্রেপ্তার করেছেন এসআই নজরুল। আসামিদের নিয়ে আসা হচ্ছে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশ আছে, তাদের ক্রসফায়ার দিতে হবে। এ কাজ তোমাকেই করতে হবে'। তখন আমি বলি যে, 'স্যার আমি চাকরি ছেড়ে দিতে রাজি আছি। কিন্তু এ কাজ করতে পারব না। আমাকে দিয়ে জোর করে কেউ করাতেও পারবে না'। তখন পুলিশ সুপার এহসান উল্লাহ চিৎকার দিয়ে বলে ওঠেন- ‘শালা বাইনচোদ, কীভাবে চাকরি করিস, দেখে নেব। প্রমোশন কোনোদিনও হবে না। এসিআর এর বারোটা বাজিয়ে দেবো'।
এই পুলিশ কর্মকর্তার দাবি, এ ঘটনার আগেও বরিশালসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ক্রসফায়ারে হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। যা বিচারবহির্ভূত ছিল। এ বিষয়ে আমি পত্রপত্রিকাসহ বিভিন্ন মাধ্যমে জানতে পেরেছি বিধায় এমন ঘটনাকে প্রচণ্ড ঘৃণা করতাম। এজন্যই পুলিশ সুপারের অবৈধ নির্দেশের বিরুদ্ধে আমি কঠোর প্রতিবাদ করি। এরপর আমাকে আজেবাজে বিভিন্ন ভাষায় গালিগালাজ করে অফিসার ইনচার্জের কক্ষ থেকে বের করে দেন পুলিশ সুপার। এরপর জানতে পারি, এভাবে আগৈলঝাড়া থানার সব অফিসারকে ডেকে নিয়ে একই প্রস্তাব দেন তিনি। কিন্তু কেউ তার প্রস্তাবে রাজি হননি। এতে ভীষণ ক্ষুব্ধ হয়ে অফিসার ইনচার্জকে তিনি বলেন যে- 'থানার ডিউটি অফিসার ও সেন্ট্রি ব্যতিত কেউ থানায় থাকবে না। সবাইকে ডিউটিতে পাঠিয়ে দাও'।
সাক্ষ্যে অসীম কুমার বলেন, অফিসার ইনচার্জের নির্দেশে ২১ ফেব্রুয়ারি রাত ১টার দিকে আগৈলঝাড়া থানার উত্তর দিকে বাইপাস ব্রিজে দায়িত্বে ছিলাম। এরপর সেখানে আগৈলঝাড়া থানার এসআই মোস্তাফিজ ও এসআই মনোরঞ্জন আমার কাছে আসেন। আমরা তিনজনসহ আরও কয়েকজন ফোর্স উপস্থিত ছিলাম। রাত ২টার দিকে আমাদের অতিক্রম করে বুধার এলাকার দিকে যাচ্ছিল পুলিশ সুপারের গাড়ি। পেছনে একটি মাইক্রোবাসও ছিল। রাত সোয়া ২টায় বাইপাস ব্রিজ থেকে আধা কিলোমিটার পশ্চিম-দক্ষিণ থেকে কয়েক রাউন্ড গুলির শব্দ শুনতে পাই আমরা। আগুনের শিখার মতো কিছু একটা দেখতে পাই। শেষ রাতের দিকে আমি থানায় ফিরে আসি।
জবানবন্দিতে তিনি আরও উল্লেখ করেন, ২২ ফেব্রুয়ারি সকালে অফিসার ইনচার্জ মনিরুল বলেন যে, 'রাত সোয়া ২টার দিকে গ্রেপ্তার আগৈলঝাড়া উপজেলা ছাত্রদলের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক টিপু হাওলাদার ও উপজেলা জাতীয়তাবাদী সামাজিক সাংস্কৃতিক সংস্থার সাংগঠনিক সম্পাদক কবির মোল্লাকে ক্রসফায়ারে দেওয়া হয়েছে। আমাদের আগৈলঝাড়া থানার কেউ এ কাজে রাজি না হওয়ায় উজিরপুর থানা থেকে এএসআই মাহবুল ও এএসআই জসিমকে নিয়ে আসেন পুলিশ সুপার এহসান উল্লাহ। এরপর সকালে নিহতদের সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুত করে শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়। ময়নাতদন্ত শেষে তাদের লাশ আত্মীয়-স্বজনের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
এদিন এ মামলায় সূচনা বক্তব্য উপস্থাপন করেন প্রসিকিউটর সহিদুল ইসলাম সরদার। সাক্ষ্যগ্রহণের সময় শুনানি করেন প্রসিকিউটর তাসমিরুল ইসলাম।
এমআরআর/বিআরইউ
