বিজ্ঞাপন

সাবেক সহকর্মী, আত্মীয়, জমি-বিরোধ, ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব

জীবনের সব শত্রুকে তিনি গেঁথেছেন বৈষম্যবিরোধী মামলায়!

জীবনের সব শত্রুকে তিনি গেঁথেছেন বৈষম্যবিরোধী মামলায়!

চট্টগ্রাম নগরের কোতোয়ালী থানায় জুলাই গণঅভ্যূত্থানের সময় বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে হামলার অভিযোগে করা একটি মামলায় আসামির তালিকা ঘিরে নানা প্রশ্ন উঠেছে। মামলায় এমন অনেক ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে যাদের সঙ্গে বাদীর বিরোধের সূত্র তৈরি হয়েছিল বহু বছর আগে। 

অনুসন্ধানে জানা গেছে, সাবেক সহকর্মী, কলেজের শিক্ষক, পরিচালনা পরিষদের সদস্য, স্থানীয় বাসিন্দা, আত্মীয়-স্বজন এমনকি ব্যক্তিগত ও সম্পত্তিগত বিরোধ থাকা ব্যক্তিদের একই মামলায় আসামি করেছেন বাদী।

আলোচিত এ বাদীর নাম জাহাঙ্গীর আলম ওরফে জাহাঙ্গীর আলম দস্তগীর।

মামলার নথি, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য ও বিভিন্ন তথ্য পর্যালোচনায় জানা গেছে, তালিকাভুক্ত অনেক আসামির সঙ্গে জাহাঙ্গীরের সম্পর্কের অবনতি ঘটেছিল চাকরিচ্যুতি, পুরোনো অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ, সামাজিক বিরোধ কিংবা ব্যক্তিগত দ্বন্দ্বকে কেন্দ্র করে। এমনকি এজাহার দায়েরের কিছুদিন পর আরও বিপুলসংখ্যক ব্যক্তিকে একই মামলায় আসামি করার আবেদন করা হয়। যদিও আদালত তা গ্রহণ করেননি।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন সরকারের পতন হয়। এরপর ওই বছরের ৫ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম নগরের কোতোয়ালী থানায় একটি মামলা দায়ের করেন মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম ওরফে জাহাঙ্গীর আলম দস্তগীর। মামলার এজাহারে ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট নগরীর জিপিও এলাকায় বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে অংশ নেওয়ার সময় হামলার অভিযোগ করা হয়। এতে ১ নম্বর আসামি করা হয় সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদকে। মোট আসামি ১৮ জন। সাবেক ভূমিমন্ত্রী ছাড়া মামলায় যাদের নাম রয়েছে তাদের বড় একটি অংশের সঙ্গে জাহাঙ্গীর দস্তগীরের ব্যক্তিগত নানা বিরোধ রয়েছে।

আসামির তালিকায় বেশি কলেজের সাবেক সহকর্মী!

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মামলার আসামিদের মধ্যে ২ নম্বরে রয়েছেন চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার পশ্চিম পটিয়ার এজে চৌধুরী কলেজের অধ্যক্ষ মো. জসিম উদ্দিন। জাহাঙ্গীর আলম ওই কলেজের ইংরেজি বিভাগের প্রভাষক ছিলেন। ২০০৬ সালে নানা অভিযোগে কলেজ গভর্নিং বডির সিদ্ধান্তে তার চাকরি চলে যায়। এরপর থেকে কলেজ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে তার বিরোধ চলে আসছিল। চাকরিচ্যুতির পর তিনি কলেজের শিক্ষক ও পরিচালনা পরিষদের সদস্যদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগ দিয়ে আসছিলেন।

মামলার ৩ নম্বর আসামি সমীর রঞ্জন নাথ একই কলেজের শিক্ষক; ৪ নম্বর আসামি মনোয়ারা বেগম কলেজটির ইংরেজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক এবং ৫ নম্বর আসামি শামীমা আক্তার চৌধুরী ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক।

মামলার ১০ নম্বর আসামি এমএ সেলিম চৌধুরী ওই কলেজের প্রতিষ্ঠাতা আব্দুল জলিল চৌধুরীর (এজে চৌধুরী) পরিবারের সদস্য এবং কলেজের দাতা সদস্য। ২০২৪ সালের ২৪ জুন থেকে ২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিনি যুক্তরাজ্যের লন্ডনে ছিলেন। আসামি হওয়ার বিষয়টি জানাজানি হলে তিনি পুলিশ কমিশনার বরাবর দেওয়া আবেদনে নিজের পাসপোর্টের কপি জমা দেন।

মামলার ১১ নম্বর আসামি আব্দুস সালাম ১৯৯৭ সাল থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত এজে চৌধুরী কলেজ পরিচালনা পরিষদের সদস্য ছিলেন। মামলার ৬ নম্বর আসামি দিদারুল আলম চৌধুরীর বাড়ি শিকলবাহা এলাকায়। তার সঙ্গে জাহাঙ্গীরের পূর্ব বিরোধ রয়েছে। ৭ নম্বর আসামি মোস্তফা মোহাম্মদ এমরান একজন আইনজীবী ও একটি পত্রিকার প্রতিবেদক। তার সঙ্গে জাহাঙ্গিরের সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ রয়েছে।

এভাবে বাছাই করে করে নিজের পুরোনো শত্রুদের বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের মামলায় আসামি করেছেন জাহাঙ্গির আলম।

সম্প্রতি অবসরে যাওয়া এজে চৌধুরী কলেজের অধ্যক্ষ মো. জসিম উদ্দিন ঢাকা পোস্টকে বলেন, জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে নারী সহকর্মীদের হয়রানি ও অর্থ আত্মসাতসহ বিভিন্ন অভিযোগ ছিল। তার করা মামলাটি সম্পূর্ণ মিথ্যা ও বানোয়াট। ঘটনার সময় আমি ঢাকায় ছিলাম। ২০২৪ সালের ৩ আগস্ট আমি ঢাকায় গিয়েছিলাম এবং ৫ আগস্ট রাত ৯টায় চট্টগ্রামে ফিরে আসি।

মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম ওরফে জাহাঙ্গীর আলম দস্তগীর অতীতে কখনো আওয়ামী লীগের একনিষ্ঠ কর্মী, কখনো কিশোর মুক্তিযোদ্ধা, কখনো ম্যাজিস্ট্রেট, কখনো অধ্যক্ষ আবার কখনো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে পরিচয় দিতেন। এসব পরিচয়ে পত্রিকায় বিজ্ঞাপনও দিতেন তিনি। ওই বিজ্ঞাপনগুলোতে তিনি ছাত্রজীবনে স্কুল শাখা ছাত্রলীগের জিএস ছিলেন বলে দাবি করতেন। এছাড়া নিজেকে কিশোর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবেও দাবি করতেন তিনি। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে তার অসংখ্য কবিতা রয়েছে। তবে ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর নিজেকে আওয়ামীবিরোধী হিসেবে উপস্থাপন করে তিনি মামলা করেন

মামলার আরেক আসামি আইনজীবী ও সাংবাদিক মোস্তফা মোহাম্মদ এমরান বলেন, জাহাঙ্গীরের নানার বাড়ির সঙ্গে তাদের পরিবারের সম্পর্ক ছিল। জাহাঙ্গীর নিজেকে আইনজীবী পরিচয় দিয়ে বিভিন্ন জায়গায় প্রচার করতেন। ওই সময় কয়েকটি প্রতারণার অভিযোগে অভিযুক্ত হওয়ার পর তিনি আইনজীবী সমিতির সিদ্ধান্তসহ বিভিন্ন বিষয়ে আমার সহযোগিতা চেয়েছিলেন। সহযোগিতা করতে না পারায় আমার সঙ্গে বিরোধ তৈরি হয়।

তিনি বলেন, আমাদের পারিবারিক সম্পত্তি নিয়েও বিরোধ রয়েছে। সেই বিরোধের জেরেও আমাকে মামলায় আসামি করা হয়ে থাকতে পারে।

আরও ৮৮ জনকে আসামি করার ফন্দি, আছেন খালাতো বোনের স্বামীও!

এদিকে মামলার শুরুতে ১৮ জনের নাম উল্লেখ করলেও ২ সপ্তাহ পরে ২০২৪ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর জাহাঙ্গীর আলম কোতোয়ালী থানার ওই মামলায় আরও আসামি অন্তর্ভুক্তির জন্য চট্টগ্রাম চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে একটি আবেদন করেন। এতে তিনি এজাহারে আরও ৮৮ জনের নাম যুক্ত করার আবেদন করেন। আদালত ওই আবেদন নামঞ্জুর করে দেন।

নতুন করে করা ওই আবেদনে জাহাঙ্গির তার নিজের গ্রামের বাড়ির আত্মীয়, একই এলাকার বাসিন্দা এবং সাবেক জনপ্রতিনিধিদের নাম অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন। সেই তালিকায় ফটিকছড়ি ধর্মপুর গ্রামের সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান গোলাপ রহমানের (৭২) নামও ছিল বলে জানা গেছে। ছিল তার আপন খালাতো বোনের স্বামী এবং একই গ্রামের সাবেক ইউপি সদস্য নুরুল আলম সওদাগরের নামও।

আসামির তালিকা থেকে নাম কাটার কথা বলে নেন টাকা

অভিযোগ রয়েছে, মামলা দায়েরের পর আসামিদের নাম প্রত্যাহার বা ‘অভিযোগ নেই’ উল্লেখ করে আদালতে হলফনামা দেওয়ার বিনিময়ে অর্থ দাবি করতেন জাহাঙ্গীর। গত বছরের জুলাইয়ের শেষে নওশেদ জামাল নামে এক ব্যক্তিকে কোতোয়ালী থানার মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর পর ৩ আগস্ট আদালতে হলফনামা দিয়ে তার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই উল্লেখ করা হয় বলে জানা গেছে। এ ঘটনা অর্থের বিনমিয়ে হয়েছে বলে মনে করছেন আদালত সংশ্লিষ্টরা।

আগে পরিচয় দিতেন আওয়ামী ঘরানার

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম ওরফে জাহাঙ্গীর আলম দস্তগীর অতীতে কখনো আওয়ামী লীগের একনিষ্ঠ কর্মী, কখনো কিশোর মুক্তিযোদ্ধা, কখনো ম্যাজিস্ট্রেট, কখনো অধ্যক্ষ আবার কখনো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে পরিচয় দিতেন। এসব পরিচয়ে পত্রিকায় বিজ্ঞাপনও দিতেন তিনি। ওই বিজ্ঞাপনগুলোতে তিনি ছাত্রজীবনে স্কুল শাখা ছাত্রলীগের জিএস ছিলেন বলে দাবি করতেন। এছাড়া নিজেকে কিশোর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবেও দাবি করতেন তিনি। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে তার অসংখ্য কবিতা রয়েছে। তবে ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর নিজেকে আওয়ামীবিরোধী হিসেবে উপস্থাপন করে তিনি মামলা করেন। 

অভিযোগের বিষয়ে ‘জবাব’ নেই জাহাঙ্গীরের

অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম ওরফে জাহাঙ্গীর আলম দস্তগীরের ফোনে কল করা হয়। তিনি শুরুতে এ প্রতিবেদকের কাছ থেকে তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে বিস্তারিত শোনেন। এরপর তিনি ‘ব্যস্ত আছেন’ এবং পরবর্তীতে কল করবেন বলে ফোন কেটে দেন। পরে টানা দুদিন তাকে আরও অনেকবার কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি।

এরপর তাকে একাধিক খুদে বার্তা পাঠানো হয় বক্তব্যের জন্য। এতে সাড়া দিয়ে গতকাল ১ জুলাই বিকেলে দুটি খুদে বার্তা পাঠান জাহাঙ্গীর আলম। সেখানে তিনি ব্যক্তিগত বিরোধের কারণে আসামি করার বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি। 

মামলার বিষয়ে বলেন, ‘ঘটনার হুকুমদাতা হলেন সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ, তাই তাকে প্রধান আসামি করা হয়েছে। প্রথম এজাহারে তাকেসহ ১৮ জনকে এবং সম্পূরক এজাহারে ৭০ জনকে আসামি করা হয়েছে। প্রথম এজাহার একজনের ভুলের কারণে সংক্ষিপ্ত হয়ে গেছে। এ কারণে দ্বিতীয় এজাহারে হত্যা এবং গুরুতর আঘাতের সংশ্লিষ্ট ধারা যুক্ত করা হয়েছে।’

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও কোতোয়ালী থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মো. ইকবাল হোসেন ঢাকা পোস্টকে বলেন, আমরা সবগুলো বিষয় যাচাই-বাছাই করছি। মামলাটি তদন্তাধীন রয়েছে। এ বিষয়ে তাই এখনই মন্তব্য করা যাচ্ছে না।

চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ মঈনুদ্দিন ঢাকা পোস্টকে বলেন, জাহাঙ্গীর নিজেকে কখনো বিচারক, কখনো আইনজীবীসহ নানা পরিচয় দেন। তার বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ জমা হয়েছে। মূলত তিনি একধরনের প্রতারক। তাকে একাধিকবার গ্রেপ্তারও করা হয়েছিল। 

তিনি বলেন, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের ঘটনায় জাহাঙ্গীর মামলা করে নিরীহ লোকজনকে আসামি করেছেন, যাদের সঙ্গে তার পূর্বশত্রুতা ছিল। বিষয়টি এখন সবাই জেনেছেন। আশা করি, নিরপরাধ ব্যক্তিরা তার মামলা থেকে রেহাই পাবেন।

এমআর/এমএসএ