বিজ্ঞাপন

ট্রাইব্যুনালে গুমজীবনের বর্ণনা

তুলে নেওয়ার কারণ জানতেই রশিতে ঝুলিয়ে পেটাতে থাকেন নারী

তুলে নেওয়ার কারণ জানতেই রশিতে ঝুলিয়ে পেটাতে থাকেন নারী

বাসা থেকে তুলে নেওয়া হয়েছিল রাতের আঁধারে। চোখ বাঁধা আর হাতে হাতকড়া। অজানা এক বন্দিশালায় কেটে যায় দিনের পর দিন। করা হয় অমানবিক নির্যাতনও। এমনকি কোন অপরাধে গুম করে রাখা হয়েছে- কারণ জানতে চাইতেই তার জীবনে নেমে আসে আরও ভয়াবহতা। রশিতে ঝুলিয়ে পেটাতে থাকেন এক নারী সদস্য।

নিজের গুমজীবন নিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে এমনই বর্ণনা দিয়েছেন নুরে আলম। ৩২ বছর বয়সী এ যুবকের বাড়ি নীলফামারিতে। পেশায় একজন ব্যবসায়ী।

জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেন্টারে (জেআইসি) গুম-নির্যাতনের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাক্ষ্যগ্রহণের দিন ধার্য ছিল বুধবার (১২ আগস্ট)। এদিন ট্রাইব্যুনাল-১ এর সদস্য বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরীর একক বেঞ্চে সপ্তম সাক্ষী হিসেবে নুরে আলমের জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়। এ মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ মোট আসামি ১৩ জন। 

২০১৬ সালে নীলফামারী সরকারি কলেজের রসায়ন বিভাগের অনার্স তৃতীয় বর্ষের ছাত্র ছিলেন নুরে আলম। করতেন রাজনীতিও। কলেজের রসায়ন বিভাগ শাখার ছাত্রদলের সভাপতি হওয়ায় বিভিন্ন সময় মিছিল-মিটিংয়ে অংশ নিতে হতো তাকে। তখন আওয়ামী লীগ সরকার আর ভারতের বিরুদ্ধে লেখালেখি করতেন তিনি।

সাক্ষ্যে ভুক্তভোগী নুরে আলম বলেন, ২০১৬ সালের ১২ এপ্রিল রাত ১১টায় ছোট ভাই কামরুল আলমকে নিজের ফ্লেক্সিলোডের দোকানে রেখে আমি বাসায় এসে খাবার খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ি। রাত দেড়টার দিকে ঘরের দরজায় টোকা দেন কামরুল। দরজা খুলতেই ছোট ভাইসহ অচেনা আরও পাঁচ-ছয়জনকে দেখতে পাই। তারা আমার কক্ষে ঢুকে নাম জিজ্ঞেস করেন। একইসঙ্গে ব্যবহৃত ফোন চান। ফোন দেওয়ার পর তারা পুরো ঘর তল্লাশি চালান। কামরুলকে প্রশাসনের লোক বলে পরিচয় দিয়েছেন ওসব লোক। একপর্যায়ে আমাকে নিয়ে যান।
 
তিনি বলেন, ঘর থেকে বের করে আমাকে বাড়ির সদর দরজার কাছে নেওয়া হয়। এরপর তারা পিছমোড়া করে আমার হাতে হাতকড়া লাগান। ওই সময় চারটি ছাঁই রঙের মাইক্রোবাস ছিল। লোক ছিলেন ৩০-৩৫ জন। একপর্যায়ে একটি গাড়িতে তুলে চোখ বেঁধে ফেলেন একজন। পরানো হয় যমটুপিও। পরে উচ্চ শব্দে গান বাজিয়ে গাড়ি চালাতে থাকেন তারা। এক-দেড় ঘণ্টা চলার পর এক জায়গায় থামিয়ে আমাকে গাড়ি থেকে বের করা হয়। দুজন মিলে সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় নিয়ে একটি টুলের ওপর বসান। প্রায় ৩০ মিনিট রাখার পর পুনরায় নিচে নামিয়ে একটি গাড়িতে তোলেন তারা। গাড়িটি আট-দশ ঘণ্টা চলার পর একটি জায়গায় থামিয়ে নামানো হয়। এক থেকে দুই ধাপ সিড়ি উঠিয়ে ১০-১২ কদম সামনে নিয়ে বাঁ দিকে মোড় নিয়ে ডান দিকে ঘুরিয়ে একটি সেলে ঢোকানো হয়।

সেলে ঢোকানোর পর নুরে আলমের হাতের হাতকড়া, যমটুপি ও চোখের বাঁধন খুলে দেওয়া হয়। হাতে একটি লুঙ্গি ও একটি গেঞ্জি দিয়ে পরার জন্য নির্দেশ দেন তারা। ওই কক্ষে কোনো জানালা ছিল না। একটি চৌকি, একটি বালিশ, কোরআন শরীফ, জায়নামাজ ও একটি প্রস্রাবের পাত্র ছিল। কক্ষটি ৮ ফিট বাই ১১ ফিট। উচ্চতা ছিল ১৩ ফিট। দরজা দুই স্তরের ছিল। মাঝেমধ্যে এক্সস্ট ফ্যান চালালেও বৈদ্যুতিক বাল্বটি ২৪ ঘণ্টাই জ্বালানো থাকতো।

ভুক্তভোগী বলেন, কক্ষের চারদিকের দেয়ালে অসংখ্য লেখা ছিল। এর মধ্যে কিছু লেখা ছিল হে আল্লাহ আমাকে উদ্ধার কর, আল্লাহ জালিমদের সাহায্য করেন না। কোথাও তারিখ, কোথাও মোবাইল নম্বর লেখা ছিল। কোথাও ছিল অসংখ্য দাগ। একদিন মাইকে কোনো ব্যক্তির মৃত্যুর খবরে পূর্ব কাফরুল নিবাসী শব্দটি শুনতে পাই। এতে বুঝতে পারি পূর্ব কাফরুলের আশপাশে ক্যান্টনমেন্টের কোথাও গুম হয়ে রয়েছি। প্রথম দিন আমাকে খাবার খাইয়ে দুজন ব্যক্তি সেলের ভেতরে প্রবেশ করেন। তারা আমার হাতে হাতকড়া পরিয়ে চোখ বেঁধে দেন। এরপর বের করে কিছুদূর নিয়ে একটি টুলের ওপর বসিয়ে প্রেশার, জ্বরসহ শারীরিক পরীক্ষা করেন তারা। পরে অন্য একটি কক্ষে নিয়ে আরেকটি টুলে বসানো হয়। সেখানে এক ব্যক্তি আমার নাম-পরিচয় জিজ্ঞাসা করেন। একপর্যায়ে ফেসবুক অ্যাকাউন্টের পাসওয়ার্ড চান।

কেন ছাত্রদলের রাজনীতি করেন, শেখ হাসিনা সরকার আর ভারতের বিরুদ্ধে লেখালেখির কারণও জানতে চান অফিসাররা। কিন্তু তুলে আনার কথা জিজ্ঞেস করলে নুরে আলমের ওপর ক্ষেপে যান তারা। রেগে গিয়ে বলে ওঠেন- রেললাইন বা নদী-নালার পাশে কিংবা বস্তাবন্দি যেসব লাশ পাওয়া যায়, তা তারাই করেন।

জবানবন্দিতে নুরে আলম বলেন, অফিসাররা আমাকে বলেন তোকে যেভাবে বলব সেভাবেই থাকবি ও চলবি। তাহলে ভালো থাকবি। আমাদের কথামতো চললে যেভাবে বাসা থেকে তুলে নিয়ে আসছি, সেভাবে রেখে আসবো। এরপর আমার দুই হাঁটু ও উরুর ওপর বেধড়ক পেটাতে থাকেন একজন পুরুষ কর্মকর্তা। পেটানো শেষে আমার হাতে কয়েকটি কাগজ ও কলম দিয়ে বলেন- রুমে যাও। ছোটবেলা থেকে যে যে প্রতিষ্ঠানে লেখাপড়া করেছো, তোমার পিতা-মাতা কে কোন দল করেন, তুমি যাদের সঙ্গে চলাফেরা কর তারা কে কোন দল করেন সবকিছুর বিস্তারিত বর্ণনা লিখবে। পরে দুজন ব্যক্তি আমাকে ধরে সেলের ভেতরে নিয়ে আসেন। একইসঙ্গে হাতকড়া ও চোখের বাঁধন খুলে দেওয়া হয়। 

তিনি বলেন, সেলে একটি সিসি ক্যামেরা লাগানো ছিল। পাশাপাশি ছিল কয়েকটি সেল। এখানে যারা দায়িত্ব পালনকারীদের মুখে সবসময় মাস্ক পরা থাকতো। তাদের প্রশ্ন করলে কোনো জবাব দিতেন না। এরপর আমাকে পাঁচ-ছয়বার জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। একদিন জিজ্ঞাসাবাদ করেন একজন নারী কর্মকর্তা। তিনিও আমাকে আগের মতো সব প্রশ্ন করেন। তাকেও তুলে আনার কারণ জিজ্ঞেস করি। কিন্তু এ প্রশ্নে তিনিও বেশ রেগে যান। একপর্যায়ে আমার হাতের হাতকড়া খুলে দড়ি দিয়ে বাঁধেন তিনি। এরপর রশিতে আমাকে ঝুলিয়ে কোমর থেকে পা পর্যন্ত বেধড়ক পেটান। মারধর শেষে কাগজ-কলম দিয়ে বলেন- যাদের সঙ্গে রাজনীতি করেছিস তাদের নাম লিখে নিয়ে আয়। এরপর আবারও সেলে আনা হয়।

এই ভুক্তভোগী জানান, সেলে প্রথম কয়েকদিন তাকে ঘুমাতে দেওয়া হতো না। ঘুমালে লোহার দরজায় প্রচণ্ড শব্দ করে কাগজে লিখতে বলা হতো। তারা তাকে প্রচণ্ড শারিরীক ও মানসিক নির্যাতন করতেন। ওই সেলে ১৪-১৫ দিন থাকার পর চোখ বেঁধে একই ভবনের আরেকটি সেলে নিয়ে যান তারা। সেলে নিয়ে চোখ খোলার পর আরও চারজনকে দেখতে পান তিনি। কক্ষটি ছিল ১২ ফিট বাই ১৩ ফিটের। জানালা ছিল কাঁচের। তবে রং করা। জানালার ছিদ্র দিয়ে বাইরের কিছু গাছপালা দেখতে পান এই যুবক।

নুরে আলম বলেন, একদিন রাতে আমার সেলে ঢোকেন দুজন ব্যক্তি। তারা আমাকে তুলে আনার সময়ে পরনে থাকা জামা-কাপড় দেন। ওই দিন ২০১৬ সালের ২৬ জুন ছিল। জামা-কাপড় বদলানোর পর আমার হাতে হাতকড়া পরিয়ে চোখ বেঁধে যমটুপি পরান তারা। এরপর সেল থেকে বের করে একটি গাড়িতে তুলে দেড় ঘণ্টা চলার পর একটি জায়গায় থামানো হয়। গাড়ি থেকে বের করে পাঁচ-ছয় ধাপ সিঁড়ি বেয়ে ওঠেন। এভাবে ধাপে ধাপে ১০-১২ সিঁড়ি ওপরে উঠে একটি লোহার দরজার শব্দ করেন তারা। দরজা খোলা হলে আমাকে কক্ষে নেওয়া হয়। পরে ১০-১২ কদম হেঁটে বাঁ দিকে ঘুরে একটি সেলের ভেতরে প্রবেশ করান। কিছুক্ষণ পর তারা একটি লুঙ্গি দিয়ে চিকন গলির মধ্যে বাথরুমে নিয়ে যান। সেখানে এক হাতের হাতকড়া খুলে দিয়ে লুঙ্গি পরে গায়ে থাকা বস্ত্র খুলে তাদের হাতে দিতে বলেন। এরপর পুনরায় হাতকড়া লাগিয়ে সেলে নিয়ে বসান। আমার হাত দুটি দরজার লোহার শিকের বাইরে নিয়ে হাতকড়া পরিয়ে দেন। তাদের সঙ্গে কোনো কথা বললে প্রচণ্ড মারধর করতেন। দরজার বাইরে হাতকড়া লাগানো থাকায় শুতে পারতাম না। একসময় খুবই অসুস্থ হয়ে যাই। কিন্তু তারা কোনো চিকিৎসা দেননি।

এ কক্ষের বিবরণ দিয়ে সাক্ষী বলেন, কক্ষটির প্রস্থ ছিল চার বা পাঁচ ফুট। দৈর্ঘ্য ১২ বা ১৩ ফুট ছিল। এখানে পাশাপাশি ছিল কয়েকটি সেল। তারা সারাদিন আমাকে মাত্র দুবার বাথরুমে নিয়ে যেতেন। একবার সকালে ও একবার রাতে। দাঁত ব্রাশ, গোসল, টয়লেট, ওজু করার জন্য সর্বোচ্চ দুই মিনিট সময় দেওয়া হতো। একটু সময় বেশি লাগলে তারা সেলের ভেতর নিয়ে দাঁড়িয়ে রেখে লোহার শিকের বাইরে হাত বের করে হাতকড়া লাগিয়ে সারাদিন পেটাতেন। কোনো খাবারও দিতেন না। প্রায় ৪০ দিন এ সেলে রাখার পর ওই বছরের ৭ আগস্ট আমাকে টয়লেটে নিয়ে আগের কাপড়চোপড় পরতে বলা হয়। এরপর মাথায় যমটুপি পরিয়ে নিচে নামিয়ে একটি গাড়িতে তোলেন তারা। গাড়িটি আনুমানিক এক থেকে দেড় ঘণ্টা চলার পর একটি স্থানে থামলে দুজন ব্যক্তি আমাকে সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় ওঠান।

ট্রাইব্যুনাল

সাক্ষী অসুস্থ থাকায় প্রসিকিউশনের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে জবানবন্দি অসমাপ্ত রেখে আগামী ১৮ আগস্ট পর্যন্ত মুলতবি করেন ট্রাইব্যুনাল। প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানি করেন প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম ও শাইখ মাহদী। সঙ্গে ছিলেন প্রসিকিউটর তাসমিরুল ইসলাম, সহিদুল ইসলাম সরদার, আবদুস সাত্তার পালোয়ানসহ অন্যরা।

এ মামলায় ১৩ আসামির মধ্যে গ্রেপ্তার রয়েছেন তিনজন। তারা হলেন- ডিজিএফআইয়ের সাবেক পরিচালক মেজর জেনারেল শেখ মো. সরওয়ার হোসেন, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মাহবুবুর রহমান সিদ্দিকী ও ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আহমেদ তানভির মাজাহার সিদ্দিকী। তাদের আজ সকালে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়।

এমআরআর/এমএসএ