জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) শিক্ষার্থী ও শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য জোবায়েদ হোসেন হত্যা মামলা বিচার জন্য প্রস্তুত হওয়ায় বিচারিক আদালতে বদলির আদেশ দেওয়া হয়েছে।
বুধবার (১২ আগস্ট) ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট নাজমিন আক্তার মামলাটি ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতে বদলির আদেশ দেন।
আগামী ১৩ সেপ্টেম্বর অভিযোগ গঠনের বিষয়ে শুনানির দিন ধার্য করে দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রসিকিউশন বিভাগের উপ-পরিদর্শক কামাল হোসেন।
এর আগে গত ৩০ জুন এ মামলার তদন্ত শেষে তার ছাত্রী বার্জিস শাবনাম বর্ষাসহ ৩ জনকে অভিযুক্ত করে চার্জশিট দাখিল করে পুলিশ। তদন্তকারী কর্মকর্তা বংশাল থানার উপ-পরিদর্শক আশরাফ হোসেন এ চার্জশিট দাখিল করেন। অপর আসামিরা হলেন, বর্ষার প্রেমিক মো. মাহির রহমান এবং মাহিরের বন্ধু ফারদীন আহম্মেদ আয়লান। তারা তিনজনই হত্যার দায় স্বীকার করে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।
চার্জশিটে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা উল্লেখ করেন, ভিকটিম মো. জোবায়েদ হোসেন (২৫) জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের ২০১৯-২০২০ শিক্ষাবর্ষের ১৫ তম ব্যাচের ছাত্র। তিনি জীবিকা নির্বাহের জন্য টিউশনি করতেন।
জোবায়েদ দীর্ঘদিন আসামি বর্ষার বাসায় গৃহশিক্ষক হিসেবে পড়াতেন। এই সূত্রে জোবায়েদ ও আসামির মধ্যে ঘনিষ্ঠতা গড়ে ওঠে। তদন্তে আরও প্রকাশ পায় যে, বর্ষার সঙ্গে অপর আসামি মাহিরের দীর্ঘদিনের প্রেমঘটিত সম্পর্ক ছিল। পরবর্তীতে বাসায় টিউশন পড়ানোর শিক্ষক জোবায়েদ হোসেনের সঙ্গেও বর্ষার সম্পর্ক গড়ে ওঠে। দুজনের শারীরিক সম্পর্কের বিষয়টি জানতে পেরে মাহির চরম ক্ষুব্ধ ও প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে ওঠে।
আসামিদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি পর্যালোচনায় দেখা যায় যে, জোবায়েদের কাছে নিজের আপত্তিকর ছবি ও ভিডিও সংরক্ষণের অভিযোগ তুলে তাকে হত্যা করতে মাহিরকে প্ররোচিত করে বর্ষা। মাহির তার বন্ধু আয়লানকে বিষয়টি অবহিত করে। পরে তার সহায়তায় ভিকটিমকে হত্যার পরিকল্পনা গ্রহণ করে। এর অংশ হিসেবে একটি সুইচ গিয়ার চাকু সংগ্রহ করে এবং ঘটনাস্থল সম্পর্কে বেশ কিছুদিন রেকি করে।
তদন্তকারী কর্মকর্তা চার্জশিটে আরও উল্লেখ করেন, তদন্তে উদ্ধারকৃত ডিজিটাল আলামত, বিশেষত আসামি বর্ষার মোবাইল ফোন এবং জোবায়েদের মোবাইল ফোন বিশ্লেষণে দেখা যায়, ঘটনার দিন এবং আগেও উভয়ের মধ্যে হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। ঘটনার দিন বিকেল ৪টা ২৭ মিনিটে উভয়ের মধ্যে লাইভ লোকেশনও শেয়ার হয়। একই সময়ে বর্ষা ও মাহিরের মধ্যেও একাধিকবার যোগাযোগ হয়। বর্ষা পরিকল্পনার অংশ হিসেবে জোবায়েদের অবস্থান ও চলাফেরার তথ্য মাহিরকে সরবরাহ করছিলেন। ঘটনার দিন পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী বর্ষার বাসায় জোবায়েদ পড়াতে গেলে মাহির ও আয়লান ঘটনাস্থলে ওত পেতে থাকে। জোবায়েদ বাসার নিচতলায় প্রবেশ করলে মাহির তাকে কথোপকথনের নামে থামিয়ে তার সঙ্গে বাকবিতণ্ডায় জড়ায়। এক পর্যায়ে মাহির তার কাছে থাকা সুইচ গিয়ার চাকু দিয়ে জোবায়েদের গলার সজোরে আঘাত করে। এতে জোবায়েদ গুরুতর আহত অবস্থায় আত্মরক্ষার্থে সিঁড়ির উপরের দিকে দৌড়ে উঠতে গেলে তৃতীয় তলার সিঁড়িতে লুটিয়ে পড়ে। পরে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে সেখানেই মারা যান।
মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে, জোবায়েদ হোসেন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার পাশাপাশি টিউশনি করাতেন। প্রতিদিনের মতো তিনি ২০২৫ সালের ১৯ অক্টোবর বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে বংশাল থানাধীন ৩১নং ওয়ার্ডে নুর বক্স লেন এর ১৫ নং হোল্ডিং রৌশান ভিলায় পড়ানোর জন্য যান। একই তারিখে সন্ধ্যা প্রায় ৫টা ৪৮ টার সময় ওই ছাত্রী জোবায়েদ হোসেনের বিশ্ববিদ্যালয়ের ছোট ভাই সৈকতকে ম্যাসেঞ্জারের মাধ্যমে জানায় যে, জোবায়েদ স্যার খুন হয়ে গেছে, কে বা কারা জোবায়েদ স্যারকে খুন করে ফেলছে।
এ বিষয়টি ওইদিন রাত অনুমান ৭টার সময় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র মো. কামরুল হাসান ভুক্তভোগী জোবায়েদের ভাই এনায়েত হোসেনকে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে জানান। পরে এনায়েত তার শ্যালক শরীফ মোহাম্মদকে সঙ্গে নিয়ে মোটরসাইকেলে ওইদিন রাত সাড়ে আটটার দিকে ঘটনাস্থল রৌশান ভিলায় পৌঁছান। ওই ভবনের নিচতলা থেকে ওপরে ওঠার সময় তিনি সিঁড়ি এবং দেয়ালে রক্তের দাগ দেখতে পান। ওই ভবনের ৩য় তলার রুমের পূর্ব পার্শ্বে সিঁড়িতে গেলে সিঁড়ির ওপর জোবায়েদের রক্তাক্ত মরদেহ উপুড় অবস্থায় দেখতে পান। পরে ময়নাতদন্ত শেষে গত ২০ অক্টোবর জোবায়েদকে কুমিল্লার কৃষ্ণপুর গ্রামে দাফন করা হয়।
এ ঘটনায় ২১ অক্টোবর সকাল ১০ টার দিকে জোবায়েদের ভাই এনায়েত হোসেন সৈকত বাদী হয়ে রাজধানীর বংশাল থানায় হত্যা মামলা করেন। ওইদিনই বর্ষাসহ এই তিন আসামি নিজেদের দোষ স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দেন। এরপর তাদের কারাগারে পাঠানো হয়। এ ছাড়া এ মামলায় ওইদিন প্রীতম নামে আরেকজন সাক্ষী হিসেবে আদালতে জবানবন্দি দেন।
এনআর/এমএসএ
