বিজ্ঞাপন

জিয়াউল আহসানের গুম-খুনের বিষয়ে সাক্ষীর জবানবন্দি

‘ফলো মি’ বলে নিয়ে গেলেন জিয়াউল, সেতুতে গিয়ে যা দেখলেন র‍্যাবের সিও

‘ফলো মি’ বলে নিয়ে গেলেন জিয়াউল, সেতুতে গিয়ে যা দেখলেন র‍্যাবের সিও

রাতের অন্ধকারে চার গাড়ির বহর। গন্তব্য অজানা। অভিযানের কারণও জানা নেই। শুধু নির্দেশ একটাই ‘ফলো মি’। ছুটতে ছুটতে হঠাৎ সেতুর ওপর থামল গাড়ি। সামনে আনা হলো হাত-মুখ বাঁধা এক ব্যক্তি। মুহূর্তেই গুলির শব্দ। এরপর রেলিং পেরিয়ে ফেলে দেওয়া হলো পানিতে। এমন ভয়ংকর আরও গুলির বর্ণনা উঠে এসেছে র‍্যাবের সাবেক এক সিওর জবানবন্দিতে।

র‍্যাবের এই কর্মকর্তার নাম রফিকুল ইসলাম। বর্তমানে সেনা কল্যাণ সংস্থার উপপরিচালক হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। ১৯৯২ সালে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে ২৬তম লং কোর্সে কমিশন প্রাপ্ত হন তিনি। ২০০৯ সালে উপ-অধিনায়ক হিসেবে র‍্যাব-১ এ যোগদান করেন। ২০১০ সালের সেপ্টেম্বরে র‍্যাব-৩ এ অধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। দুই বছর পর ২০১২ সালের আগস্টে পুনরায় ফিরে যান বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে। ২০২২ সালে স্বাভাবিক নিয়মে লেফটেন্যান্ট কর্নেল পদে থাকা অবস্থায় অবসরে যান এই কর্মকর্তা।

আওয়ামী লীগের আমলে শতাধিক গুম-খুনের ঘটনায় হওয়া মানবতাবিরোধী অপরাধে মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানের মামলায় সাক্ষ্যগ্রহণের দিন ধার্য ছিল সোমবার (১০ আগস্ট)। এদিন ট্রাইব্যুনাল-১ এর সদস্য বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরীর একক বেঞ্চে সপ্তম সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেন রফিকুল।

সাক্ষ্যে রফিকুল ইসলাম বলেন, র‍্যাব-৩ এর অধিনায়ক থাকাকালে ২০১১ সালের ১১ জুলাই অফিসে আসার পর আমাকে ফোন করেন তৎকালীন ডিরেক্টর ইন্টেলিজেন্স লেফটেন্যান্ট কর্নেল জিয়াউল আহসান স্যার। ফোনে ওই দিন রাতে সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানে যেতে হবে বলে জানান তিনি। একইসঙ্গে অফিসারদের নিয়ে প্রস্তুত থাকতে বলা হয়। ওই সময় স্যারের কাছে জানতে চেয়েছিলাম- ‘কিসের অপারেশন। কখন যেতে হবে। কীভাবে, কোথায় যাবো’। প্রত্যুত্তরে জিয়াউল স্যার আমাকে বলেন- ‘তোমার কোনো কিছু জানার প্রয়োজন নেই। সময়মতো আমার আদেশ মোতাবেক কাজ করবে’। স্যারের নির্দেশ অনুযায়ী বিষয়টি তিন অফিসারকে ডেকে জানানো হয়।

এই র‍্যাব কর্মকর্তা বলেন, অফিসাররা আমার কাছে বিস্তারিত জানতে চেয়েছিলেন। কিন্তু আমি কোনো কিছু না জানায় তাদের বলি- ‘আমি এ বিষয়ে অবগত নই। স্যারের নির্দেশ মোতাবেক কাজ হবে’। অফিস শেষ হওয়ার আগে জিয়াউল স্যার আমাকে পুনরায় ফোন করে জানান, ‘রাত ১১টায় র‍্যাব সদরদপ্তরে তোমার অফিসারদের নিয়ে উপস্থিত থাকবে’। অফিসের সময় শেষ করে আমরা বাসায় চলে যাই। রাত ১০টায় ক্যান্টনমেন্টে এসে আমি ও আমার তিনজন অফিসারকে নিয়ে র‍্যাব সদরদপ্তরে যায় র‍্যাব-৩ এর একটি গাড়ি। আমার সঙ্গে মেজর সাজ্জাদুল, মেজর তরিকুল ও মেজর এমারত ছিলেন।

জবানবন্দিতে আরও উল্লেখ করা হয়, র‍্যাব সদরদপ্তরে অপেক্ষা করছিলেন রফিকুলসহ চারজন কর্মকর্তা। একপর্যায়ে জিয়াউল আহসান এসে প্রথমে নিজের কার্যালয়ে যান। কিছুক্ষণ পর নিচে নেমে রফিকুলকে শুধু বলেন ‘ফলো মি’। তখন তার গাড়িতে র‍্যাব-৩ এর তিনজন কর্মকর্তা, বাকি তিনটির একটিতে জিয়াউল আহসানসহ মোট চারটি গাড়ি নিয়ে রওনা হন। র‍্যাব সদরদপ্তর থেকে বেরিয়ে টঙ্গী আহসান উল্যাহ মাস্টার ফ্লাইওভার থেকে নেমে ডান দিকে মোড় নিয়ে সামনে অগ্রসর হতে থাকেন তারা। ৪০ মিনিট যাওয়ার পর একটি সেতুতে সব গাড়ি থামার সংকেত দেন জিয়াউল।

রফিকুল বলেন, আমরা সবাই গাড়ি থেকে বেরিয়ে সেতুর ওপর নেমে যাই। ঠিক তখনই জিয়াউল আহসান স্যার আমাদের বলেন- ‘এখানে এখন একটা সন্ত্রাসবিরোধী অপারেশন হবে’। এর পরপরই দেখি একটি গাড়ি থেকে হাত-মুখ বাঁধা একজন লোককে বের করা হয়। তাকে দাঁড় করানো হয় সেতুর রেলিংয়ের পাশে। কিছুক্ষণের মধ্যেই ওই লোকের মাথায় গুলি করেন জিয়াউল আহসান স্যার। এরপর রেলিংয়ের ওপর থেকে তাকে পানিতে ফেলে দেন তিনি।

এ অপারেশনের পর জিয়াউলের নির্দেশে সবাই পুনরায় যার যার গাড়িতে ওঠেন। চার-পাঁচ মিনিট গাড়ি চলার পর আরেকটি সেতুতে গাড়ি থামানোর নির্দেশ দেন জিয়াউল আহসান। দু-তিন মিনিটের মধ্যেই আগের মতো হাত-চোখ বাঁধা আরেকজন লোককে গাড়ি থেকে নামিয়ে রেলিংয়ের কাছে আনা হয়। 

জবানবন্দিতর রফিকুল বলেন, ওই লোককে বের করে আনার পর মেজর সাজ্জাদুলকে জিয়াউল আহসান স্যার বলেন- ‘এখন আরও একটা সন্ত্রাসবিরোধী অপারেশন হবে, সেটা তুমি করবে’। তখন সাজ্জাদুল জানতে চান- ‘কে সন্ত্রাসী, কেন এই অপারেশন করবো’। জিয়াউল আহসান স্যার বলেন- ‘আমার নির্দেশ মোতাবেক কাজ কর’। তখন অপারেশন করতে অপারগ বলে জানান সাজ্জাদুল। এ কারণে তাকে কাওয়ার্ড, স্টুপিড বলে গালমন্দ করে জিয়াউল বলেন- ‘তুমি গিয়ে গাড়িতে বসো। আমি তোমার কেসটা সেপারেটলি দেখবো’। এরপর তিনি গাড়িতে গিয়ে বসেন।

একপর্যায়ে জিয়াউল আহসান স্যার আমাকে বলেন, ‘সিও তুমি তোমার অফিসারের কাছে গিয়ে তাকে দেখো’। তার নির্দেশ অনুযায়ী আমি গাড়ির উদ্দেশে যাচ্ছিলাম। এর একটু আগেই আমি একটি গুলির শব্দ পাই। কিছুক্ষণ পর বাকিরা যার যার গাড়িতে উঠে যান। স্যারের নির্দেশক্রমে পুনরায় সামনের দিকে অগ্রসর হতে থাকে।

আট-দশ মিনিট চারটি গাড়ি যাওয়ার পর সড়কের বাঁ পাশে আবারও থামার ইঙ্গিত আসে। কিছুক্ষণের মধ্যেই বাঁ পাশ থেকে ডান পাশে আরেকজন লোককে চোখ-হাত বাঁধা আরও দুজনকে আনতে দেখেন র‍্যাব কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম। সড়কের ডান পাশে একটু নিচু জায়গায় বাঁশঝাড়ের মতো দেখা যায়। প্রায় সাত-আট মিনিট পর একটি গুলির শব্দ শুনতে পান তিনি।

এই প্রত্যক্ষদর্শী বলেন, তৃতীয় বারের মতো এ অপারেশনের পর পুনরায় সবাই যার যার গাড়িতে বসেন। চলতি পথে আরও একাধিক স্থানে গাড়ি অল্প সময়ের জন্য থেমেছিল। তবে তখন আমার গাড়ি থেকে কেউ নামিনি। গাড়িতে এসে মেজর তরিকুল আমাকে বলেন, ‘স্যার, জিয়াউল আহসান স্যার আমাকে একজন ব্যক্তিকে মারতে বলেন। আমি মারিনি। তবে স্যারের সঙ্গের দুইজন ব্যক্তি তাকে মেরে ফেলেন’। এজন্য তরিকুলকে গালমন্দ করেন জিয়াউল স্যার।

রফিকুল ইসলাম বলেন, ওই রাতে আমাদের চারজনকে বহন করা গাড়িটি ক্যান্টনমেন্টে যার যার বাসায় নামিয়ে দিয়ে চলে যায়। পরদিন আমি যথারীতি অফিসে যাই। অফিসে গিয়ে মেজর সাজ্জাদুলের সেনাবাহিনীতে প্রত্যাবর্তনের আদেশ প্রাপ্ত হই। আদেশ অনুযায়ী সম্ভবত ২০১১ সালের ১২ জুলাই সেনাবাহিনীতে ফেরত যান মেজর সাজ্জাদুল। এ ঘটনার তিন-চারদিনের মধ্যে প্রথম আলোর মাধ্যমে জানতে পারি- গাজীপুরের জয়দেবপুর এলাকায় গুলিবিদ্ধ অবস্থায় দু-তিনজনের লাশ উদ্ধার করা হয়। 

সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে সাক্ষীকে জেরা করেন জিয়াউলের আইনজীবী মো. সাহিদুর রহমান। সঙ্গে ছিলেন তার বোন আইনজীবী নাজনীন নাহারসহ অন্যান্য আইনজীবী। 

ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানি করেন প্রসিকিউটর শাইখ মাহদী। সঙ্গে ছিলেন প্রসিকিউটর তাসমিরুল ইসলাম, আবদুস সাত্তার পালোয়ান, মঈনুল করিমসহ অন্যান্য প্রসিকিউটর।

এমআরআর/এমএন

বিজ্ঞাপন