প্রথমে গুলির শব্দ। জঙ্গলে ঢুকতেই চোখে পড়ে দু-তিনজনের গুলিবিদ্ধ লাশ। কিছুক্ষণ পরই মেলে একটি ছাগল। আর এ ছাগলটিই লাশের পাশে জবাই দিয়ে দুপুরের খাবার সারেন কর্মকর্তারা। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দেওয়া এক জবানবন্দিতে সুন্দরবনের একটি অভিযানের এমনই বর্ণনা দিয়েছেন সেনাসদস্য ইমরুল কায়েস। যিনি একসময় মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানের রানার ছিলেন।
আওয়ামী লীগের আমলে শতাধিক গুম-খুনের ঘটনায় হওয়া মানবতাবিরোধী অপরাধে জিয়াউলের মামলায় সাক্ষ্যগ্রহণের দিন ধার্য ছিল রোববার (২১ জুন)। এদিন ট্রাইব্যুনাল-১ এর সদস্য বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদের নেতৃত্বাধীন দুই সদস্যের বিচারিক প্যানেলে পঞ্চম সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেন ইমরুল। প্যানেলের অপর সদস্য বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।
দিনভর চলা জবানবন্দিতে জিয়াউল আহসানের বিভিন্ন কুকীর্তির কথা সামনে আনেন ইমরুল কায়েস। তুলে ধরা হয় গুম-খুনের বিভৎস বর্ণনাও।
২০০১ সালের ৫ এপ্রিল বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে সৈনিক হিসেবে আর্মার্ড কোরে যোগদান করেন ইমরুল। ২০১০-১২ সাল পর্যন্ত র্যাব হেডকোয়ার্টারে প্রেষণে কর্মরত ছিলেন তিনি। র্যাব হেডকোয়ার্টারে ইন্টেলিজেন্স উইংয়েও চাকরি করা হয়। ২০১০ সালের ১০ আগস্ট র্যাবে পোস্টিং হন এই সেনাসদস্য। পোস্টিংয়ের পর প্রথমে তাকে অ্যাডমিন উইংয়ে রাখা হয়। এরপর র্যাবের বিভিন্ন ইউনিট বা সংস্থায় বদলি করা হয়। বর্তমানে ওয়ারেন্ট অফিসার হিসেবে রংপুর সেনানিবাসে কর্মরত রয়েছেন তিনি।
সাক্ষ্যে ইমরুল কায়েস বলেন, তৎকালীন লেফটেন্যান্ট কর্নেল জিয়াউল আহসান স্যার (বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল) আমার পূর্বপরিচিত ছিলেন। ২০০৪ সালে তার অধীনে আমি সেনা কমান্ডো কোর্স করি। তখন তিনি কোম্পানি কমান্ডার ছিলেন। ২০০৭ সাল পর্যন্ত ১-প্যারা কমান্ডো ব্যাটালিয়নে আমি তার অধীনে কর্মরত ছিলাম। তার সঙ্গে আমার সম্পর্ক ভালো ছিল। আমার বদলির পর একদিন র্যাব হেডকোয়ার্টারে আসেন জিয়াউল। আমাকে দেখে তিনি জিজ্ঞেস করেন- কিরে ইমরুল তুই এখানে? আমি স্যারকে বলি-স্যার আমার র্যাবে পোস্টিং হয়েছে। তখন স্যার আমার নাম ও নম্বর নেন। এর দু-তিনদিন পরই র্যাবের ইন্টেলিজেন্স উইংয়ে আমার পোস্টিং হয়। মোহাম্মদপুর ক্যাম্পে সংযুক্ত থাকা অবস্থায় সিনিয়র ডিএডি (নাম মনে নেই) আমাকে ফোন দিয়ে বলেন, ইমরুল তোমাকে ডিরেক্টর ইন্টিলেজেন্সের রানার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। যা র্যাবে বডিগার্ড হিসেবে বলা হয়।
এই সেনাসদস্য বলেন, জিয়াউল স্যারের রানার থাকা অবস্থায় আমার কাজ ছিল সবসময় সঙ্গে থাকা। স্যার যেখানে প্রয়োজন মনে করতেন সেখানে নিয়ে যেতেন। স্যারের সঙ্গে আমি জাফলং বর্ডার, ডিজিএফআই হেডকোয়ার্টার, আর্মি হেডকোয়ার্টার, ডিবির প্রধান কার্যালয়ে (তখন ডিবির প্রধান ছিলেন মনির স্যার) যেতাম। মাঝে মাঝে সচিবালয়ে যাওয়া হতো। এছাড়া শেখ হাসিনার নিরাপত্তাবিষয়ক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিকীর বাসায় যেতেন স্যার। তার সঙ্গে জিয়া স্যারের ভালো সম্পর্ক ছিল। তারিক সিদ্দিকীর মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গেও তার সখ্যতা গড়ে ওঠে। এর পরিপ্রেক্ষিতে জিয়া স্যার যখন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে যেতেন, তখন গাড়িতে অস্ত্র-অ্যামোনিশন থাকতো। কিন্তু তল্লাশি করা হতো না।
সাক্ষী বলেন, রানার হিসেবে যোগদানের ২০-২৫ দিন পর একদিন রাত সাড়ে ১২টার দিকে আমাকে ফোন দিয়ে জিয়া স্যার বলেন- কই তুই? আমি ক্যাম্পে রয়েছি জানালে দ্রুত র্যাব-১ এর সামনে যেতে বলেন তিনি। সেখানে যাওয়ার পর দুটি কালো রঙের মাইক্রোবাস দাঁড়িয়ে থাকতে দেখি। স্যার আমাকে একটি মাইক্রোবাসে উঠতে বলেন। গাড়িতে ওঠার পর স্যার আমাকে বলেন- পেছনে একটি বস্তা আছে, তা ফেলে দিতে হবে। ওই গাড়িতে জিয়াউল ছাড়াও র্যাব-১ এর সিইও রাশেদ ও ক্যাপ্টেন কাউসার ছিলেন। আরও দুজনকে চিনতে পারিনি। রাত পৌনে ১টার দিকে র্যাব-১ থেকে বের হয়ে জসিম উদ্দিন হয়ে টঙ্গীর দিকে আহসান উল্লাহ ওভার ব্রিজের ওপর দিয়ে ডান দিকে মোড় নিয়ে আমরা বেশ কিছু দূর যাই। যাওয়ার পর একটি রেল ক্রসিংয়ে আমাদের গাড়ি দুটি থামে। তখন জিয়া স্যার আমাকে বলেন- ইমরুল ডিক্কিটা খুলে বস্তাটা বের কর। আমি ডিক্কি খুলে বস্তা নামানোর উদ্দেশে হাত দিতেই দেখি একটি মরদেহ। লাশটি ঠান্ডা ছিল। এতে আমি ভয় পেয়ে যাই। পরে আমার সঙ্গে থাকা অন্যদের সহায়তায় মরদেহটি রেললাইনের পাশে নিয়ে রাখা হয়। সেখানে দাঁড়ানো ছিলেন জিয়াউল স্যার। এরপর মরদেহটি রেললাইনের ওপর রেখে মাইক্রোবাসে ফিরে আসেন জিয়া স্যারসহ অন্যরা। কিছুক্ষণ পর একটি ট্রেন এসে চলে যায়।
ক্যাম্পে ফিরে আসার পর পাঁচ-সাতদিন অস্বাভাবিক ছিলেন বলে দাবি করেন ইমরুল কায়েস। তিনি জানান, এ ঘটনার পর তার কাছে খুব খারাপ লেগেছিল। কোথায় এলেন, কীভাবে চাকরি করবেন। এসব ভেবে ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়া করতে পারেননি তিনি। আর এ ঘটনার কিছুদিন পরই তাকে জিয়াউল আহসানের সঙ্গে সুন্দরবন অপারেশনে কয়েকবার যেতে হয়েছিল।
ট্রাইব্যুনালে ইমরুল দাবি করেন, জিয়াউলের সঙ্গে বেশ কয়েকবার সুন্দরবন যাওয়া হয়। এর মধ্যে বোটে চড়ে একটি অপারেশনে যান তিনি। ওই সময় নদীতে ভাটা ছিল। তাদের সঙ্গে র্যাব-৮ এর সদস্যরাও ছিলেন। সুন্দরবনে বোট থামার পর জঙ্গলের ভেতর থেকে দু-তিন রাউন্ড গুলির শব্দ শুনতে পান তারা। তাদেরও গুলি করার নির্দেশ দেন জিয়াউল। কথামতো তারাও গুলি ছুড়তে থাকেন। একপর্যায়ে জিয়াউল আহসান, র্যাবের এডিজি (অপস) মুজিব, কমান্ডার সোহায়েল ও বিভিন্ন গণমাধ্যমের কর্মীরাও উপস্থিত ছিলেন।
জবানবন্দিতে তিনি আরও বলেন, আমরা জঙ্গলের ভেতরে ঢুকতেই গুলিবিদ্ধ দু-তিনটি লাশ পড়ে থাকতে দেখি। গাছের ডালপালা দিয়ে একটি হাঁটার রাস্তাও দেখতে পাই। রাস্তার দুই পাশে ছোট ছোট ঘর ছিল। জলদস্যুরা বসতে পারতেন। সবকটি ঘরই গাছের ডাল দিয়ে বানানো। একটি গাছের ওপর থাকা অবজারভেশন পোস্টের চারপাশে বুলেটপ্রুফ পাত লাগানো ছিল। এছাড়া দুটি বোটে বিভিন্ন ধরনের সিগারেট, মদের বোতল, খাদ্যসামগ্রী ও একটি ছাগল ছিল। ছাগলটি জবাই করে দুপুরের খাবারে জিয়াউল স্যারসহ উপস্থিত ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা মিলে খাওয়া হয়। অপারেশনটি সাজানো ছিল বলে দাবি করেন এই সাক্ষী।
বিডিআর হত্যাকাণ্ড প্রসঙ্গ টেনে সেনাসদস্য ইমরুল বলেন, বিডিআর হত্যাকাণ্ডের পর সারাদেশে অপারেশন রেবেল হান্ট চালানো হয়। শুধুমাত্র পলাতক বিডিআর সদস্যদের ধরার জন্যই এ অপারেশন সাজানো হয়। ওই সময় আট-দশজন লোককে হত্যা করেন জিয়াউল আহসান স্যার। যাদের হত্যা করেছেন, তারা বিডিআর সদস্য ছিলেন বলে জানিয়েছেন তিনি। এসব লোককে দুভাবে হত্যা করা হয়েছে। একটি ছিল ইনজেকশন পুশ করে। আরেকটি ছিল পোস্তগোলা ব্রিজের কাছে থাকা আর্মি ক্যাম্পের ভেতর দিয়ে বোটে করে নদীতে নেওয়া হতো। এরপর বোটের পাটাতনে একটি সিমেন্টবোঝাই বস্তা রেখে হত্যার শিকার ব্যক্তিকে শোয়ানো হতো। তার ওপর আরেকটি সিমেন্টের বস্তা রেখে রশি দিয়ে বেঁধে ফেলা হতো। পরে মাথায় গুলি চালিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করতে নদীতে ফেলে দিতেন জিয়াউল স্যার।
জবানবন্দিতে উল্লেখ করা হয়, ২০১২ সালের প্রথম দিকে জিয়াউলের নেতৃত্বে তিনটি মাইক্রোতে করে টিএফআই সেল থেকে ১১ জনকে নিয়ে পোস্তগোলা সেনা ক্যাম্পে যাই আমরা। সেখানে তাদের বোটে ওঠানো হয়। বোটটি সুন্দরবন অপারেশনে জলদস্যুরা ব্যবহার করেছিলেন। তখন হঠাৎ একজন আসামি পানিতে ঝাঁপ দেন। জিয়া স্যার আমাকে বলেন- ইমরুল ধর ধর। স্যারের আদেশে আমি পানিতে ঝাঁপ দিয়ে আসামিকে ধরে ফেলি। পরে রশির সাহায্যে আমাদের বোটে ওঠানো হয়। ও সময় অন্ধকার ছিল। আমি আসামিকে চিনতে না পারলেও বয়স ছিল ২৫-২৬ বছর। এরপর বোটটি নদীর মাঝখানে নিয়ে একই পদ্ধতিতে ১১ জনকে হত্যা করে ডুবিয়ে দেওয়া হয়। ওই অপারেশনে জিয়া স্যার, মেজর নওশাদ স্যার, স্কোয়াড্রন লিডার সাইফ স্যার, কমান্ডার সোহায়েল স্যার, এডিজি (অপস) মুজিব স্যার ছিলেন। অপারেশন শেষে আমরা ক্যাম্পে চলে আসি।
ইমরুল কায়েস বলেন, ২০১২ সালের মাঝামাঝিতে র্যাব-১ এর টিএফআই সেল থেকে দুজনকে নিয়ে আমরা জিয়া স্যারের নেতৃত্বে জাফলং বর্ডারে যাই। দুজনেরই হাত বাঁধা ও মাথায় জমটুপি পরানো ছিল। রাত আড়াইটার দিকে আমরা জাফলংয়ে পৌঁছাই। সেখানে ভারত থেকে দুজন আসামিকে হস্তান্তর করেন সিভিল পোশাকে আসা চার-পাঁচজন লোক। আমাদের কাছে থাকা দুজনকে তাদের কাছে হস্তান্তর করি। ভারত থেকে পাওয়া দুজনকে নিয়ে আমরা জিয়া স্যারের নেতৃত্বে ঢাকার উদ্দেশে রওনা দেই। জাফলং বর্ডার থেকে আনুমানিক ২৫-৩০ কিলোমিটার আসার পর গাড়ি থেকে একজনকে নামানো হয়। তাকে গুলি করে রাস্তার পাশে ফেলে দেন জিয়াউল আহসান স্যার। ওই সময় স্যারের নির্দেশে আমিসহ অন্য একজন গাড়ির সামনে ও পেছনে পাহারা দেই। অন্য আসামিকে নিয়ে রওনা করে ১০-১৫ কিলোমিটার যাওয়ার পর একইভাবে হত্যা করেন তিনি।
ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানি করেন চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন, প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম, গাজী এমএইচ তামিম, শাইখ মাহদী, তাসমিরুল ইসলাম, মঈনুল করিম, আবদুস সাত্তার পালোয়ান, সহিদুল ইসলাম সরদারসহ অন্যরা।
এমআরআর/এমএসএ
