বিজ্ঞাপন

ভেতরে চলছিল শুনানি, বাইরে অ্যাম্বুলেন্সে শুয়েছিলেন ফজলে করিম

ভেতরে চলছিল শুনানি, বাইরে অ্যাম্বুলেন্সে শুয়েছিলেন ফজলে করিম

ঠিকঠাক সময়েই পৌঁছেছিলেন ট্রাইব্যুনালে। বিচারকাজও শুরু হয়েছিল নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী। কিন্তু গ্রেপ্তার আসামিদের একজনের দেখা মেলেনি কাঠগড়ায় কিংবা হাজতখানায়। অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে অ্যাম্বুলেন্সে শুয়েই কাটিয়ে দেন পুরো সময়। আর এজলাসে নিজ মক্কেলের অনুপস্থিতিতেই শুনানি চালিয়ে যান আইনজীবী।

এমন দৃশ্যই দেখা গেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় চট্টগ্রামে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলায় আসামিপক্ষের ডিসচার্জ (অব্যাহতি) আবেদনের শুনানির দিন ছিল আজ (বুধবার)। নিয়মানুযায়ী মামলার আসামিদের কারাগার থেকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়।

যথারীতি এদিন সকালে প্রিজনভ্যানে করে চার আসামিকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করে পুলিশ। তবে মামলাটির অন্যতম আসামি চট্টগ্রাম-৬ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ফজলে করিম চৌধুরীকে আনা হয় অ্যাম্বুলেন্সে। তার সঙ্গে ছিলেন কারা পুলিশ সদস্যরাও। তবে ট্রাইব্যুনালে আনা হলেও অ্যাম্বুলেন্স থেকে নামানো হয়নি ফজলে করিমকে। আর এ নিয়ে শুরু হয়েছে নানা আলোচনা।

প্রসিকিউশন জানায়, বিচারকাজকে বিলম্বিত করতেই গুরুতর অসুস্থতার মতো এমন অজুহাত সামনে এনেছেন ফজলে করিম। কারণ চাইলেই তিনি কাঠগড়ায় হাজির হতে পারতেন। কেননা স্বাস্থ্য প্রতিবেদন অনুযায়ী তার অসুস্থতা তেমন গুরুতর নয়। এরপরও তিনি পুরো সময়টা অ্যাম্বুলেন্সে কাটিয়েছেন। তবে আইন অনুযায়ী যেকোনো আসামি অসুস্থ বা অন্য কোনো কারণে এজলাসে উপস্থিত না থাকলেও তার আইনজীবী মামলার কাজ চালিয়ে যেতে পারেন।

আসামিপক্ষ বলছে, এপ্রিলের মাঝামাঝিতে কেরানীগঞ্জ কারাগারে নেওয়ার পথে আসামি বহনকারী ভ্যানটি দুর্ঘটনার কবলে পড়েছিল। এতে ঘাড়ে মারাত্মক আঘাত পেয়েছিলেন ফজলে করিম। এরপর পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে তাকে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (পিজি হাসপাতাল) ভর্তি করা হয়। বর্তমানে কারা কর্তৃপক্ষের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন তিনি।

সরেজমিন অ্যাম্বুলেন্সে দেখা যায়, ফজলে করিম শুয়ে আছেন। পাশেই রয়েছেন দুই কারা পুলিশ সদস্য। এ ছাড়া, ফজলে করিমের গলায় সার্ভাইক্যাল কলার বা ঘাড় ব্যথার বেল্ট প্যাঁচানো ছিল। 

ট্রাইব্যুনালে আজ (বুধবার) ডিসচার্জ চেয়ে শুনানি করেন এ মামলায় পলাতক ১৭ জনের পক্ষে সরকারি খরচে নিয়োগ পাওয়া চার আইনজীবী তথা আইনজীবী মো. আমির হোসেন, আবুল হাসান, ইশরাত জাহান ও মোহাম্মদ এনাম। 
প্রসিকিউশনের আনা অভিযোগে নিজেদের মক্কেলদের কোনো সম্পৃক্ততা নেই বলে দাবি করেন তারা। শুধুমাত্র রাজনৈতিক প্রতিহিংসা থেকে এসব মিথ্যা ও বানোয়াট অভিযোগ আনা হয়। এজন্য ১৭ আসামিরই অব্যাহতির আবেদন জানান এ  আইনজীবীরা।

এরপর ফজলে করিমের পক্ষে শুনানির জন্য দাঁড়ান আইনজীবী আবদুল কাইয়ুম। এ সময় তার মক্কেলের খবর জানতে চান ট্রাইব্যুনাল। তখন আইনজীবী জানান, তার মক্কেল পিজি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

এ সময় প্রসিকিউশন থেকে বলা হয়, ফজলে করিমকে অ্যাম্বুলেন্সের মাধ্যমে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়েছে। তিনি গাড়িতেই রয়েছেন।

তখন তাকে কাঠগড়ায় হাজির করানোর জন্য উপস্থিত পুলিশ সদস্যদের নির্দেশ দেন ট্রাইব্যুনাল। তবে ডিসচার্জ আবেদনের সময় উপস্থিত না করেও আসামিপক্ষে শুনানি করা যায় বলে জানান প্রসিকিউশন। শুধুমাত্র যেদিন আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করবেন ট্রাইব্যুনাল, সেদিন গ্রেপ্তার ব্যক্তিকে উপস্থিত থাকতে হবে। অতএব শুনানি হতে সমস্যা নেই।

প্রসিকিউশনের এমন কথায় সায় দেন ট্রাইব্যুনাল। এরপর নিজের মক্কেলের বিরুদ্ধে আনা প্রসিকিউশনের অভিযোগগুলো পুঙ্খানুপুঙ্খ তুলে ধরে যুক্তি উপস্থাপন করেন ফজলে করিমের আইনজীবী আবদুল কাইয়ুম। কী কারণে তাকে ডিসচার্জ দেওয়া যায়, সেসব আইনি ব্যাখ্যাও দেন তিনি। তবে তার শুনানি অসমাপ্ত রেখে আগামী ২৮ জুন পর্যন্ত মুলতবি করেন ট্রাইব্যুনাল-২ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল। প্যানেলের অন্য দুই সদস্য হলেন বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।

ট্রাইব্যুনালে উপস্থিত ছিলেন প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম, প্রসিকিউটর ফারুক আহাম্মদ, জহিরুল আমিন, মঈনুল করিম, মামুনুর রশিদ, মার্জিনা রায়হানসহ অন্যান্য প্রসিকিউটর।

গত ২২ জুন এ মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে বিচার শুরুর আর্জি জানায় প্রসিকিউশন।

জুলাই গণঅভ্যুত্থান চলাকালে চট্টগ্রামে ওয়াসিমসহ ছয়জনকে হত্যার ঘটনায় মামলাটি করা হয়। এতে সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদসহ ২২ জনকে আসামি করা হয়। এর মধ্যে ফজলে করিমসহ গ্রেপ্তার রয়েছেন পাঁচজন।

অন্যরা হলেন— যুবলীগ নেতা আজিজুর রহমান, তৌহিদুল ইসলাম, মো. ফিরোজ ও দেবাশীষ পাল দেবু।

হাছান মাহমুদ ছাড়া পলাতক আসামিরা হলেন— সাবেক শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র আ জ ম নাসির উদ্দীন, রেজাউল করিম, মহিউদ্দিন বাচ্চু, হেলাল আকবর, নুরুল আজিম রনি, শৈবাল দাশ সুমন, আবু ছালেক, এসবারুল হক, এইচএম মিঠু, নূর মোস্তফা টিনু, জমির উদ্দিন, ইমরান হাসান মাহমুদ, জাকারিয়া দস্তগীর, মহিউদ্দিন ফরহাদ ও সুমন দে।

প্রসিকিউশনের তথ্য অনুযায়ী, গত ৭ এপ্রিল তিনটি অভিযোগে ২২ জনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নেন ট্রাইব্যুনাল-২। ৫ এপ্রিল এ ফরমাল চার্জ দাখিল করা হয়। মামলার প্রথম অভিযোগে ওয়াসিম আকরাম, ফয়সাল আহমেদ শান্ত ও মো. ফারুককে হত্যার দায় আনা হয়। দ্বিতীয় অভিযোগে তানভীর সিদ্দিকী, সায়মন ওরফে মাহিম ও হৃদয় চন্দ্রকে শহীদ করার দায় আনা হয়। এ ছাড়া, জাহিদ হাসান, আবদুল কাদের, আছিয়া খাতুন, সানজিদা সুলতানা, আবদুল্লাহসহ শতাধিক ছাত্র-জনতাকে গুরুতর আহত করার কথা উল্লেখ করা হয় তিন নম্বর অভিযোগে।

এমআরআর/এসএএস/এনএফ