বিজ্ঞাপন

ট্রাইব্যুনালে সাক্ষী

ওসি বললেন ‘ফায়ার’, এরপরই হাঁটুতে বন্দুক ঠেকিয়ে গুলি

ওসি বললেন ‘ফায়ার’, এরপরই হাঁটুতে বন্দুক ঠেকিয়ে গুলি

যশোরের চৌগাছায় পুলিশ হেফাজতে নিয়ে গুলি করে পঙ্গু করে দেওয়ার ভয়াবহ বর্ণনা দিয়েছেন ভুক্তভোগী মো. রুহুল আমিন। জবানবন্দিতে তিনি জানান, তাকে ও তার সহযোদ্ধা ইসরাফিল হোসেনকে একটি মাঠে নিয়ে যাওয়ার পর তৎকালীন ওসি মশিউর রহমানের নির্দেশে ‘ফায়ার’ করা হয়। এরপর হাঁটুতে বন্দুক ঠেকিয়ে গুলি করা হয় তাদের। গুলির ক্ষত পচে যাওয়ায় দুজনেরই হাঁটুর ওপর থেকে পা কেটে ফেলতে হয়।

রোববার (৯ আগস্ট) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর সদস্য বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরীর একক বেঞ্চে তার জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়। যশোরের চৌগাছায় গ্রেপ্তারের পর বন্দুকযুদ্ধের নাটক সাজিয়ে ছাত্রশিবিরের দুই নেতাকে গুলির ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় তৎকালীন এসপি আনিসুর রহমানসহ আটজনের বিরুদ্ধে দ্বিতীয় সাক্ষী হিসেবে সাক্ষ্য দেন রুহুল। 

২৯ বছর বয়সী রুহুল বর্তমানে যশোর ইবনে সিনা হাসপাতালে কম্পিউটার অপারেটর পদে কর্মরত রয়েছেন। শহরেই একটি বাড়িতে ভাড়া থাকেন।

সাক্ষ্যে রুহুল আমিন বলেন, ২০১৬ সালে আমি যশোর সরকারি এমএম কলেজে ব্যবস্থাপনা বিভাগের প্রথম বর্ষের ছাত্র ছিলাম। তখন চৌগাছা উপজেলা ছাত্রশিবিরের সাহিত্য সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছিলাম। একই কলেজের অর্থনীতি বিভাগের প্রথম বর্ষের ছাত্র ও ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি ছিলেন ইসরাফিল। ওই বছরের ৩ আগস্ট দুপুরে খাবারের পর দুজন মিলে একটি মোটরসাইকেলে করে আমাদের গ্রামের বাড়ি নারায়ণপুরের উদ্দেশে রওনা হই। বিকেল ৪টা-৫টার মধ্যে আমরা চৌগাছা উপজেলার বুন্দলীতলা গ্রামের শফি মল্লিকের ইটের ভাটার কাছে পৌঁছাই। সেখানে আমাদের গতিরোধ করে ওত পেতে থাকা চৌগাছা থানা পুলিশ। তখন তারা বলেন- 'তোদের অনেকদিন ধরে খুঁজছি, আজ পেয়েছি'। তারা আমাদের তল্লাশি চালিয়ে ছাত্রশিবিরের বায়তুল মালের রশিদ ও দলীয় কিছু বইপুস্তক পান। একপর্যায়ে আমাদের আটক করে থানায় নিয়ে যাওয়া হয়।

সাক্ষী বলেন, আটকের সময় পুলিশ সদস্যদের মধ্যে এসআই মোখলেস, এএসআই মাজিদ, এএসআই সিরাজসহ দুজন কনস্টেবল ছিলেন। এর মধ্যে সিরাজের গায়ে পুলিশের পোশাক থাকলেও বাকিরা ছিলেন সাদা পোশাকে। সন্ধ্যায় আমাদের থানায় নেওয়া হয়। এরপর কোনো ধরনের আনুষ্ঠানিকতা ছাড়াই গারদে রেখে দেওয়া হয়। রাত ১০টার পর আমাদের দুজনকে নেওয়া হয় ওসির কক্ষে। এরপর বেধড়ক মারধর করতে থাকেন পুলিশ সদস্যরা। একপর্যায়ে আমরা জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। জ্ঞান ফিরলে ভিডিও কলে আমাদের তৎকালীন এসপি আনিসুর রহমানকে দেখান ওসি। তখন এসপি সাহেব বলেন- 'তাদের আগামীকাল আমার এখানে পাঠিয়ে দাও। এরপর আমার নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করবে।'

তিনি আরও বলেন, রাজনীতি করার কারণে আমরা আগে থেকেই এসপি আনিসুর রহমানকে চিনতাম। ওসির কক্ষে থাকা পুলিশ সদস্যরা আমাদের কাছে সরকারের বিরুদ্ধে কে কে আন্দোলন করছে তাদের নাম ও পরিচয় জানতে চান। তখন ওসি মশিউর রহমানকে এসআই আকিকুল ইসলাম বলেন, 'স্যার এদের ব্রেইন ওয়াশ করা হয়েছে, এরা কিছুতেই কোনো নাম বলছে না, এদের গুলি করে দেই'। এরপর আমাদের থানার গারদে রেখে দেওয়া হয়। পরদিন সকালে আমাদের পরিবারের সদস্য ও সাংবাদিকরা এলে দেখা করতে দেওয়া হয়নি। এসআই আকিকের নেতৃত্বে দুপুর ১২টার দিকে দুজনকে যশোর ডিবি কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হয়।

ওই সময় একজন ডিবি কর্মকর্তা আমাদের জানান, 'তোদের আজ গুলি করা হবে, এরূপ আদেশ আছে'। ওই দিন সন্ধ্যার পর চারদিকে ঘন অন্ধকার হলে আমাদের ডিবি কার্যালয় থেকে বের করে চৌগাছার দিকে নিয়ে যেতে থাকে চৌগাছা থানা পুলিশ। কিছু দূর যাওয়ার পর পুলিশের গাড়িটি থামে। তখন পুলিশ সদস্যরা নিজেদের মধ্যে কথাবার্তা বলতে থাকেন। তারা বলে যে, 'এদের চোখ বাঁধো ও পিছমোড়া করে হাতকড়া লাগাও। এদের বুন্দলীতলা মাঠের দিকে নিয়ে যাও'। এরপর পুলিশের গাড়ি সেখান থেকে রওনা হয়। কিছু দূর যাওয়ার পর আমাদের গাড়ি থেকে নামানো হয়। তখন আমরা গুলির শব্দ শুনতে পাই। পুলিশ সদস্যরা চিৎকার চেঁচামেচি করে একটি ভীতিকর পরিবেশ সৃষ্টি করে, যেন স্থানীয় লোকজন না আসেন। ঠিক সেই মুহূর্তে একটি কণ্ঠস্বর শুনতে পাই যে, 'সাজ্জাদ, জহরুল- ফায়ার'। কণ্ঠস্বরটি তৎকালীন ওসি মশিউর রহমানের। অতঃপর আমার ডান পায়ের হাঁটুতে বন্দুক ঠেকিয়ে গুলি করা হয়। এ পর্যায়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন সাক্ষী।

ভুক্তভোগী রুহুল বলেন, গুলিবিদ্ধের পর আমি পড়ে গিয়ে কান্নাকাটি করতে থাকি। ঠিক পরপরই আরেকটি গুলির শব্দ শুনতে পাই। তখন আমার বন্ধু ইসরাফিলের কান্নাকাটির শব্দ শুনতে পাই। তখন আমার চোখের গামছা খুলে ক্ষতস্থানে বালু ভরে বেঁধে দেওয়া হয়। একইভাবে ইসরাফিলের গুলির ক্ষতস্থানেও বালু ভরে গামছা দিয়ে বেঁধে দেওয়া হয়। আমি ওসি মশিউর রহমান, এসআই আকিক, কনস্টেবল সাজ্জাদ, জহরুলসহ আরও অনেক পুলিশ সদস্যদের দেখতে পাই। একপর্যায়ে আমাদের পুলিশের গাড়িতে করে চৌগাছা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পর আমাদের পুলিশি পাহারায় নেওয়া হয় যশোর সদর হাসপাতালে। দুদিন বিনা চিকিৎসার ঢাকা পঙ্গু হাসপাতালে রেফার্ড করেন চিকিৎসকরা। পঙ্গু হাসপাতালে সপ্তাহখানেক চিকিৎসার পর হাঁটুতে পচন ধরার কারণে আমার ডান পা কেটে ফেলা হয়।

ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানি করেন প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম ও আবদুস সাত্তার পালোয়ান। সঙ্গে ছিলেন প্রসিকিউটর শাইখ মাহদী, তাসমিরুল ইসলাম, মঈনুল করিমসহ অন্যরা। 

এ মামলায় বর্তমানে গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে রয়েছেন চৌগাছা থানার তৎকালীন এসআই আকিকুল ইসলাম, কনস্টেবল সাজ্জাদুর রহমান ও কনস্টেবল জহরুল হক।

পলাতকরা হলেন- তৎকালীন এসপি আনিসুর রহমান, চৌগাছা থানার তৎকালীন ওসি মশিউর রহমান, এসআই মোখলেছ, এসআই জামাল ও এসআই মাজেদুল।

গত ২০ এপ্রিল আট আসামির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ (ফরমাল চার্জ) গঠনের মাধ্যমে বিচার শুরুর আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল। 

এমআরআর/বিআরইউ/এমএসএ