ডেঙ্গু মশক নিধন কার্যক্রমে ব্যবহারের জন্য ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৫ হাজার কেজি কীটনাশক (ব্যাসিলাস থুরিনজিয়েনসিস ভ্যার. ইসরায়েলেনসিস—বিটিআিই) সরবরাহের জন্য দরপত্র আহ্বান করেছিল ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন (ডিএনসিসি)। শর্ত ছিল, কীটনাশকটি হতে হবে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া অথবা ভারতের তৈরি।
দরপত্রে অংশ নিয়ে কার্যাদেশ পায় দেশীয় প্রতিষ্ঠান মার্শাল এগ্রোভেট কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড। চুক্তি অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানটি সিঙ্গাপুরের বেস্ট কেমিক্যাল কোং(এস) পিটিই লিমিটেডের নামাঙ্কিত মোড়কে পণ্য সরবরাহের দাবি করে। শের-ই-বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষাগারে ল্যাব টেস্টের পর তৎকালীন স্থানীয় সরকারমন্ত্রী ও মেয়রের উপস্থিতিতে আড়ম্বরপূর্ণ এক পাইলট প্রকল্পের মধ্য দিয়ে কীটনাশকটি উদ্বোধন করা হয়। কিন্তু পরবর্তী সময়ে সিঙ্গাপুরের ওই প্রতিষ্ঠান নিজেরাই জানিয়ে দেয় তারা এমন কোনো কীটনাশক সরবরাহ করেনি। এরপরই একে একে বেরিয়ে আসে পুরো জালিয়াতির চিত্র।
নকল মোড়কে জালিয়াতি, মন্ত্রী-মেয়রের উদ্বোধনের পর ফাঁস
২০২৩ সালের এই ঘটনায় মামলা দায়েরের প্রায় তিন বছর পর মার্শাল এগ্রোভেটের চেয়ারম্যান, ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও নির্বাহী পরিচালককে অভিযুক্ত করে আদালতে চার্জশিট দাখিল করেছে গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ডিবির পরিদর্শক মো. জেহাদ হোসেন সম্প্রতি এই চার্জশিট জমা দেন। চার্জশিটে উল্লেখ করা হয়, ২০২৩ সালের ১২ মার্চ ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন ৫ হাজার কেজি কীটনাশক সরবরাহের জন্য দরপত্র আহ্বান করে। মার্শাল এগ্রোভেট কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড ১ কোটি ৬৯ লাখ ২৬ হাজার ৫ টাকার দরপত্রে অংশ নিয়ে কার্যাদেশ পায় এবং নিয়ম অনুযায়ী প্রায় ১৬ লাখ ৯২ হাজার টাকা পারফরম্যান্স সিকিউরিটি জমা দেয়।
এরপর ১ আগস্ট চুক্তি মোতাবেক প্রতিষ্ঠানটি সিঙ্গাপুরের বেস্ট কেমিক্যাল কোং(এস) পিটিই লিমিটেডের নামাঙ্কিত মোড়কে পণ্য সরবরাহের দাবি করে, যা শের-ই-বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষাগারে পাঠানোর পর ৩ আগস্ট একটি পাইলট প্রকল্পে উদ্বোধন করা হয়। ওই অনুষ্ঠানে লি কিউইয়াং নামে এক ব্যক্তিকে সিঙ্গাপুরি কোম্পানির প্রতিনিধি হিসেবে পরিচয় করিয়ে কীটনাশকের ব্যবহারবিধি প্রশিক্ষণও দেওয়া হয়, যা গণমাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়। তবে ১৪ আগস্ট সিঙ্গাপুরের বেস্ট কেমিক্যাল কোং(এস) পিটিই লিমিটেড তাদের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে জানিয়ে দেয় তারা সিঙ্গাপুর থেকে এই কীটনাশক সরবরাহ করেনি। বিষয়টি নজরে আসার পর সিটি কর্পোরেশন কোম্পানিটির সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করলে তারা লিখিতভাবেও একই তথ্য নিশ্চিত করে।
তদন্তে জানা যায়, মার্শাল এগ্রোভেটের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আলী, ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আলাউদ্দিন ও নির্বাহী পরিচালক নাসির উদ্দিন আহমেদ কোনো অজ্ঞাত উৎস থেকে সংগৃহীত রাসায়নিক সিঙ্গাপুরের বেস্ট কেমিক্যাল কোং(এস) পিটিই লিমিটেডের নকল মোড়কে ভরে জালিয়াতির মাধ্যমে সরবরাহ করেছিলেন। তদন্ত কর্মকর্তা জানান, তাদের বিরুদ্ধে প্রতারণামূলক বিশ্বাসভঙ্গের অভিযোগ প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত হয়েছে। তবে নাম-ঠিকানা যাচাই-বাছাই না করতে পারায় বিদেশি নাগরিক লি কিউইয়াংকে অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়েছে।
এ বিষয়ে তদন্ত কর্মকর্তা মো. জেহাদ হোসেন বলেন, ২০২৫ সালের আগস্টে তিনি মামলার তদন্তভার পান। তার আগে দুজন কর্মকর্তা মামলাটি তদন্ত করেছিলেন। ঘটনাস্থল পরিদর্শন এবং বাদী ও সাক্ষীদের জিজ্ঞাসাবাদ শেষে আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত হওয়ায় তাদের অভিযুক্ত করা হয়েছে বলে জানান তিনি। পাশাপাশি নাম-ঠিকানা না পাওয়ায় বিদেশি নাগরিককে অব্যাহতির সুপারিশ করার কথাও উল্লেখ করেন।
দশ দিনের হাজতবাসের পর জামিনে আসামিরা
মশক নিধনের কীটনাশক সরবরাহে জালিয়াতি ও প্রতারণার অভিযোগ তুলে ২০২৩ সালের ২১ আগস্ট মার্শাল এগ্রোভেট কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের তিন কর্মকর্তা ও চীনা নাগরিক লি কিউইয়াংকে আসামি করে মামলা দায়ের করেন ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের সহকারী ভাণ্ডার ও ক্রয় কর্মকর্তা মো. রাহাত আল ফয়সাল। এরপর ২৪ আগস্ট উচ্চ আদালত থেকে ছয় সপ্তাহের জামিন পান আসামিরা। জামিনের মেয়াদ শেষ হলে উচ্চ আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী ৫ অক্টোবর ঢাকার সিএমএম আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিনের আবেদন করেন তারা। ওইদিন আদালত জামিন নামঞ্জুর করে তাদের কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। পরে ৭ অক্টোবর আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য দশ দিনের রিমান্ড চাওয়া হয় এবং ৯ অক্টোবর রিমান্ড শুনানির দিন ধার্য করেন আদালত। ওই দিন আদালত রিমান্ড ও জামিনের আবেদন উভয়ই নামঞ্জুর করেন। অবশেষে ১৬ অক্টোবর জামিন আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে পাঁচ হাজার টাকা মুচলেকায় আদালত তাদের জামিন মঞ্জুর করেন। তখন থেকে আসামিরা জামিনে রয়েছেন।
আসামিদের পক্ষের আইনজীবী সেলিনা বেগম (ইউনা) বলেন, তিনি এই মামলায় আসামিদের পক্ষে নিয়মিত হাজিরা দিচ্ছেন এবং মামলাটিতে তদন্ত প্রতিবেদনের জন্য দিন ধার্য রয়েছে। তবে ডিবির দাখিল করা চার্জশিট এখনও তিনি দেখেননি বলে মন্তব্য করেন।
মামলার বিবরণী থেকে
মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের ডেঙ্গু মশক নিধন কাজে ব্যবহারের জন্য পাঁচ হাজার কেজি কীটনাশক সরবরাহের কাজে দরপত্র আহ্বান করা হয়। এতে মার্শাল এগ্রোভেট কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড দরপত্র দাখিল করলে কোম্পানির দর কর্তৃপক্ষ কর্তৃক অনুমোদিত হয়। দরপত্রের চুক্তি মোতাবেক উল্লিখিত কীটনাশক সিঙ্গাপুর থেকে আমদানি করে সরবরাহ করার এবং একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত গ্যারান্টি থাকার কথা ছিল। এরপর আসামিরা সিঙ্গাপুর থেকে আমদানি করা বলে দাবি করে সেই দেশীয় কোম্পানি বেস্ট কেমিক্যাল কোম্পানি লিমিটেডের নাম ও মোড়ক ব্যবহার করে ২০২৩ সালের ১ আগস্ট উল্লিখিত কীটনাশক ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের ক্রয় ভাণ্ডারে সরবরাহ করে।
সরবরাহের পর ৩ আগস্ট প্রকল্পের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান হয়, যেখানে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের মেয়র এবং স্থানীয় সরকারমন্ত্রী উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানে আসামিরা চীনা নাগরিক লি কিউইয়াংকে সিঙ্গাপুরের কোম্পানির প্রতিনিধি হিসেবে উপস্থাপন করেন। পরবর্তী সময়ে অনুষ্ঠানের সংবাদ গণমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমে প্রচারিত হলে তা সিঙ্গাপুরের বেস্ট কেমিক্যাল কোম্পানির দৃষ্টিগোচর হয়। ১৪ আগস্ট তারা তাদের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে পোস্ট করে জানায়, তারা বাংলাদেশের কোনো প্রতিষ্ঠানকে উল্লিখিত কীটনাশক সরবরাহ করেনি। পোস্টটি প্রকাশের পর ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হলে গত ১৭ আগস্ট সিঙ্গাপুরের কোম্পানিটি আসামিদের প্রতারণার বিষয়টি লিখিতভাবে অবহিত করে।
এনআর/এসএম
