বিজ্ঞাপন

যে আমড়া গাছের নিচে ছেলেকে খুঁজতেন মা, সেই কবরে আবারও চারা

যে আমড়া গাছের নিচে ছেলেকে খুঁজতেন মা, সেই কবরে আবারও চারা

প্রায় ১৭ মাস ধরে ছেলে সোহেল রানার খোঁজে বুকভাঙা অপেক্ষা মা রাশেদা বেগমের। সুযোগ পেলেই ছুটে যেতেন গণকবরে। ১১৪টি কবরের ভিড়ে একটি আমড়া গাছের নিচে বসেই নীরবে ফেলতেন চোখের পানি। একদিন ডিএনএ পরীক্ষার ফল জানিয়ে দিল- সেই গাছের নিচেই চিরনিদ্রায় শায়িত তার ছেলে। তবে কবর সংস্কারের সময় কেটে ফেলা হয় আমড়া গাছটি। ছেলের কবর চেনার শেষ চিহ্নটুকুও যেন হারিয়ে গেল।

মায়ের আকুতি শুনে শেষমেশ আমড়া গাছের চারা রোপণের ব্যবস্থা করে দিল আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল প্রসিকিউশন। 

ছাত্র-জনতার আন্দোলনে অংশ নিয়ে রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর কাজলা এলাকায় গুলিতে প্রাণ হারান সোহেল। পরিবারের খোঁজ না মেলায় আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের মাধ্যমে বেওয়ারিশ হিসেবে রায়েরবাজারের গণকবরে তাকে দাফন করা হয়েছিল।

সোহেলের বাড়ি মুন্সিগঞ্জের লৌহজং উপজেলার ঘোড়দৌড়া এলাকায়। করতেন কাপড়ের ব্যবসা। বাবার নাম মো. লালমিয়া।

জানা যায়, ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই যাত্রাবাড়ীর কাজলায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে অংশ নেন সোহেল। এরপর আর বাড়ি ফেরেননি। এর মধ্যেই সোহেলের মরদেহ সম্বলিত একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে ফেসবুকে। স্বজনরা তাকে শনাক্ত করলেও কোথায় দাফন করা হয়, তা জানতেন না কেউ।

স্বজনরা জানান, নিহতের ৩৪ দিন পর বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা মরদেহের নথিতে সোহেলের ছবি খুঁজে পান পরিবারের সদস্যরা। এরপর থেকেই বড় ছেলের ছবি হাতে নিয়ে প্রায়ই ‍গণকবরের একটি আমড়া গাছের নিচে কান্নাকাটি করতেন সোহেলের মা। ১১৪টি বেওয়ারিশ কবর থাকলেও বারবারই তিনি ছুটে যেতেন ২৯ নম্বর কবরের সামনে।

চলতি বছরের ৫ জানুয়ারি ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে সোহেল রানার কবর শনাক্ত হয়। অর্থাৎ আমড়া গাছের নিচে থাকা ২৯ নম্বর কবরটিই তার ছিল বলে নিশ্চিত করে সিআইডি। তবে দীর্ঘ ১৭ মাস পর কবর খুঁড়লেও ছেলের দেহের কোনো অস্তিত্ব পাননি রাশেদা বেগম। শুধু পড়েছিল হাড়গোড়। 

প্রসিকিউশন জানায়, প্রথমবারের মতো ১৫ জুলাই রায়েরবাজার বুদ্ধিজীবী কবরস্থানের গণকবর পরিদর্শনে যান আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলামের নেতৃত্বাধীন প্রসিকিউশন দল। পরিদর্শনে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার পাশাপাশি কয়েকটি গাছও রোপণ করেন তিনি।

এদিন কাকতালীয়ভাবে ছেলের কবর দেখতে আসেন শহীদ সোহেল রানার মা রাশেদা বেগমও। কবর সংস্কারের সময় ছেলের পাশে থাকা আমড়া গাছটি কেটে ফেলায় আক্ষেপের কথা জানান তিনি। একইসঙ্গে আরেকটি আমড়া গাছ লাগানোর আবদারও করা হয়। তাৎক্ষণিক তার হাতে একটি গাছের চারা তুলে দেন প্রসিকিউটর ব্যারিস্টার মঈনুল করিম।

তিনি ঢাকা পোস্টকে বলেন, গাছটি কেটে ফেলার কারণে ভবিষ্যতে ছেলের কবর কীভাবে চিনবেন; এ নিয়ে অনেক ক্ষোভ ছিল শহীদ সোহেল রানার মায়ের মনে। প্রসিকিউশনের পরিদর্শনের সময় তার কথাটি আমরা জানতে পারি। তিনি আমাদের কাছে একটি আমড়া গাছের চারা চান। তাৎক্ষণিকভাবে তাকে একটি আমড়া গাছের চারার ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়। পরে শহীদ সোহেল রানার কবরের মাথার পাশে নিজের হাতেই চারাটি রোপণ করেন রাশেদা বেগম। এতে মায়ের কাছে যেন ফিরে এলো ছেলের কবর চেনার সেই একমাত্র চিহ্ন।

এমআরআর/আরএফ