ঢাকাই সিনেমার ক্ষণজন্মা নায়ক সালমান শাহ’র মৃত্যুর ৩০ বছর পর হত্যার প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনের জন্য কবর থেকে লাশ উত্তোলনপূর্বক সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি ও ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করার অনুমতি দিয়েছেন আদালত। এর আগেও দুই দফায় তার লাশ উত্তোলন করে ময়নাতদন্ত করা হয়েছিল। নতুন করে তৃতীয় দফায় লাশ উত্তোলনের বিষয়ে দেশের খ্যাতনামা ফরেনসিক মেডিসিন বিশেষজ্ঞদের কাছে জানতে চাওয়া হলে তারা বলেন, এত বছর পর লাশ উত্তোলন করে ফরেনসিক পরীক্ষা করার নজির বাংলাদেশে নেই। একই সঙ্গে এই দীর্ঘ সময় পর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ বের করাও অসম্ভব বলে মনে করেন তারা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের এক সহকারী অধ্যাপক জানান, তিন দশক পরে লাশ উত্তোলন করে ময়নাতদন্তের মাধ্যমে হয়ত কোন কারণ পাওয়া সম্ভব হবে না। তারপরও আদালত যেহেতু একটি আদেশ দিয়েছেন তাই তদন্তের স্বার্থে দেখা যেতে পারে। কিন্তু এর ফলে যে প্রকৃত মৃত্যুর কারণ উদ্ঘাটন হবে সেটা বলা যাচ্ছে না।
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. মো. কামরুল হাসান বলেন, ৩০ বছর পরে লাশ উত্তোলন করে সেটার ফরেনসিক করার নজির আমাদের দেশে নেই৷ সালমান শাহ মারা যাওয়ার কারণ হিসেবে প্রথম ময়নাতদন্তের রিপোর্টে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে অর্থাৎ আত্মহত্যার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। তার মৃত্যু যদি আত্মহত্যা না হয়ে আর্সারিক পয়জনিংয়ের মাধ্যমে হতো তাহলে হয়ত কিছু পাওয়া সম্ভব হতো। তাও সব পয়জনিং এ পাওয়া সম্ভব না।
৩০ বছর পর লাশ উত্তোলন করে ময়নাতদন্তের ফলে কিছু আলামত পাওয়া সম্ভব কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, এত বছর পর লাশ উত্তোলন করে মৃত্যুর কারণ বের করা কঠিন এবং অসম্ভব। জজ সাহেব হয়তো লাশ উত্তোলন করে ময়নাতদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন কিন্তু লাশ বলতে হয়ত কয়েক টুকরো হাড় পাওয়া যেতে পারে। সেটা দিয়ে আত্মহত্যা জনিত মৃত্যুর কারণ বের করা কঠিন হবে।
গত ২১ অক্টোবর রাজধানীর রমনা থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন সালমান শাহর মামা মোহাম্মদ আলমগীর। মামলায় সালমান শাহর স্ত্রী সামীরা হকসহ ১১ জনকে আসামি করা হয় এবং তাদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৩০২/৩৪ ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে। মামলার অভিযোগে মোহাম্মদ আলমগীর উল্লেখ করেন, ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর তার বোন নিলুফা জামান চৌধুরী (নীলা চৌধুরী), বোনের স্বামী কমর উদ্দীন আহমদ চৌধুরী এবং তাদের ছোট ছেলে শাহরান শাহ নিউ ইস্কাটনের বাসায় সালমান শাহর সঙ্গে দেখা করতে যান। সেখানে গিয়ে তারা জানতে পারেন যে সালমান ঘুমাচ্ছেন। কিছুক্ষণ পর প্রডাকশন ম্যানেজার সেলিম ফোন করে জানান, সালমানের কিছু হয়েছে।
তখন দ্রুত তারা বাসায় ফিরে দেখেন যে, সালমান শয়নকক্ষে নিথর পড়ে আছেন এবং কয়েকজন বহিরাগত নারী তার হাত-পায়ে তেল মালিশ করছেন। পাশের কক্ষে সামিরা আত্মীয় রুবি বসে ছিলেন। সালমানের মা চিৎকার করে তাকে হাসপাতালে নেওয়ার অনুরোধ করেন। পথে তারা সালমানের গলায় দড়ির দাগ এবং মুখমণ্ডল ও পায়ে নীলচে দাগ দেখতে পান। তারা সালমান শাহকে প্রথমে হলি ফ্যামিলি হাসপাতাল নিয়ে যান। সেখান থেকে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক জানান, সালমান শাহ অনেক আগেই মারা গেছেন।
মোহাম্মদ আলমগীর এজাহারে আরও জানান, সালমানের পিতা কমর উদ্দীন আহমদ চৌধুরী তার মৃত্যুর আগে ছেলের মৃত্যুকে হত্যা বলে সন্দেহ করে ১৯৯৭ সালের ২৪ জুলাই চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে একটি দরখাস্ত দাখিল করেন। এতে তিনি রমনা থানার অপমৃত্যু মামলাটি দণ্ডবিধির ৩০২/৩৪ ধারায় হত্যা মামলা হিসেবে গ্রহণ এবং সিআইডির মাধ্যমে তদন্তের আবেদন জানান। সালমানের পিতার মৃত্যুর পর তিনি তার বোনের পক্ষ থেকে মামলাটি পরিচালনা করছেন।
এদিকে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা সিআইডি পুলিশের পরিদর্শক জিয়াউল মোর্শেদ গত ২০ মে এ আবেদন করেন। ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জুয়েল রানা গত ২৪ মে আবেদন মঞ্জুর করে এ আদেশ দেন। আবেদনে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা হত্যার প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনের জন্য নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে সালমান শাহর (চৌধুরী মোহাম্মদ শাহরিয়ার ইমন) মৃতদেহ (লাশ) কবর থেকে উত্তোলনপূর্বক সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি ও ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করার অনুমতি চান।
সেখানে তদন্ত কর্মকর্তা উল্লেখ করেন, সালমান শাহের মৃত্যুর পর লাশের ময়নাতদন্ত শেষে সিলেট হযরত শাহজালাল (রা.) এর মাজার প্রাঙ্গণ কবরস্থানে দাফন করা হয়। এ সংক্রান্তে রমনা থানায় অপমৃত্যু মামলা করা হয়। পরবর্তীতে তদন্তকালে মৃত সালমান শাহ’র লাশ আদালতের নির্দেশে পুনরায় কবর থেকে উত্তোলন করে সুরতহালসহ ময়নাতদন্ত করা হয়। ভিকটিম শাহরিয়ার ইমন সালমান শাহ’র লাশের দুই দফা ময়নাতদন্ত হয়। প্রথম ময়নাতদন্ত রিপোর্টে চিকিৎসক মতামত দেন, ফাঁসের দরুন ঝুলে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে সম্পন্ন। যা মৃত্যুপূর্ব ও আত্মহত্যা জনিত (Suicidal in nature)।
দ্বিতীয় ময়নাতদন্ত রিপোর্টে বলা হয়, লাশটি পরিবর্তিত পচনশীল অবস্থায় থাকায় মেডিকেল লিগ্যাল বোর্ড মৃত্যুর কারণ নির্ণয় করতে পারেনি। ঘটনার ২৯ বছর পর বর্তমানে আদালতের নির্দেশে রমনা থানায় হত্যা মামলা রুজু হয়েছে। মামলার সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে মৃত সালমান শাহ্ এর লাশ পুনরায় কবর থেকে উত্তোলনপূর্বক লাশের সুরতহাল প্রতিবেদন এবং ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করে পোস্ট মর্টেম রিপোর্ট পর্যালোচন করা একান্ত প্রয়োজন।
অন্যদিকে বাদীপক্ষের আইনজীবী ফারুক আহাম্মদ ঢাকা পোস্টকে বলেন, সালমান শাহর পরিবারের সঙ্গে কথা হয়েছে। তাদের মতের ভিত্তিতে আমরা লাশ উত্তোলনে তদন্ত কর্মকর্তার আবেদনের ওপর নারাজি দেব। দুই একদিনের মধ্যেই আদালতে লিখিত আপত্তি জমা দেওয়া হবে। মামলার তদন্ত কর্মকর্তার আবেদনেই উল্লেখ আছে ৯৭ সালে ২য় দফায় তার লাশ উত্তোলন করা হলে সেটা ডিকম্পোসড (পচন) হওয়ায় মৃত্যুর কারণ নির্ধারণ করা যায়নি। এত বছর পর সেখানে অবশিষ্ট কিছুই থাকার কথা না। এছাড়া ধর্মীয় অনুশাসন ও তার ভক্তকুল কবর পাহারা দিচ্ছেন বলে জানতে পেরেছি। তাই আমরা দ্রুতই আদালতে আপত্তি দাখিল করবো।
এমএল/এমএন
