রক্তে ভেজা হাত তখনও শুকায়নি। কানে বাজছিল ‘মামা, আমার গুলি লেগেছে, আমাকে বাঁচাও’। এমন শোক কাটার আগেই ফেরার পথে ধরা দেয় আরেক আতঙ্ক। রিকশা থামিয়ে এক পুলিশ সদস্যকে বলতে শোনেন- ‘স্যার, এদের গুলি করে দিই’। আর এ কথা শুনতেই ভয় চেপে ধরে রিকশার সবাইকে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দেওয়া এক সাক্ষীর জবানবন্দিতে উঠে এসেছে এমন বর্ণনা। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলার সূচনা বক্তব্য ও সাক্ষ্যগ্রহণের দিন নির্ধারণ ছিল আজ (২৩ জুন)। এ মামলায় আসামির তালিকায় রয়েছেন কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য কামরুল ইসলাম ও ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন।
তাদের বিরুদ্ধে প্রথম সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেন এক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। নিরাপত্তার স্বার্থে তার নাম-পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি। ট্রাইব্যুনাল-১ এর সদস্য বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদের নেতৃত্বাধীন দুই সদস্যের বিচারিক প্যানেলে তার জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়। প্যানেলের অপর সদস্য বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।
২৬ বছর বয়সী এ সাক্ষীর বসবাস রাজধানীর বাড্ডা এলাকায়। চব্বিশের জুলাই-আগস্ট আন্দোলনে সরাসরি অংশ নিয়েছিলেন তিনি। তার সামনেই প্রাণ হারান একই এলাকার মারুফ।
জবানবন্দিতে সাক্ষী বলেন, ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই পুলিশের গুলিতে শহীদ হন রংপুরের আবু সাঈদ ও চট্টগ্রামের ওয়াসিম আকরাম। এরপর দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। ১৮ জুলাই আমিও বাড্ডা পোস্ট অফিস রোড ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে আন্দোলনে অংশ নেই। এতে আমরা অনেক বাধার শিকার হই। ছাত্র-জনতার ওপর ব্যাপক টিয়ারশেল ও ছররা গুলি ছোড়ে পুলিশ। অথচ আমাদের আন্দোলন ছিল শান্তিপূর্ণ। একপর্যায়ে রাজপথে টিকতে না পেরে বাসায় চলে যাই। পুলিশের ছররা গুলিতে ওই দিন অনেকেই আহত হন। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে একজন ছাত্রকে গুলি করে হত্যা করা হয়।
তিনি বলেন, ১৯ জুলাই জুমার নামাজের পর আমি, মারুফ, মারুফের মামা ফয়সাল ও রাজিব মিলে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে মিছিলে অংশ নেই। ওই সময় রামপুরা ব্রিজের দিকে যারা যাচ্ছেন, তাদেরই পুলিশ ও বিজিবি গুলি করে মেরে ফেলতে দেখি। রামপুরা ব্রিজের সামনে বেরিকেট দেওয়া ছিল। আমি পাঁচজনকে গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত অবস্থায় দেখেছি। একপর্যায়ে আমরা চারজন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে থেকে রামপুরার ব্রিজের দিকে এগিয়ে যাই। আছর শেষে মাগরিবের আগে রামপুরা ব্রিজের দিক থেকে আসা গুলির একটি প্রকট শব্দ শুনতে পাই। তখনই মারুফকে রাস্তার পাশে ফুটপাতের ওপর পড়ে যেতে দেখি। প্রথমে ভেবেছি ধাক্কাধাক্কিতে পড়ে গেছে। কিন্তু সামনে যেতেই দেখি তার তলপেটের ডান পাশে গুলি লেগেছে। মারুফ আমাকে বলে—‘মামা আমার গুলি লেগেছে, আমাকে বাঁচাও’। এরপর অচেতন হয়ে যায়। আমরা অনেক কষ্টে একটি অ্যাম্বুলেন্স ঠিক করে তাকে এএমজেড হাসপাতাল নিয়ে যাই। এর মধ্যে মারুফের অনেক রক্তক্ষরণ হচ্ছিল। রক্ত থামানোর জন্য গুলিবিদ্ধ স্থানে আমি হাত দিয়ে চেপে ধরি। তবে রক্তে আমার বাঁ হাতে থাকা ঘড়ি ও হাত ভিজে গিয়েছিল। এছাড়া ক্ষতস্থানে আমার তিন আঙুল ঢুকে যায়। তাকে হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়। রক্তক্ষরণ বন্ধ না হওয়ায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যেতে বলেন চিকিৎসকরা।
সাক্ষ্যে আরও উল্লেখ করা হয়, কয়েকজন মিলে মারুফকে নিয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রওনা দেন। কিন্তু পথে রামপুরা ব্রিজের কাছে পুলিশ-বিজিবির বাধার মুখোমুখি হন তারা। এতে প্রায় আধা ঘণ্টা সময় নষ্ট হয়। ততক্ষণে মারুফে অবস্থা প্রায় শোচনীয় পর্যায়ে চলে যায়। একপর্যায়ে অ্যাম্বুলেন্স ছেড়ে দেন পুলিশ-বিজিবি সদস্যরা। কিন্তু আবুল হোটেল অতিক্রম করে শান্তিনগর ব্রিজে ওঠার আগেই মারুফ মারা যান।
ট্রাইব্যুনালে বিশ্ববিদ্যালয়ের এই শিক্ষার্থী বলেন, মারা যাওয়ার সময় মারুফ আমার বাম হাতের ওপর ছিল। এরপরও আমরা তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে নিয়ে যাই। জরুরি বিভাগে গিয়ে দেখি গুলিবিদ্ধ অনেক মরদেহ পড়ে রয়েছে। বহু আহত ব্যক্তি আসছেন। কিছুক্ষণ পর একজন চিকিৎসক এসে মারুফকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে বলেন, তিনি আগেই মারা গেছেন। তবু তাকে ইসিজি করার জন্য বলা হয়। ইসিজি করার পর মারুফের মৃত্যু হয়েছে নিশ্চিত হই আমরা। একপর্যায়ে মরদেহ মর্গে নিয়ে যান হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। আমরা ময়নাতদন্ত করে মরদেহ নিয়ে যেতে চেয়েছিলাম। কিন্তু উপরের নির্দেশ রয়েছে জানিয়ে মরদেহ বের করতে দেননি তারা। পরে মারুফের বাবাকে হাসপাতালে রেখে আমরা বাসার উদ্দেশ্যে রওনা দেই।
সাক্ষী বলেন, ওই দিন রাত ১২টার দিকে আমরা জানতে পারি সারাদেশে কারফিউ জারি হয়েছে। আমরা শিল্পকলা একাডেমির সামনে দিয়ে যাচ্ছিলাম। রমনা থানার সামনে যেতেই পুলিশ-বিজিবির সদস্যরা আমাদের রিকশা আটকে ধরেন। একজন পুলিশ সদস্য বলে ওঠেন—‘স্যার এদের গুলি করে দেই’। তখন আমরা অনেক ভয় পেয়ে যাই। ওই সময় আরেকজন বলেন- ‘না স্যার, এদের ছেড়ে দেই’। এরপর মালিবাগ রেলক্রসে থাকা অবস্থায় আমরা রামপুরার দিক থেকে গুলির শব্দ শুনতে পাই। তখন আমরা খিলগাঁও হয়ে বনশ্রী ফরাজি হাসপাতালের সামনে যাই। সেখান থেকে একটি ব্রিজ পার হয়ে আফতাবনগর হয়ে বাসায় ফিরতে হয়েছিল।
ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানি করেন প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম। সঙ্গে ছিলেন প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিম, মঈনুল করিম, আবদুস সাত্তার পালোয়ান, সুলতান মাহমুদসহ অন্যরা।
এমআরআর/এসএম
