রহস্যময় নাম ‘জন ডো’। একজনের কল রেকর্ডে বারবারই ভেসে ওঠে কাল্পনিক এ নাম। তবে রহস্য উদ্ঘাটনে গিয়ে তদন্ত সংস্থার সামনে সেই নামের পরিচয় মেলে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যা মামলার অন্যতম আসামি অবসরপ্রাপ্ত মেজর মোজাফফর হোসেনের। যার সূত্র ধরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে ধরাও পড়েন প্রায় ৪৫ বছর আত্মগোপনে থাকা এই আসামি। এবার মানবতাবিরোধী অপরাধেও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে হাজির তাকে করতে জারি হয়েছে প্রোডাকশন ওয়ারেন্ট।
প্রসিকিউশন বলছে, মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলায় গ্রেপ্তার রয়েছেন লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী। তার সাবেক ব্যক্তিগত সহকারীর (পিএ) কল রেকর্ড বিশ্লেষণ করতে গিয়ে ‘জন ডো’ নামের সূত্র পায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা। ওই পরিচয়ের অনুসন্ধানে অবসরপ্রাপ্ত মেজর মোজাফফর হোসেনের নাম উঠে আসে। এ কারণেই তদন্তের স্বার্থে তাকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করতে প্রোডাকশন ওয়ারেন্ট জারির আবেদন করা হয়।
টানা ২০ দিনের অবকাশকালীন ছুটি শেষে ২১ জুলাই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রথম কার্যদিবস শুরু হয়। যথারীতি খবর সংগ্রহে আসতে থাকেন গণমাধ্যমকর্মীরাও। বেলা ১১টা বাজতেই চাউর হয় জিয়াউর রহমান হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া মেজর (অব.) মোজাফফর হোসেনের খবর। মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় তাকে আসামি করা হবে- এমন খবর ছড়িয়ে পড়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমেও। এর মধ্যেই ট্রাইব্যুনাল-২ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেলে বিচারকার্য শুরু হয়।
এদিন বিচারকার্যের তালিকায় প্রথমটিই ছিল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর মামলা। সোয়া ১১টার পর তাকে ট্রাইব্যুনালের আসামির কাঠগড়ায় তোলা হয়। কিন্তু প্রসিকিউশনের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে কার্যতালিকার দুই নম্বরে থাকা অন্য মামলার কার্যক্রম চলতে থাকে। এজন্য মাসুদ উদ্দিনকে হাজতখানায় নেওয়া হয়। দুপুর ১টার পর পুনরায় তাকে কাঠগড়ায় নেন পুলিশ সদস্যরা।

শুরু হয় শুনানি। প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানি করেন চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম। তিনি ট্রাইব্যুনালকে জানান, মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর বিরুদ্ধে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য আজ নির্ধারিত দিন ছিল। কিন্তু তদন্ত সংস্থা আরও দুই মাস সময় চেয়েছে। এছাড়া সাবেক এই সেনা কর্মকর্তার সঙ্গে মোজাফফর হোসেন নামের একজনের যোগসাজশ ছিল। তারা নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন। মানবতাবিরোধী অপরাধে তারও সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। এজন্য মোজাফফরের বিরুদ্ধে প্রোডাকশন ওয়ারেন্ট ইস্যু চাই।
শুনানি শেষে মোজাফফর হোসেনকে আগামী ২৩ জুলাই তথা বৃহস্পতিবার ট্রাইব্যুনালে হাজিরের নির্দেশ দেন নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল। তবে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর মামলার পরবর্তী শুনানির তারিখ নির্ধারণ করা হয়নি।
তদন্ত সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, আওয়ামী লীগের টানা শাসনামলে মোজাফফর হোসেনের সঙ্গে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর বিভিন্ন সময়ে যোগাযোগ ও সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়া গেছে। এক-এগারো থেকে ৫ আগস্টের আগ পর্যন্ত সংঘটিত বিভিন্ন মানবতাবিরোধী অপরাধের সঙ্গে তার কোনো সম্পৃক্ততা আছে কি না, সেটিই তদন্তে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এছাড়া দীর্ঘদিন পলাতক থাকা অবস্থায় ভারতসহ বিভিন্ন দেশে তার যাতায়াতের বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এসব তথ্য যাচাই করতেই তাকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করে প্রয়োজন হলে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।
এ প্রসঙ্গে চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম বলেন, তদন্তের সময় এক-এগারোর অন্যতম কুশীলব হিসেবে পরিচিত মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর একজন ব্যক্তিগত সহকারীর সন্ধান পান তদন্ত কর্মকর্তারা। ওই পিএর কল রেকর্ডের সূত্র ধরে ‘জন ডো’ নামটি সামনে আসে। যদিও নামটি ছিল ছদ্মনাম। তবে ‘জন ডো’র সঙ্গে প্রায়ই কথা বলতেন মাসুদ উদ্দিন। তাদের সেসব সন্দেহজনক কথোপকথনের উদ্ঘাটনে নামে আমাদের তদন্ত সংস্থা। এরপর এই ‘জন ডো’র আসল পরিচয় শনাক্ত করা হয়। তার প্রকৃত নাম অবসরপ্রাপ্ত মেজর মোজাফফর হোসেন। যিনি শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের অন্যতম হত্যাকারী।
চিফ প্রসিকিউটর বলেন, মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর সঙ্গে তৎকালীন সরকারপ্রধান শেখ হাসিনার একটি সুসম্পর্ক ছিল। ওই আমলে হওয়া দুই-তিনটি নির্বাচনের নানা সমীকরণে তার ষড়যন্ত্র ছিল। তার বিরুদ্ধে এরইমধ্যে মানবতাবিরোধী অপরাধের অনেক সংশ্লিষ্টতা পেয়েছে তদন্ত সংস্থা। এসবের পেছনে মোজাফফরের যোগসাজশ রয়েছে বলে প্রাথমিক তথ্য পাওয়া গেছে।
তিনি জানান, বর্তমানে সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে রয়েছেন মোজাফফর হোসেন। এজন্য আগামী ২৩ জুলাই সকাল ১০টার মধ্যে তাকে হাজির করার জন্য আর্মির অ্যাডজুডেন্ট জেনারেল বরাবর একটি প্রোডাকশন ওয়ারেন্ট ইস্যু হয়েছে। ওই দিন আনার পর আমরা তাকে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদন করবো। এরপর আইন অনুযায়ী ট্রাইব্যুনালে তার এ মামলায় বিচারকার্যক্রম চলবে।
জিজ্ঞাসাবাদ করা হতে পারে জানিয়ে আমিনুল ইসলাম বলেন, মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে আবারও জিজ্ঞাসাবাদের প্রয়োজন হতে পারে। তাদের দুজনকে একসঙ্গে মুখোমুখি জিজ্ঞাসাবাদেরও প্রয়োজন থাকতে পারে।
চিফ প্রসিকিউটর বলেন, অবসরপ্রাপ্ত মেজর মোজাফফর হোসেনের বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালে এখনও কোনো নির্দিষ্ট মামলা নয়; বরং তদন্তের স্বার্থে তাকে হাজির করে গ্রেপ্তার দেখানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এছাড়া জিয়াউর রহমান হত্যা মামলায় সেনা আইনে সম্ভাব্য বিচার এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত- দুটি পৃথক বিষয়। জিয়া হত্যা মামলায় তার বিচার সেনা আইনে চললেও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগের বিষয়ে আলাদাভাবে তদন্ত করছে তদন্ত সংস্থা। তবে সেনা আইনের মামলায় আগে দণ্ড কার্যকর হলে ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রম আইনগতভাবে অ্যাবেট বা বিলুপ্ত হয়ে যাবে বলেও জানান তিনি।
তথ্য অনুযায়ী, ১৯৮১ সালের ৩০ মে ভোরে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে নৃশংসভাবে হত্যা করেন একদল বিপথগামী সেনা কর্মকর্তা। হত্যাকারীদের একজন ছিলেন মেজর (অব.) মোজাফফর। এ হত্যাকাণ্ডের পর তিনি পালিয়ে যান। এরপর প্রায় ৪৫ বছর পলাতক থাকেন। গত ১৫ জুন রাতে রাজধানীর বনানীর একটি বাসা থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হন তিনি। পরদিন তাকে ঢাকা সেনানিবাসের মিলিটারি পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
এমআরআর/জেডএস
