বিজ্ঞাপন

ট্রাইব্যুনালে শ্রমিক দল নেতা

‘জ্ঞান ফিরতেই দেখি টি-শার্টে লেগে আছে সিয়ামের মগজ-রক্ত’

‘জ্ঞান ফিরতেই দেখি টি-শার্টে লেগে আছে সিয়ামের মগজ-রক্ত’

নিজের চোখের সামনেই সিয়ামের চোখে এসে লাগে পুলিশের ছোড়া একটি গুলি। মাথার পেছন দিয়ে বেরিয়ে আসা সেই গুলি আঘাত করে পল্লবী থানা শ্রমিক দলের সাধারণ সম্পাদক মো. আল আমিন হোসেনের মাথায়ও। গুলিবিদ্ধ হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন তিনি। হারিয়ে ফেলেন জ্ঞান। তবে হুঁশ ফিরতেই দেখেন তার টি-শার্টে লেগে আছে সিয়ামের মগজ ও রক্ত।

মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) দুপুরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর সদস্য বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরীর একক বেঞ্চে দেওয়া জবানবন্দিতে ভয়াবহ সেই বর্ণনা দেন আল আমিন।

চব্বিশের জুলাই-আগস্ট অভ্যুত্থান চলাকালে কারফিউ দিয়ে গণহত্যায় উসকানিসহ মানবতাবিরোধী অপরাধে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান ও সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের মামলায় ১১ নম্বর সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেন শ্রমিক দলের এই নেতা।

বর্তমানে গার্মেন্টস ব্যবসার পাশাপাশি রাজধানীর পল্লবী থানা শাখা শ্রমিক দলের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন আল আমিন। ২০২৪ সালে একই শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন তিনি।

সাক্ষ্যে আল আমিন বলেন, ২০২৪ সালের ১ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত আমরা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে অংশ নিই। এরই ধারাবাহিকতায় ১৮ জুলাই মিরপুর-১০ নম্বর এলাকায় পপুলার ডায়াগনস্টিক হাসপাতালের সামনে আমরা আন্দোলনে যোগ দেই। রাত ১০টার পর আমাদের ওপর গুলি ছোড়েন আট-দশজন পুলিশ সদস্য। তাদের মাঝখানে তিন-চারজন সাদা পোশাকধারী লোককেও ঢুকতে দেখি। পুলিশের ছোড়া একটি গুলি আন্দোলনরত রাব্বানী হোটেলের কর্মচারী সিয়াম সর্দারের বাঁ চোখে বিদ্ধ হয়। গুলিটি তার মাথার পেছন থেকে বেরিয়ে আমার মাথার সামনে এসে লাগে। এতে আমার মাথায় ক্ষত হলে মাটিতে পড়ে যাই।

সাক্ষী বলেন, এ অবস্থা দেখে আশপাশের লোকজন এসে আমাকে মাটি থেকে উঠিয়ে পানি ঢালেন। একপর্যায়ে জ্ঞান ফিরলে দেখি সিয়ামের মাথার মগজ ও রক্ত আমার টি-শার্টে লেগে আছে। তখন লোকজন মিলে সিয়ামকে সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে পাঠালে চিকিৎসকরা মৃত ঘোষণা করেন। তার মৃত্যুর খবরে আন্দোলন আরও জোরালো হয়। এমনকি ওই দিন সারারাত আমরা মিরপুর ১০ নম্বরে অবস্থান নেই। তবে আমার মাথার ক্ষত ততটা মারাত্মক ছিল না।

জবানবন্দিতে আরও উল্লেখ করা হয়, ১৯ জুলাই সকাল থেকে পুনরায় আন্দোলনে অংশ নেন আল আমিনরা। তাদের সঙ্গে সাধারণ ছাত্র-জনতাও যোগ দেন। আন্দোলনের একপর্যায়ে জুটপট্টির আসিফ, পারভেজ, রুবেলসহ আরও অনেকেই শহীদ হয়েছেন বলে তাদের কাছে খবর আসে। এরপরও তারা জোরালোভাবে আন্দোলন করতে থাকেন।

শ্রমিক দল নেতা ট্রাইব্যুনালে বলেন, ১৯ জুলাই ছাত্রলীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবকলীগ ও শ্রমিকলীগের নেতাকর্মীরা একটি হোন্ডা মিছিল করেন। তখন ওই মিছিল থেকে ছাত্র-জনতার উদ্দেশে গুলি ছোড়েন তারা। এতে অনেকেই গুলিবিদ্ধ হন। এরপর আমাদের পরিবারের ওপর বিভিন্ন রকমের হুমকি আসতে থাকে। এ ছাড়া, আন্দোলন দমনে শ্রমিক লীগ নেতা জিন্নাত আলীসহ আওয়ামী লীগের অনেকেই মিরপুর-১০ নম্বরে অবস্থিত বায়তুল মামুর মসজিদে বসে ষড়যন্ত্র করেন।

তিনি বলেন, ৫ আগস্টের পর বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটা কল রেকর্ড প্রকাশিত হয়। ওই কল রেকর্ডে সালমান এফ রহমান ও আনিসুল হকের কথোপকথন শুনতে পাই। কারফিউ জারি করে আন্দোলনকারীদের শেষ করে দেওয়ার কথা বলেন তারা। এ ঘটনার জন্য আমি শেখ হাসিনা, ওবায়দুল কাদের, সালমান এফ রহমান, আনিসুল হকসহ আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের দায়ী করি। পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত ছিলেন।

জবানবন্দি শেষে আল আমিনকে জেরা করেন আনিসুল হক ও সালমান এফ রহমানের আইনজীবী পলাশ চন্দ্র রায়।

ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানি করেন প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিম ও সহিদুল ইসলাম সরদার। এ সময় প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম, মার্জিনা রায়হান ও সুলতান মাহমুদ উপস্থিত ছিলেন।

এদিন সকালে এ মামলার দুই আসামি সালমান ও আনিসুলকে কারাগার থেকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। পরবর্তী সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য আগামী ২৫ আগস্ট দিন নির্ধারণ করেন ট্রাইব্যুনাল।

এমআরআর/এসএএস