বিজ্ঞাপন

জোবায়েদ হত্যা : ছাত্রী-প্রেমিকসহ ৩ জনকে অভিযুক্ত করে চার্জশিট

জোবায়েদ হত্যা : ছাত্রী-প্রেমিকসহ ৩ জনকে অভিযুক্ত করে চার্জশিট

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) শিক্ষার্থী ও শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য জোবায়েদ হোসেন হত্যা মামলায় তার ছাত্রী বার্জিস শাবনাম বর্ষাসহ ৩ জনকে অভিযুক্ত করে চার্জশিট দাখিল করেছে পুলিশ। অপর আসামিরা হলেন বর্ষার প্রেমিক মো. মাহির রহমান এবং মাহিরের বন্ধু ফারদীন আহম্মেদ আয়লান। এরা তিনজনই হত্যার দায় স্বীকার করে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।

বুধবার (১৫ জুলাই) আদালতে বংশাল থানার সাধারণ নিবন্ধন শাখার কর্মকর্তা পুলিশের উপ-পরিদর্শক (এসআই) কামাল হোসেন ঢাকা পোস্টকে বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি বলেন, গত ৩০ জুন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা বংশাল থানার উপ-পরিদর্শক আশরাফ হোসেন এ চার্জশিট দাখিল করেন। আগামী ১২ আগস্ট চার্জশিট গ্রহণের বিষয়ে শুনানি হবে।

চার্জশিটে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা উল্লেখ করেন, ভিকটিম মো. জোবায়েদ হোসেন (২৫) জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের ১৫তম ব্যাচের ছাত্র। তিনি জীবিকা নির্বাহের জন্য টিউশনি করতেন। 

জোবায়েদ দীর্ঘদিন আসামি বর্ষার বাসায় গৃহশিক্ষক হিসেবে পড়াতেন। এই সূত্রে ভিকটিম ও আসামির মধ্যে ঘনিষ্ঠতা গড়ে ওঠে। 

তদন্তে আরও প্রকাশ পায়, বর্ষার সঙ্গে অপর আসামি মাহিরের দীর্ঘদিনের প্রেমঘটিত সম্পর্ক ছিল। পরবর্তী সময়ে বাসায় টিউশন পড়ানোর শিক্ষক জোবায়েদ হোসেনের সঙ্গেও বর্ষার সম্পর্ক গড়ে ওঠে। দুজনের শারীরিক সম্পর্কের বিষয়টি জানতে পেরে মাহির চরম ক্ষুব্ধ ও প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে ওঠে। 

আসামিদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি পর্যালোচনায় দেখা যায়, ভিকটিমের কাছে নিজের আপত্তিকর ছবি ও ভিডিও সংরক্ষণের অভিযোগ তুলে তাকে হত্যা করতে মাহিরকে প্ররোচিত করে বর্ষা। মাহির তার বন্ধু আয়লানকে বিষয়টি অবহিত করে। পরে তার সহায়তায় ভিকটিমকে হত্যার পরিকল্পনা গ্রহণ করে। এর অংশ হিসেবে একটি সুইচ গিয়ার চাকু সংগ্রহ করে এবং ঘটনাস্থল সম্পর্কে বেশ কিছুদিন রেকি করে।

তদন্তকারী কর্মকর্তা চার্জশিটে আরও উল্লেখ করেন, তদন্তে উদ্ধার করা ডিজিটাল আলামত, বিশেষত আসামি বর্ষার মোবাইল ফোন এবং ভিকটিমের মোবাইল ফোন বিশ্লেষণে দেখা যায়, ঘটনার দিন এবং আগেও উভয়ের মধ্যে হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। ঘটনার দিন বিকেল ৪টা ২৭ মিনিটে উভয়ের মধ্যে লাইভ লোকেশনও শেয়ার হয়। একই সময়ে বর্ষা ও মাহিরের মধ্যেও একাধিকবার যোগাযোগ হয়। এতে প্রতীয়মান হয়, বর্ষা পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ভিকটিমের অবস্থান ও চলাফেরার তথ্য মাহিরকে সরবরাহ করছিলেন। ঘটনার দিন পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী বর্ষার বাসায় জোবায়েদ পড়াতে গেলে মাহির ও আয়লান ঘটনাস্থলে ওত পেতে থাকে। ভিকটিম বাসার নিচতলায় প্রবেশ করলে মাহির তাকে কথোপকথনের নামে থামিয়ে তার সঙ্গে বাকবিতণ্ডায় জড়ায়। এক পর্যায়ে মাহির তার কাছে থাকা সুইচ গিয়ার চাকু দিয়ে ভিকটিমের গলার সজোরে আঘাত করে। এতে ভিকটিম গুরুতর আহত অবস্থায় আত্মরক্ষার্থে সিঁড়ির ওপরের দিকে দৌড়ে উঠতে গেলে তৃতীয় তলার সিঁড়িতে লুটিয়ে পড়ে। পরে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে সেখানেই মারা যান।

মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে, জোবায়েদ হোসেন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার পাশাপাশি টিউশনি করাতেন। প্রতিদিনের মতো তিনি ২০২৫ সালের ১৯ অক্টোবর বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে বংশাল থানাধীন ৩১ নম্বর ওয়ার্ডে নুর বক্স লেন এর ১৫ নম্বর হোল্ডিং রৌশান ভিলায় পড়ানোর জন্য যান। একই তারিখে সন্ধ্যা প্রায় ৫টা ৪৮টার সময় ওই ছাত্রী জোবায়েদ হোসেনের বিশ্ববিদ্যালয়ের ছোট ভাই সৈকতকে ম্যাসেঞ্জারের মাধ্যমে জানায় যে, জোবায়েদ স্যার খুন হয়ে গেছে, কে বা কারা জোবায়েদ স্যারকে খুন করে ফেলছে। এ বিষয়টি ওইদিন রাত অনুমান ৭টার সময় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র কামরুল হাসান ভুক্তভোগী জোবায়েদের ভাই এনায়েত হোসেনকে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে জানান। পরে এনায়েত তার শ্যালক শরীফ মোহাম্মদকে সঙ্গে নিয়ে মোটরসাইকেলে ওইদিন রাত সাড়ে আটটার দিকে ঘটনাস্থল রৌশান ভিলায় পৌঁছান। ওই ভবনের নিচতলা থেকে ওপরে ওঠার সময় তিনি সিঁড়ি এবং দেয়ালে রক্তের দাগ দেখতে পান। ওই ভবনের ৩য় তলার রুমের পূর্ব পার্শ্বে সিঁড়িতে গেলে সিঁড়ির ওপর জোবায়েদের রক্তাক্ত মরদেহ উপুড় অবস্থায় দেখতে পান। পরে ময়নাতদন্ত শেষে গত ২০ অক্টোবর জোবায়েদকে কুমিল্লার কৃষ্ণপুর গ্রামে দাফন করা হয়। 

এ ঘটনায় ২১ অক্টোবর সকাল ১০টার দিকে জোবায়েদের ভাই এনায়েত হোসেন সৈকত বাদী হয়ে রাজধানীর বংশাল থানায় হত্যা মামলা করেন। ওইদিনই বর্ষাসহ এই তিন আসামি নিজেদের দোষ স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দেন। এরপর তাদের কারাগারে পাঠানো হয়। এ ছাড়া এ মামলায় ওইদিন প্রীতম নামে আরেকজন সাক্ষী হিসেবে আদালতে জবানবন্দি দেন।

এনআর/এসএম

বিজ্ঞাপন