বিজ্ঞাপন

ট্রাইব্যুনালে ফাইয়াজের বাবা

অক্সিজেন মাস্ক খুলতেই বুঝলাম একমাত্র ছেলেটি আর নেই

অক্সিজেন মাস্ক খুলতেই বুঝলাম একমাত্র ছেলেটি আর নেই

মোহাম্মদ ফারহানুল ইসলাম ভূঁইয়া। ফারহান ফাইয়াজ নামেই বেশি পরিচিত ছিলেন। একমাত্র ছেলেকে নিয়ে মা-বাবার স্বপ্ন ছিল আকাশসম। কিন্তু সবকিছুই নিঃশেষ করে দিল একটি বুলেট। চব্বিশের জুলাইয়ে পুলিশের ছোড়া গুলিতে প্রাণ হারান মেধাবী এই শিক্ষার্থী। আর ছেলে হত্যার বিচার চেয়ে ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দিয়েছেন ফাইয়াজের বাবা শহিদুল ইসলাম ভূঁইয়া। 

বুধবার (২৪ জুন) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর সদস্য বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদের নেতৃত্বাধীন দুই সদস্যের বিচারিক প্যানেলে তার জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়। প্যানেলের অপর সদস্য বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী। 

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে রাজধানীর মোহাম্মদপুরে ৯ জনকে হত্যার ঘটনায় হওয়া মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলায় প্রথম সাক্ষী হিসেবে সাক্ষ্য দেন শহিদুল। ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই শহীদ হন তার ছেলে ফাইয়াজ। 

জবানবন্দিতে শহিদুল ইসলাম বলেন, ১৮ জুলাই সকাল ১০টায় বাসা থেকে বেরিয়ে কলেজে গিয়েছিল ফাইয়াজ। কলেজ থেকেই বন্ধুদের নিয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে অংশ নিয়েছিল ছেলেটি। তারা মিছিল নিয়ে মানিক মিয়া এভিনিউ হয়ে ধানমন্ডি-২৭ (পুরাতন) নম্বরে অবস্থান নেন। তাদের হাতে কোনো লাঠিসোঁটা ছিল না। কিন্তু তাদের ওপর চড়াও হয় পুলিশ ও আওয়ামী সন্ত্রাসী বাহিনী। একপর্যায়ে পুলিশের সহযোগিতায় ছাত্রদের ওপর নির্বিচারে গুলি চালায় আওয়ামী সন্ত্রাসীরা। একটি বুলেট এসে আমার একমাত্র ছেলের বুকেও ঢুকে যায়। তখন দুপুর আড়াইটা।

তিনি বলেন, ফাইয়াজের বুকে গুলি লাগার খবরটি ঘটনাস্থল থেকে একজন আমাকে ফোন করে জানান। খবরটি শুনে তাৎক্ষণিক আমি মালিবাগ অফিসে প্রায় হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। একপর্যায়ে দৌড়ে অফিস থেকে নেমে ধানমন্ডি-২৭ এর উদ্দেশে বের হই। একই পথে আমার বাসা কাকরাইলে গিয়ে স্ত্রী-মেয়েকে জানানো হয়। তাদের সঙ্গে নেওয়ার ইচ্ছা থাকলেও পরিস্থিতি অনুকূলে ছিল না। কারণ রাস্তাঘাটে তেমন যানবাহন মেলেনি। পরে আমি কিছুটা পথ হেঁটে, কিছুটা পথ দৌড়ে এবং কিছুটা রিকশায় যাচ্ছিলাম। পথে আরেকটা ফোনে জানতে পারি যে, আমার ছেলেকে লালমাটিয়া সিটি হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। এতে আমি সিটি হাসপাতাল পৌঁছানোর আগেই ফারহানের মামা মিজানুর রহমানকে ফোন করে জানানো হয়। তার বাসা মোহাম্মদপুরে। 

ফাইয়াজের বাবা বলেন, আমি হাসপাতালে পৌঁছানোর পর অনেক ছাত্রকে রক্তাক্ত হয়ে হাসপাতালে কাতরাতে দেখি। দৌড়ে আইসিইউতে উঠে দেখলাম ফারহানের মুখে অক্সিজেন মাস্ক লাগানো। আমি সেখানে দাঁড়িয়ে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করছিলাম। একপর্যায়ে চিকিৎসকরা ছেলেটির মুখের অক্সিজেন মাস্ক খুলে দেন। একইসঙ্গে কাপড় দিয়ে মুখ ঢেকে দিলেন। তখন বুঝলাম আমার ছেলে আর নেই। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দেওয়া মৃত্যুসনদে লেখা ছিল ঘটনাস্থলেই ফাইয়াজ মারা গিয়েছিল।

জবানবন্দিতে উল্লেখ করা হয়, ফাইয়াজের মৃত্যুর খবর পেয়ে অনেক অভিভাবক, শিক্ষক-শিক্ষিকাসহ প্রিন্সিপালও হাসপাতালে উপস্থিত হন। কলেজের মাঠে জানাজা দেওয়ার জন্য আমাকে অনুরোধ জানান তারা। আমি রাজি হই। কিন্তু আওয়ামী সন্ত্রাসী ও পুলিশ সদস্যরা হাসপাতাল ঘিরে রাখায় বের হওয়া যাচ্ছিল না। মানুষ যেন আন্দোলনে যেতে না হতে পারে সেজন্য সাউন্ড গ্রেনেড, অগ্নিসংযোগ ও টিয়ারশেল নিক্ষেপ করছিল তারা। আমরা অনেক কষ্টে হাসপাতালের পেছনের গেট দিয়ে ফাইয়াজের লাশ নিয়ে আল মারকাজুল দাফন কেন্দ্রে নিয়ে যাই। সেখান থেকে গোসল শেষে তাকে ঢাকা রেসিডেন্সিয়াল মডেল কলেজ মাঠে নেওয়া হয়। বিকেল সাড়ে ৫টায় তার প্রথম জানাজা সম্পন্ন হয়। জানাজা শেষে ফ্রিজিং গাড়িযোগে আমাদের গ্রামের বাড়ির উদ্দেশে রওনা দেই। পথে কাকরাইল থেকে আমার স্ত্রী ও মেয়েকে আরেকটি মাইক্রোবাসে রওনা হই। ওই সময় প্রথমে কাকরাইল মোড়ে পুলিশ ও আওয়ামী সন্ত্রাসী বাহিনীর বাধার মুখোমুখি হই। দ্বিতীয়বার যাত্রাবাড়ী মোড়ে বাধা দেন তারা। আমাদের গাড়ির গ্লাস ভাঙচুর করা হয়। তারা সম্ভবত ফাইয়াজে লাশ নিয়ে যেতে চেয়েছিল। তবে গ্রামের বাড়িতে পৌঁছানোর পর স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা লাশ দাফনের জন্য আমাদের মাত্র ৪০ মিনিট সময় দিয়েছিলেন। রাত সাড়ে ৯টায় তার দ্বিতীয় জানাজা শেষে বরপা সামাজিক কবরস্থানে দাফন করা হয়।

এ সময় একমাত্র ছেলের মৃত্যুর জন্য দায়ীদের সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করেছেন শহিদুল ইসলাম। এর মধ্যে মামলার আসামিদের নামও উল্লেখ করেন তিনি। তারা সবাই ওই দিন গুলি চালিয়েছিল বলে বিভিন্ন ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে।

মামলায় ২৮ আসামির মধ্যে গ্রেপ্তার চারজন হলেন- নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের মোহাম্মদপুর থানা শাখা সভাপতি নাঈমুল হাসান রাসেল, সহসভাপতি সাজ্জাদ হোসেন, আনসার সদস্য ওমর ফারুক ও যুবলীগকর্মী ফজলে রাব্বি।

পলাতক আসামিদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক মন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস, তৎকালীন ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান, সাবেক অ্যাডিশনাল ডিআইজি প্রলয় কুমার জোয়ারদার, ডিএমপির সাবেক যুগ্ম কমিশনার বিপ্লব কুমার সরকার, এডিসি রওশুনুল হক, এমএ সাত্তার, তোফায়েল, তারেকুজ্জামান, আরিফুর রহমান তুহিন, আহাদ হোসাইন, মো. ইউনূস, মোল্লা রুবেল, আজিজুল হক, রিয়াজ মাহমুদ, হৃদয়, মাইনুল ইসলাম, শেখ বজলুর রহমান, জহির উদ্দিন, আয়মান, সেন্টু মিয়া ও ডিএনসিসির ৩২ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর সৈয়দ হাসান নূর ইসলাম রাষ্ট্রন।

ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানি করেন প্রসিকিউটর সহিদুল ইসলাম সরদার। সঙ্গে ছিলেন প্রসিকিউটর তারেক আবদুল্লাহ, সুলতান মাহমুদসহ অন্যান্য প্রসিকিউটর।

এমআরআর/এমএসএ