রাজপথে তখন আন্দোলনের ঢেউ। শিক্ষার্থীরা প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন সংবাদ সম্মেলনের। ঠিক হচ্ছিল নতুন কর্মসূচি। আর রাজপথের এসব খবর পৌঁছাচ্ছিল ফোনের ওপাশে। আসে হামলার তাগিদও। এমনকি আন্দোলনে 'জামায়াত-বিএনপি যোগ হয়েছে' জানিয়ে মারার নির্দেশও দেওয়া হয়। চব্বিশের জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ঘিরে কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে ছাত্রলীগ সভাপতি সাদ্দাম হোসেনের একটি ফোনালাপে উঠে এসেছে এমন তথ্য।
বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) এ ঘটনায় সাত শীর্ষ নেতার বিরুদ্ধে হওয়া মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এ কল রেকর্ডটি বাজিয়ে শোনায় প্রসিকিউশন।
দ্বিতীয় দিনের মতো আজ বৃহস্পতিবার এ মামলায় যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের সময় ট্রাইব্যুনাল-২ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেলে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে কল রেকর্ডটি দাখিল করা হয়।
প্রসিকিউশনের পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করেন প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিম। এ সময় উপস্থিত ছিলেন প্রসিকিউটর ফারুক আহাম্মদ, জহিরুল আমিন, আবদুস সাত্তার পালোয়ান, মঈনুল করিমসহ অন্যান্য প্রসিকিউটর।
ট্রাইব্যুনালে বাজানো কল রেকর্ডে শোনা যায়, দুই মিনিট ১২ সেকেন্ডের ফোনালাপের প্রথমেই কল ঢোকার রিং বাজে। কল ধরতেই সালাম দেন ছাত্রলীগ সভাপতি সাদ্দাম হোসেন। নানা কথা বিনিময়ের পর আন্দোলনকারীদের হামলা করতে উসকে দেন তৎকালীন সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। ২০২৪ সালের ১১ জুলাই দুজনের এ কথোপকথন হয়েছে বলে জানিয়েছে প্রসিকিউশন। এসব কথায় ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা উজ্জীবিত হয়েছেন বলেও দাবি তাদের।
ঢাকা পোস্টের পাঠকের জন্য ওবায়দুল কাদের ও সাদ্দাম হোসেনের ফোনালাপের অনুলিপিটি হুবহু তুলে ধরা হলো-
সাদ্দাম: আসসালামু আলাইকুম।
কাদের: ওয়ালাইকুম আসসালাম, হ্যাঁ।
সাদ্দাম: আসসালামু আলাইকুম।
কাদের: হ্যাঁ, কি অবস্থা?
সাদ্দাম: স্যার, আসসালামু আলাইকুম। স্যার, এই যে আমাদের সমাবেশ মাত্র শেষ করলাম। আর ওদের প্রোগ্রাম চলতেছে। তিন হাজারের মতো স্টুডেন্ট আছে।
কাদের: ওরা কত? ৪টা পর্যন্ত তো...
সাদ্দাম: হ্যাঁ, স্যার। এই যে ৮টা ৩০-এ সংবাদ সম্মেলন করবে, স্যার।
কাদের: কে?
সাদ্দাম: ওই যে আন্দোলনকারীরা।
কাদের: কখন?
সাদ্দাম: ৮টা ৩০ মিনিটে সংবাদ সম্মেলন করবে। সংবাদ সম্মেলন করে পরবর্তী কর্মসূচি মনে হয় ঘোষণা করবে। এই দুই দিন জনসংযোগ করবে। এরপর তারা আল্টিমেটাম দেবে।
কাদের: শোনো, পেটাও না কেন? মারো না কেন ওদের?
সাদ্দাম: স্যার, ও যে আমাদের তো...
কাদের: সুযোগ দেও কেন? লিবারেল পাচ্ছো?
সাদ্দাম: স্যার, ওই যে নিষেধ করল আমাদের।
কাদের: তোমরা বললে তো আজকে থেকে হালকা হয়ে যাবে খুব।
সাদ্দাম: জি, স্যার।
কাদের: কই হালকা হইলো?
সাদ্দাম: জি স্যার, জামায়াত আজকে ভালো... বেশি ছিল, স্যার।
কাদের: তা তো কে? লাভ তো... তাহলে কি বললা তোমরা? বাস্তবে কি হচ্ছে? জামায়াত মানে? এখানে জামায়াত আর বিএনপি যোগ হইছে।
সাদ্দাম: আজকে স্যার আসছে স্যার। এই যে ছাত্রদলের নেতারা কিন্তু আসছে তো, যে কারণে জামায়াতটা ওই মানে সেভাবে ইয়ে করছে।
কাদের: এটার কিছু করার নাই?
সাদ্দাম: স্যার, আমরা স্পেসিফিক বললাম। আমরা সিচুয়েশনে হ্যান্ডেল করতে পারবো, স্যার।
কাদের: অ্যাঁ?
সাদ্দাম: মানে, আমরা যদি রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করতে হয়, তাহলে আমরা সেটা করতে পারবো। আজকে ধরে যে আমাদের নিষেধ করল। শাহবাগের দিকে যেতে তো আমাদের নিষেধ করল। বারবার ফোন দিয়ে বলল যে, শাহবাগের দিকে, অন্য দিকে আমরা যেন না যাই। মানে ওদের মুখোমুখি যেন না হই। এটাই তো বারবার বলতেছিল।
কাদের: কে?
সাদ্দাম: স্যার, ওই যে আমরা যেন ওদের মুখোমুখি না যাই। এটার জন্য বারবার আমাদের বলতেছিল আজকে।
কাদের: কে বলতেছে?
সাদ্দাম: এই যে ফোন দিয়েছিল সবাই। আমাদের পুলিশ প্লাস বিপ্লব দা-ও যোগাযোগ করছিল।
কাদের: বিপ্লব তো এটা বলার কথা না।
সাদ্দাম: না, এমনি ওই যে পুলিশও যোগাযোগ করতেছিল সব মিলিয়ে। মুখোমুখি হতে একবারে মানা করছিল।
কাদের: হুম।
গত ৪ আগস্ট এ মামলায় যুক্তিতর্ক শুরু করে প্রসিকিউশন। যুক্তিতে প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিম বলেন, জুলাই-আগস্টে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধ কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি ছিল পরিকল্পিত, সুসংগঠিত ও দেশব্যাপী ব্যাপক পরিসরে সংঘটিত একটি 'সিস্টেম্যাটিক ক্রাইম'। আন্দোলন দমনের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও দলীয় অঙ্গসংগঠনগুলো সমন্বিতভাবে কাজ করেছে।
এ মামলায় ওবায়দুল কাদের ছাড়া অন্য আসামিরা হলেন- আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, যুবলীগের সভাপতি শেখ ফজলে শামস পরশ, সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল, ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক ওয়ালি আসিফ ইনান। আসামিরা সবাই পলাতক।
এমআরআর/আরএফ
