ছাত্রদলের দুই নেতাকে গ্রেপ্তারে বরিশালের তৎকালীন পুলিশ সুপার (এসপি) এহসান উল্লাহর সর্বোচ্চ নির্দেশনা ছিল বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করেছেন এক সিআইডি কর্মকর্তা। মামলার আসামিদের না ধরতে পারলে চাকরি খাওয়ার হুমকি দেওয়া হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
মঙ্গলবার (২৩ জুন) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর সদস্য বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীরের একক বেঞ্চে তার জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়।
বরিশালের আগৈলঝাড়ায় ক্রসফায়ারে ছাত্রদল নেতাসহ দুজনকে হত্যার ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলায় তিন নম্বর সাক্ষী হিসেবে সাক্ষ্য দেন এই সিআইডি কর্মকর্তা। নিরাপত্তার স্বার্থে তার নাম-পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি। বর্তমানে উপপরিদর্শক (নিরস্ত্র) হিসেবে বরিশালে কর্মরত রয়েছেন তিনি। ২০১৩ থেকে ২০১৬ সালের অক্টোবর পর্যন্ত বরিশাল জেলার গোয়েন্দা শাখায় কর্মরত ছিলেন।
এ মামলায় চার আসামির মধ্যে গ্রেপ্তার আছেন উজিরপুর থানার সাবেক এএসআই মো. মাহাবুল ইসলাম ও এএসআই জসিম উদ্দিন।
পলাতকরা হলেন- বরিশাল-১ আসনের সাবেক এমপি আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ ও বরিশালের সাবেক পুলিশ সুপার (এসপি) এহসান উল্লাহ।
জবানবন্দিতে সিআইডি কর্মকর্তা বলেন, ২০১৫ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি নিজ অফিসে আমাকে ডাকেন বরিশাল জেলার তৎকালীন পুলিশ সুপার এহসান উল্লাহ। তার অফিসে যাওয়ার পর দেখি আগৈলঝাড়া থানার আগৈলঝাড়া থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মনিরুল ইসলাম ও এসআই মো. নজরুল ইসলাম। পুলিশ সুপার আমাকে বলেন যে, 'বাকেরগঞ্জ ও আগৈলঝাড়া থানার দুটি মামলার আসামিদের গ্রেপ্তারের জন্য নির্দেশ দিয়েছেন এমপি আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ। আসামিদের যেকোনো মূল্যে ধরতে হবে। না ধরলে চাকরি থাকবে না। ওপরের অনেক চাপ আছে। তোমরা দুজনে ঢাকা ডিবি অফিসে যাবা। ডিএমপির ডিসি (ডিবি) স্যার ও ডিবির মুখপাত্র মনিরুজ্জামান স্যারের সঙ্গে কথা হয়েছে'। এসপি স্যারের নির্দেশে আমি ও আগৈলঝাড়া থানার এসআই নজরুল ইসলামসহ সঙ্গীয় ফোর্স নিয়ে ডিএমপির ডিসির (ডিবি) সঙ্গে দেখা করি। তিনি আমাদের এসি মহরমের সঙ্গে সংযুক্ত করে দেন। পরে এসি স্যারের নির্দেশে আমরা কাজ করি।
তিনি বলেন, বিভিন্ন তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে আসামিদের স্থান শনাক্ত করেন এসি মহরম স্যার। এরপর ২০ ফেব্রুয়ারি রাত দেড়টার দিকে আশুলিয়ার কুরগাঁও পুরাতন পাড়া এলাকায় অভিযান চালানো হয়। ওই এলাকা থেকে আগৈলঝাড়া উপজেলা জাতীয়তাবাদী সামাজিক সাংস্কৃতিক সংস্থার সাংগঠনিক সম্পাদক কবির মোল্লাকে গ্রেপ্তার করে এসি মহরম স্যারের হেফাজতে নেই আমরা। একই রাত আড়াইটায় কেরানীগঞ্জ থানাধীন মধ্যেরচর থেকে আগৈলঝাড়া উপজেলা ছাত্রদলের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক টিপু হাওলাদারকে গ্রেপ্তার করা হয়। এই দুজনকে ধরার সময় আমাদের সঙ্গে ডিবির সদস্যরাও ছিলেন।
সাক্ষ্যে তিনি উল্লেখ করেন, আসামিদের নিয়ে ডিএমপির ডিবি কার্যালয়ে যান তারা। এরপর একটি ভাড়া করা মাইক্রোবাসে টিপু ও কবিরকে নিয়ে বরিশালের উদ্দেশে রওনা দেওয়া হয়। তবে ভুরঘাটার আগে ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কের ঢাকা বাসস্ট্যান্ডের সামনে নেমে যান সিআইডির এই উপপরিদর্শক। পরে আসামিদের নিয়ে চলে যান এসআই নজরুল ইসলাম ও তার সঙ্গীয় ফোর্স।
সিআইডি কর্মকর্তা আরও বলেন, আমি লোকমুখে ও গণমাধ্যমে জানতে পারি যে, গ্রেপ্তার টিপু ও কবিরকে ক্রসফায়ারে হত্যা করা হয়েছে। মূলত এমপি আবুল হাসানাত আবদুল্লাহর সরাসরি নির্দেশে তৎকালীন এসপি এহসান উল্লাহর হুকুমে উজিরপুর থানার মাহাবুল ও জসিম এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছেন বলে জাসতে পেরেছি। তবে টিপু ও কবির ভালো মানুষ ছিলেন। এলাকায় তাদের সুনাম ছিল বলে জনশ্রুতি রয়েছে।
জবানবন্দি শেষে সাক্ষীকে জেরা করেন আসামিপক্ষের আইনজীবী আবুল হাসান ও স্টেট ডিফেন্স আইনজীবী আমির হোসেন। জেরা শেষে পরবর্তী সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য আগামী ২২ জুলাই দিন ধার্য করেছেন ট্রাইব্যুনাল।
ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানি করেন প্রসিকিউটর ফারুক আহাম্মদ। সঙ্গে ছিলেন প্রসিকিউটর সহিদুল ইসলাম সরদার, মার্জিনা রায়হানসহ অন্যান্য প্রসিকিউটর।
এমআরআর/বিআরইউ
