বিজ্ঞাপন

‘ওরা সাহসী, তোরা ভীতু’—অন্য থানার পুলিশ এনে ক্রসফায়ার দিয়ে বললেন এসপি

‘ওরা সাহসী, তোরা ভীতু’—অন্য থানার পুলিশ এনে ক্রসফায়ার দিয়ে বললেন এসপি

আওয়ামী লীগের শাসনামলে বরিশালের আগৈলঝাড়ায় ক্রসফায়ারে দ্বৈত হত্যাকাণ্ডে বেরিয়ে আসছে নতুন সব তথ্য। নিজেদের সাক্ষ্যে বিস্ফোরক এসব বর্ণনা তুলে ধরছেন সাক্ষীরা। এবার আরেক পুলিশ কর্মকর্তা দাবি করেছেন, গ্রেপ্তারের পর দুই আসামিকে থানায় না এনে ডিবির কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরে তাদের ক্রসফায়ারে দিয়ে হত্যা করা হয়। আর এ পুরো কাজটিই করিয়েছেন পুলিশ সুপার। সংশ্লিষ্ট থানার কেউ না করায় উজিরপুর থেকে পুলিশ এনে কাজটি করানো হয়।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দেওয়া জবানবন্দিতে এমনই তথ্য দেন মো. নজরুল ইসলাম মজুমদার।

বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) তার জবানবন্দি রেকর্ড করেন ট্রাইব্যুনাল-২ এর সদস্য বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীরের একক বেঞ্চ।

পুলিশ কর্মকর্তা নজরুল বরিশালের আগৈলঝাড়ায় ক্রসফায়ারে ছাত্রদল নেতাসহ দুজনকে হত্যার ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলার দুই নম্বর সাক্ষী। এ মামলায় মোট আসামি চারজন।

৪৭ বছর বয়সী নজরুলের বাড়ি পটুয়াখালী। বর্তমানে ভোলার চরফ্যাশনে পুলিশ পরিদর্শক (নিরস্ত্র) হিসেবে কর্মরত রয়েছেন তিনি। তবে ২০১৪ সালের ২২ জুন থেকে ২০১৫ সালের ৩০ আগস্ট পর্যন্ত আগৈলঝাড়া থানায় এসআই হিসেবে কর্মরত ছিলেন।

সাক্ষ্যে নজরুল জানান, ২০১৫ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি সাতক্ষীরা থেকে বরিশালের উদ্দেশে ছেড়ে আসে ফলবাহী একটি পিকআপভ্যান। রাত দেড়টার দিকে আগৈলঝাড়া-কোটালীপাড়া মহাসড়কের বুধার এলাকায় পৌঁছালে কে বা কারা আগুন লাগিয়ে দেন। এ ঘটনায় আগৈলঝাড়া উপজেলা ছাত্রদলের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক টিপু হাওলাদার ও উপজেলা জাতীয়তাবাদী সামাজিক সাংস্কৃতিক সংস্থার সাংগঠনিক সম্পাদক কবির মোল্লাসহ ২৬ জনের নামে একটি মামলা করেন এসআই অসীম কুমার সিকদার। মামলায় আরও ২৫ থেকে ৩০ জনকে অজ্ঞাত পরিচয় আসামি করা হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে মামলার তদন্তভার আমাকে দেন আগৈলঝাড়া থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মনিরুল ইসলাম।

মামলার তদন্তভার পেয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন নজরুল। তিনি বলেন, তদন্তের সময় ফলের মালিক হারুন কাজী ও তার ছেলে মামুন কাজী এবং গাড়ির মালিক আলতাফ ও গাড়িচালক হাবিবুর রহমানকে খুঁজে বের করে জবানবন্দি নেওয়া হয়। এর মধ্যেই ১১ ফেব্রুয়ারি আসামিদের গ্রেপ্তারে ওসিসহ আমাকে নিজ কার্যালয়ে ডাকেন বরিশাল জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) এহসান উল্লাহ। আমাকে দেখে রাগান্বিত হয়ে এসপি বলেন- 'শালা বাই*ন*চো*দ, একটা আসামি ধরতে পারো না। তুই তো একটা অথর্ব ও অযোগ্য লোক। আসামি ধর, না হলে এক শালারও চাকরি থাকবে না'। আরও বলা হয়- 'তোরা তো আগৈলঝাড়া থানায় চাকরি করস, আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহর ক্ষমতা সম্পর্কে জানো? এ মামলায় আসামি ধরার জন্য তার চাপ ও নির্দেশনা আছে। আসামি না ধরতে পারলে কারও চাকরি থাকবে না'। ওই সময় বরিশাল জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জাহাঙ্গীর হোসেন মল্লিকসহ আরও অনেকেই ছিলেন। 

সাক্ষ্যে এই পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, সবার সামনে আমাকে চরম অপমান, অপদস্থ ও বেইজ্জতি করেন পুলিশ সুপার এহসান। এতে আমি কেঁদে দিই। এরপরও এসপি থামেননি। উল্টো এহসান উল্লাহ বলেন-'তুই তো কানা। চোখে দেখস না। তুই তো আসামি ধরতে পারবি না। তোর সঙ্গে আমার চৌকস অফিসার ডিবির এসআই খলিলুর রহমানকে দিলাম। তোরা গিয়ে ডিএমপির ডিসির (ডিবি) কাছে রিপোর্ট করবি। ঢাকায় গিয়ে ডিবির মুখপাত্র মনিরুল ইসলামের সঙ্গে আমরা দেখা করি। আমরা আসার আগেই তার সঙ্গে কথা বলেন এসপি এহসানউল্লাহ ও এমপি আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ। এরপর ১৯ ফেব্রুয়ারি গভীর রাতে অভিযান চালিয়ে ঢাকার আশুলিয়া থানাধীন কুরগাঁও পুরাতন পাড়ায় কবিরকে এবং কেরানীগঞ্জ থানাধীন মধ্যেরচর এলাকা থেকে টিপুকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাৎক্ষণিকভাবে আমরা খবরটি এসপি এহসান ও ওসি মনিরুলকে জানিয়ে দিই। ২০ ফেব্রুয়ারি সকালে আসামিদের নিয়ে একটি মাইক্রোবাসে চড়ে বরিশালের উদ্দেশে রওনা হই আমি ও ডিবির খলিল। ওই সময় ফোনে এসপি-ওসির সঙ্গে আমার কথা হয়।

পুলিশ সুপারের সঙ্গে কথা বলার সময় আমাকে বলেন যে, 'আসামিদের নিয়ে তুই ও এসআই খলিলুর রহমান মাদারীপুরের কালকিনি থানাধীন ভুরঘাটা এলাকায় আয়। ওখানে আমার ডিবির টিম (বরিশাল) রেডি আছে'। ভুরঘাটা এলাকায় পৌঁছালে দেখি আগে থেকেই একটি মাইক্রোসহ ডিবির টিম রয়েছে। তখন আমি পুলিশ সুপারের সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা বলি। তিনি বলেন যে, 'তুই বেশি পাকনামি করবি না। তোকে তো আগে থেকেই বলা আছে। তুই জেলা ডিবির কাছে আসামি হস্তান্তর করবি। আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদ করতে হবে'। তখন বিষয়টি জানালে আসামিদের আগৈলঝাড়া থানায় নেওয়ার প্রয়োজন নেই বলে জানিয়েছেন ওসি মনিরুল। এরপর ডিবির কাছে আসামি হস্তান্তর করে আগৈলঝাড়া থানায় গিয়ে ওসির সঙ্গে দেখা করি। আমাকে ওসি জানান- রাত দেড়টায় তুমিসহ সব অফিসার ও ফোর্স থানায় থাকবে। আমি শারীরিকভাবে অসুস্থ থাকায় বাসায় চলে যাই। আমি রাত দেড়টার সময় থানায় আসি। তখন ডিউটি অফিসার ও সেন্ট্রিকে রেখে আগৈলঝাড়া থানার সব অফিসার ও ফোর্স নিয়ে বুধার বাইপাস সড়কে যান ওসি মনিরুল। সেখানে বিভিন্ন স্থানে আমাদের মোতায়েন করা হয়। ওসি ছিলেন আমার কাছাকাছি।

রাত ২টার দিকে হঠাৎ আমাদের সামনে দিয়ে পুলিশ সুপার এহসান উল্লাহর গাড়ি অতিক্রম করে। ১৫ মিনিট পরে পরপর কয়েক রাউন্ড গুলির শব্দ শুনতে পাই আমরা। অফিসার ইনচার্জ মনিরুল আমাকে বলেন- ‘এই নজরুল কি হয়েছে, চল সামনে যাই, দেখি তো’। তখন ঘটনাস্থলে গিয়ে রাস্তার ওপরে কবির ও টিপুর রক্তাক্ত লাশ পড়ে থাকতে দেখি আমরা। সেখানে পুলিশ সুপার এহসানউল্লাহ ও উজিরপুর থানার এএসআই মাহাবুল ও এএসআই জসিমকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখি।

আমাদের দেখেই রাগান্বিত হয়ে যান পুলিশ সুপার। বলেন, 'শালা তোরা এখন আসছিস কীসের জন্য। তোরা তো কিছুই করতে পারলি না। তোদের থানার সব অফিসার ও ফোর্সকে কবির ও টিপুকে ক্রসফায়ার দিতে বললাম। কেউ রাজি হইলি না। তোরা কীভাবে চাকরি করস, চাকরি খাইয়াহালামু। এক শালারও এসিআর থাকবে না। এসিআরের বারোটা বাজিয়ে দেবো?’ ওই সময় এএসআই মাহাবুল ও এএসআই জসিমকে দেখিয়ে তিনি বলেন যে, ‘ওরা অনেক সাহসী লোক, তোরা ভীতু। তোরা পারলি না, এজন্য দেখ উজিরপুর থানা থেকে তাদের নিয়ে আসছি। তাদের পুরস্কৃত করব’।

এ ঘটনার পর জোর করে জিডি করা হয় দাবি করেন প্রত্যক্ষদর্শী এই পুলিশ কর্মকর্তা। নজরুল বলেন, ঘটনার পর আগৈলঝাড়া থানায় এসে আমাকে দিয়ে জিডি করান পুলিশ সুপার এহসান উল্লাহ। আমার স্বাক্ষরও নেওয়া হয়। অসুস্থ থাকায় স্বাক্ষর করতে রাজি না হওয়ায় চাকরি খাওয়ার হুমকি দেন তিনি। এরপর ওসিকে এজাহার লেখানো হয়। সেখানেও স্বাক্ষর দিতে বলেন এসপি। তাৎক্ষণিকভাবে রাজি না হলে তিনি বলেন যে, 'তুই তো দূরের কথা, তোর বাপও স্বাক্ষর করবে'। পরে নিরুপায় হয়ে এজাহারে স্বাক্ষর করি। মূলত সারা বাংলাদেশে বিরোধী মতকে নির্মূল করতেই রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় বিচারবহির্ভূত এসব হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এরই ধারাবাহিকতায় আগৈলঝাড়া থানায় এ ঘটনা ঘটানো হয় বলে নিজের জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন নজরুল ইসলাম।

সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে তাকে জেরা করেন গ্রেপ্তার উজিরপুর থানার সাবেক এএসআই মো. মাহাবুল ইসলাম ও এএসআই জসিম উদ্দিনের আইনজীবী আবুল হাসান। পলাতক বরিশাল-১ আসনের সাবেক এমপি আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ ও বরিশালের সাবেক পুলিশ সুপার (এসপি) এহসান উল্লাহর পক্ষে জেরা করেন স্টেট ডিফেন্স আইনজীবী আমির হোসেন।

ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানি করেন প্রসিকিউটর ফারুক আহাম্মদ ও সহিদুল ইসলাম সরদার। এ সময় মার্জিনা রহমানসহ অন্যান্য প্রসিকিউটর উপস্থিত ছিলেন। 

এ মামলায় পরবর্তী সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য আগামী ২৩ জুন দিন ধার্য করেছেন ট্রাইব্যুনাল। এর আগে, বুধবার (১৭ জুন) সাক্ষ্য দিয়েছেন পুলিশ কর্মকর্তা অসীম কুমার সিকদার।

এমআরআর/বিআরইউ