বিজ্ঞাপন

আইন বিশেষজ্ঞদের অভিমত

পঞ্চদশ সংশোধনীর রায় ‘ঐতিহাসিক ও সুষম’, রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত সংসদের হাতেই

পঞ্চদশ সংশোধনীর রায় ‘ঐতিহাসিক ও সুষম’, রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত সংসদের হাতেই

বহুল আলোচিত সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীতে আনা কয়েকটি বিষয় অবৈধ ঘোষণা করে হাইকোর্টের রায় বহাল রেখেছেন আপিল বিভাগ। এই রায়ের ফলে সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ফিরেছে ও গণভোটের বিধান পুনঃপ্রবর্তিত হয়েছে।

অন্যদিকে রাষ্ট্রের পলিসি নির্ধারণ, জাতির পিতা ইস্যু, সংবিধানের প্রস্তাবনা, আর্টিকেল ৮, ৯, ১০, ১১, ১২, ২৫ এই নীতির বিষয়গুলোর সিদ্ধান্ত নেওয়া পরিপূর্ণভাবে সংসদের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। আইন বিশেষজ্ঞরা আপিল বিভাগের এ রায়কে ঐতিহাসিক ও সুষম রায় বলে উল্লেখ করেছেন। তারা বলছেন, আপিল বিভাগ আজকের রায়ে কোনো পলিসি ডিসিশন বিষয়ে হস্তক্ষেপ করেননি। রাজনৈতিক বিষয় রাজনীতিবিদদের হাতে অর্থাৎ সংসদের কাছে অর্পন করা হয়েছে। ঐতিহাসিক এ রায়ে আদালত ও সংসদের কাজ পৃথকভাবে নির্ধারিত হয়েছে।

এ বিষয়ে রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল ঢাকা পোস্টকে বলেন, রাজনৈতিক মহলে অভিযোগ ছিল, একদলীয় শাসনের দিকে দেশকে নিয়ে যেতে এবং মানুষের ভোটাধিকার বঞ্চিত করতে পঞ্চদশ সংশোধনী আনা হয়েছিল। হাইকোর্ট এক রায়ে এই সংশোধনীর চারটি সুনির্দিষ্ট বিষয় বাতিল ঘোষণা করে। এর মধ্যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনা, গণভোটের অধিকার ফেরানো, সুপ্রিম কোর্টের ক্ষমতা খর্ব করার অপচেষ্টা বাতিল এবং ৭(ক) ও ৭(খ) অনুচ্ছেদ বাতিলের বিষয়টি ছিল। আপিল বিভাগ এই রায় বহাল রেখেছেন।

আদালতের রায়ে শুধু তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিলের সংশোধনীটি বাতিলই করা হয়নি, রায়ের মাধ্যমে সেটি রিস্টোরও (পুনর্বহাল) করা হয়েছে। 

পঞ্চম সংশোধনী নিয়ে আপিল বিভাগের রায়কে সুষম ও সন্তোষজনক মন্তব্য করে সংবিধান বিশেষজ্ঞ ও সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী আহসানুল করিম ঢাকা পোস্টকে বলেন, আমি মনে করি রায় সঠিক ও সন্তোষজনক হয়েছে। পলিসি ডিসিশন সংসদের হাতে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। পার্লামেন্ট আইন বানায়, পার্লামেন্ট চেঞ্জ করে। সুতরাং এটা তো পার্লামেন্টের এখতিয়ার। পার্লামেন্ট কী করবে, না করবে—জাতির আশা-আকাঙ্ক্ষা পার্লামেন্টই পূরণ করবে। কোর্ট দেখবে পার্লামেন্টের কোনো আইন ঠিক আছে কি না, ঠিক নাই। এখন এগুলো যদি সংশোধন করতে হয়, ‘ইট ইজ পার্লামেন্ট হুইচ উইল টেক ইট।’ আপিল বিভাগ সম্পূর্ণ এখতিয়ারের মধ্যে রায় দিয়েছেন। আমি বলবো সুষ্ঠু এবং সুষম রায় হয়েছে, সুষম একটা জাজমেন্ট হয়েছে।’

আরেক সংবিধান বিশেষজ্ঞ জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ব্যারিস্টার ইমরান আবদুল্লাহ সিদ্দিক ঢাকা পোস্টকে বলেন, আপিল বিভাগ আপিলটি খারিজ করে দিয়েছেন। এর ফলে বাংলাদেশে কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে আনা সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী চূড়ান্তভাবে বিলুপ্ত হয়েছে। এখন সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতিসহ প্রয়োজনীয় সাংবিধানিক সংস্কার কার্যক্রম পরিচালনা করা সংসদের দায়িত্ব, যাতে তা দেশের সাধারণ মানুষের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়।

সংবিধান বিশেষজ্ঞ ও এই মামলায় জামায়াতে ইসলামীর পক্ষে শুনানি করা জ্যেষ্ঠ আইনজীবী অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনির বলেন, আজকের রায়ে চারটি বিষয়কে অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হলো; যে চারটি বিষয় হাইকোর্ট অসাংবিধানিক ঘোষণা করেছিলেন, তার মধ্যে এক নম্বর ছিল আমাদের বর্তমান সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৭-এর  ‘ক’ এবং ৭-এর ‘খ’। ৭-এর ‘ক’ এবং ‘খ’-তে ছিল—এই সংবিধানের কতগুলো বিষয় আছে এগুলো পরিবর্তন করা যাবে না; যদি কেউ পরিবর্তন করেন তাহলে সেটা হবে সাংবিধানিক রাষ্ট্রদ্রোহিতা, ‘কন্সটিটিউশনাল সেডিশন’। আমাদের হাইকোর্ট বিভাগ এই অনুচ্ছেদকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করেছিলেন; আপিল বিভাগেও এই অনুচ্ছেদ অসাংবিধানিক থেকে গেল।

​দ্বিতীয়, আমাদের হাইকোর্ট বিভাগ গণভোটের যে বিধান ছিল, এই গণভোটের বিধানকে পুনঃপ্রবর্তন করেছিলেন।

​তৃতীয় হলো, বাংলাদেশ সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৪৪-এর ২ অনুযায়ী নিম্ন আদালতকে রিটের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল। হাইকোর্ট বিভাগ এই রিটের ক্ষমতা দেওয়াকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করেছিলেন। আমাদের আপিল বিভাগ এই অসাংবিধানিক ঘোষণা করার জায়গাটাকে অসাংবিধানিক রেখেছেন, অর্থাৎ হাইকোর্ট ডিভিশন ছাড়া আর কোনো আদালতে রিট আবেদন করার কোনো এখতিয়ার থাকবে না।

​আর চতুর্থ ছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকার। পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধানকে বাতিল ঘোষণা করা হয়েছিল। আমাদের হাইকোর্ট বিভাগ ওই বাতিলটাকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করেছিলেন। আপিল বিভাগের আজকের রায়ের মাধ্যমে ওই তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলটাকে বাতিল করেছেন, সেই বিষয়টা বহাল থাকবে। অর্থাৎ, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ফিরে আসতে আর কোনো বাধা থাকলো না। এছাড়া বাকি যে বিষয়গুলো ছিল, এগুলো মহান জাতীয় সংসদের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। মহান জাতীয় সংসদের কাছে আমাদের এক্সপেক্টেশন হবে, পাস করার ক্ষেত্রে জুলাই চার্টারের বিষয়গুলোকে বিবেচনা করবেন। কারণ জুলাই চার্টারটাও আমরা দেখিয়েছিলাম আপিল বিভাগে। জুলাই চার্টারে বেশ কিছু বিষয়ে ঐকমত্য পোষণ করা হয়েছিল। এই বিষয়গুলো করতে, অ্যামেন্ডমেন্ট আনতে কিংবা সংস্কার করতে পার্লামেন্টের সামনে আর কোনো বাধা থাকলো না।

তবে কিছুটা ভিন্নমত ব্যাখ্যা দিয়ে রিটকারীর আইনজীবী ড. শরীফ ভূঁইয়া বলেন, হাইকোর্টের রায়ে যেগুলো বাতিল হয়েছিল, সেগুলোই আপিল বিভাগের রায়ে বহাল রয়েছে।

তবে এখানে কিছু টেকনিক্যাল সমস্যা আছে। কারণ হাইকোর্টের রায়ে সবগুলো বিধান বাতিল হয়নি। আরও কিছু বিধান বাতিল করা প্রয়োজন ছিল। যেমন উপদেষ্টা, প্রধান উপদেষ্টার শপথ নেওয়া সংক্রান্ত বিধান সংবিধানে ফিরে আসেনি। বিচারপতিরা যে উপদেষ্টা বা প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব নিতে পারবেন, সেই বিষয়ে একটা বিধান ছিল; সেটা ফিরে আসেনি। আমরা ভেবেছিলাম আপিল বিভাগ পঞ্চদশ সংশোধনী পুরোটা বাতিল না করলেও এসব বিষয়ে কিছু অবজারভেশন দেবেন বা এই যে অতিরিক্ত যে ধারাগুলো বাতিল করা প্রয়োজন, সেগুলো বাতিল করবেন। তবে বাতিল না করাতে এখন যেটা হলো, এই টেকনিক্যাল বিষয়গুলো সংসদকে সুরাহা করতে হবে।

এমএইচডি/এসএম