মৃত্যুর ৩০ বছর পর আবারও আলোচনায় ঢাকাই সিনেমার নক্ষত্র সালমান শাহ। হত্যার প্রকৃত কারণ উদঘাটনের জন্য নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে প্রখ্যাত এই চিত্রনায়কের দেহাবশেষ কবর থেকে উত্তোলনের অনুমতি দিয়েছেন আদালত। দেহাবশেষ উত্তোলনপূর্বক সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি ও ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। তবে তিন দশক পর তৃতীয় দফায় ময়নাতদন্তের জন্য দেহাবশেষ উত্তোলনে নারাজ সালমানের পরিবার। আদালতের সেই আদেশের বিপক্ষে পরিবারের পক্ষ থেকে আপত্তি জানানো হবে। এ সপ্তাহেই আদালতে নারাজি দাখিল করা হবে বলে জানান বাদীপক্ষের আইনজীবী।
আদালত সূত্রে জানা যায়, মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা সিআইডি পুলিশের পরিদর্শক জিয়াউল মোর্শেদ গত ২০ মে এ আবেদন করেন। ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জুয়েল রানা গত ২৪ মে আবেদন মঞ্জুর করে দেহাবশেষ তোলার আদেশ দেন। আবেদনে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা হত্যার প্রকৃত কারণ উদঘাটনের জন্য নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে সালমান শাহর (চৌধুরী মোহাম্মদ শাহরিয়ার ইমন) দেহাবশেষ (লাশ) কবর থেকে উত্তোলনপূর্বক সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি ও ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করার অনুমতি চান। সেখানে তদন্ত কর্মকর্তা উল্লেখ করেন, সালমান শাহের মৃত্যুর পর মরদেহের ময়নাতদন্ত শেষে সিলেট হযরত শাহজালাল (রা.) এর মাজার প্রাঙ্গণ কবরস্থানে দাফন করা হয়। এ সংক্রান্তে রমনা থানায় অপমৃত্যু মামলা করা হয়। পরে তদন্তকালে মৃত সালমান শাহের মরদেহ আদালতের নির্দেশে পুনরায় কবর থেকে উত্তোলন করে সুরতহালসহ ময়নাতদন্ত করা হয়।
ভিকটিম শাহরিয়ার ইমন সালমান শাহের মরদেহের দুই দফা ময়নাতদন্ত হয়। প্রথম ময়নাতদন্ত রিপোর্টে চিকিৎসক মতামত দেন, ফাঁসের দরুন ঝুলে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মৃত্যু হয়েছে। যা মৃত্যুপূর্ব ও আত্মহত্যা জনিত। ২য় ময়না তদন্ত রিপোর্টে বলা হয়, মরদেহ পরিবর্তিত পচনশীল অবস্থায় থাকায় মেডিকেল লিগ্যাল বোর্ড মৃত্যুর কারণ নির্ণয় করতে পারেনি। ঘটনার ২৯ বছর পর বর্তমানে আদালতের নির্দেশে রমনা থানায় হত্যা মামলা রুজু হয়েছে। মামলার সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে মৃত সালমান শাহ -এর মরদেহ পুনরায় কবর থেকে উত্তোলনপূর্বক সুরতহাল প্রতিবেদন এবং ময়নাতদন্তের মাধ্যমে রিপোর্ট পর্যালোচন করা একান্ত প্রয়োজন।
এ বিষয়ে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ঢাকা পোস্টকে জানান, সালমান শাহের মরদেহ উত্তোলনের আবেদন করা হলে আদালত তা মঞ্জুর করেন। এখন বাদীপক্ষ ও সংশ্লিষ্টদের মধ্যে সমন্বয় করে কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে। তবে কবে নাগাদ তার মরদেহ উত্তোলন করা হবে এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তারিখ বলতে পারেননি তিনি। এছাড়া মামলার আসামিদের গ্রেপ্তার সংক্রান্ত বিষয়ে তথ্য জানাতে অপারগতা প্রকাশ করেন এই পুলিশ কর্মকর্তা।
মরদেহ উত্তোলন ঠেকাতে আইনি লড়াইয়ের প্রস্তুতি পরিবারের
এ বিষয়ে বাদীপক্ষের আইনজীবী ফারুক আহাম্মদ ঢাকা পোস্টকে বলেন, সালমান শাহর পরিবারের সঙ্গে কথা হয়েছে। তাদের মতের ভিত্তিতে আমরা মরদেহ উত্তোলনে তদন্ত কর্মকর্তার আবেদনের ওপর নারাজি দেবো। দুই একদিনের মধ্যেই আদালতে লিখিত আপত্তি জমা দেওয়া হবে। মামলার তদন্ত কর্মকর্তার আবেদনেই উল্লেখ রয়েছে, ৯৭ সালে ২য় দফায় তার মরদেহ উত্তোলন করা হলে সেটা ডিকম্পোসড (পচন) হওয়ায় মৃত্যুর কারণ নির্ধারণ করা যায়নি। এত বছর পর সেখানে অবশিষ্ট কিছুই থাকার কথা না। এছাড়া ধর্মীয় অনুশাসন ও তার ভক্তকুল কবর পাহারা দিচ্ছেন বলে জানতে পেরেছি। তাই আমরা দ্রুতই আদালতে আপত্তি দাখিল করবো।
তিনি আরও বলেন, সালমান শাহের মৃত্যুর দিনই অনেকটা পরিবারের অজান্তে সালমানের বাবা কমর উদ্দিন চৌধুরীর স্বাক্ষর নিয়ে রমনা থানায় একটি অপমৃত্যুর মামলা করে পুলিশ। সেই মামলার তদন্ত চলছিল। এর মধ্যে ১৯৯৭ সালে রিজভি আহমেদ নামে একজন অন্য এক মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে আদালতে জবানবন্দিতে স্বীকার করেন, সালমান শাহকে হত্যা করে আত্মহত্যার ঘটনা সাজানো হয়েছে এবং তিনি নিজেও সেই হত্যায় জড়িত ছিলেন। সালমানের বাবা কয়েকজনের নাম উল্লেখ করে আদালতে নালিশি হত্যা মামলা করেন। সেই মামলার যারা আসামি, তাদের বিরুদ্ধে এখন হত্যা মামলা করা হয়েছে। তারা এখন হত্যা মামলার আসামি।
প্রসঙ্গত, ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর মারা যান চিত্রনায়ক চৌধুরী মোহাম্মদ শাহরিয়ার ইমন ওরফে সালমান শাহ। সে সময় এ বিষয়ে অপমৃত্যুর মামলা দায়ের করেছিলেন তার বাবা প্রয়াত কমরউদ্দিন আহমদ চৌধুরী। পরে ১৯৯৭ সালের ২৪ জুলাই ছেলেকে হত্যা করা হয়েছে অভিযোগ করে মামলাটিকে হত্যা মামলায় রূপান্তরের আবেদন জানান তিনি। অপমৃত্যু মামলার সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের অভিযোগের বিষয়টি একসঙ্গে তদন্ত করতে সিআইডিকে নির্দেশ দেন আদালত। ১৯৯৭ সালের ৩ নভেম্বর আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয় সিআইডি। প্রতিবেদনে সালমান শাহ’র মৃত্যুকে আত্মহত্যা বলে উল্লেখ করা হয়। ওই বছরের ২৫ নভেম্বর ঢাকার সিএমএম আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন গৃহীত হয়। সে সময় সিআইডির প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করে তার বাবা কমরউদ্দিন আহমদ চৌধুরী রিভিশন মামলা দায়ের করেন। সবশেষ গত ২০ অক্টোবর ঢাকার ষষ্ঠ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ মো. জান্নাতুল ফেরদৌস ইবনে হক বাদীপক্ষের করা রিভিশন মঞ্জুর করে মামলাটি হত্যা মামলা হিসেবে গ্রহণের নির্দেশ দেন।
এর পরিপ্রেক্ষিতে ২১ অক্টোবর রাজধানীর রমনা থানায় মামলাটি দায়ের করেন সালমান শাহর মামা মোহাম্মদ আলমগীর। মামলায় সালমান শাহর স্ত্রী সামীরা হকসহ ১১ জনকে আসামি করা হয়। আসামিদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৩০২/৩৪ ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে।
সামীরা ছাড়া মামলার অপর আসামিরা হলেন— শিল্পপতি ও সাবেক চলচ্চিত্র প্রযোজক আজিজ মোহাম্মদ ভাই, লতিফা হক লুছি, খলনায়ক ডন, ডেবিট, জাভেদ, ফারুক, মে-ফেয়ার বিউটি সেন্টারের রুবি, আব্দুস ছাত্তার, সাজু এবং রেজভি আহমেদ ফরহাদ। এছাড়া মামলায় অজ্ঞাতনামা আরো অনেককে আসামি করা হয়েছে।
মামলার অভিযোগে মোহাম্মদ আলমগীর উল্লেখ করেন, ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর তার বোন নিলুফার জামান চৌধুরী (নীলা চৌধুরী), বোনের স্বামী কমর উদ্দীন আহমদ চৌধুরী এবং তাদের ছোট ছেলে শাহরান শাহ নিউ ইস্কাটনের বাসায় সালমান শাহের সঙ্গে দেখা করতে যান। সেখানে গিয়ে তারা জানতে পারেন, সালমান ঘুমাচ্ছেন।
কিছুক্ষণ পর প্রডাকশন ম্যানেজার সেলিম ফোন করে জানান, সালমানের কিছু হয়েছে। দ্রুত তারা বাসায় ফিরে দেখেন, সালমান শয়নকক্ষে নিথর পড়ে রয়েছেন এবং কয়েকজন বহিরাগত নারী তার হাত-পায়ে তেল মালিশ করছেন। পাশের কক্ষে সামীরার আত্মীয় রুবি বসে ছিলেন।
সালমানের মা চিৎকার করে তাকে হাসপাতালে নেওয়ার অনুরোধ করেন। পথে তারা সালমানের গলায় দড়ির দাগ এবং মুখমণ্ডল ও পায়ে নীলচে দাগ দেখতে পান। পরে তাকে হলি ফ্যামিলি হাসপাতাল হয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক জানান, সালমান শাহ অনেক আগেই মারা গেছেন।
মোহাম্মদ আলমগীর আরও উল্লেখ করেন, সালমানের বাবা কমর উদ্দীন আহমদ চৌধুরী মৃত্যুর আগে ছেলের মৃত্যুকে হত্যা বলে সন্দেহ করে ১৯৯৭ সালের ২৪ জুলাই চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে একটি দরখাস্ত দাখিল করেন। এতে তিনি রমনা থানার অপমৃত্যু মামলাটি দণ্ডবিধির ৩০২/৩৪ ধারায় হত্যা মামলা হিসেবে গ্রহণ এবং সিআইডির মাধ্যমে তদন্তের আবেদন জানান।
সালমানের বাবার মৃত্যুর পর আলমগীর তার বোনের পক্ষ থেকে মামলাটি পরিচালনা করছেন। মামলায় অভিযুক্তদের মধ্যে কেউ মৃত্যুবরণ করে থাকলে প্রমাণ সাপেক্ষে তারা মামলার দায় থেকে অব্যাহতি পাবেন।
এনআর/এসএম
