চব্বিশের জুলাই আন্দোলনে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হন মোটরশ্রমিক মো. সম্রাট হোসেন। শরীরে এখনও প্রায় ৪০টি পিলেট বহন করছেন তিনি। দীর্ঘ চিকিৎসার পরও দৃষ্টি ফেরেনি চোখের। চিকিৎসকরা তাকে জানিয়েছেন, তার চোখ আর ভালো হওয়ার সম্ভাবনা নেই।
বুধবার (১২ আগস্ট) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর সদস্য বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরীর একক বেঞ্চে দেওয়া জবানবন্দিতে এসব বিবরণ দেন তিনি।
চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থান চলাকালে নারায়ণগঞ্জে ১০ জনকে হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় তিন নম্বর সাক্ষী হিসেবে সাক্ষ্য দেন সম্রাট। এ মামলায় সাবেক এমপি শামীম ওসমানসহ মোট আসামি ১২ জন।
৩৩ বছর বয়সী সম্রাট একজন মোটরশ্রমিক। ঢাকার চিটাগং রোডে গার্মেন্টস শিপমেন্টের গাড়ি চালাতেন তিনি। তার গ্রামের বাড়ি জামালপুরের ইসলামপুরে। বর্তমানে থাকেন নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায়।
জবানবন্দিতে সম্রাট বলেন, ২০২৪ সালের জুলাই মাসে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন শুরু হয়। ১৯ জুলাই কোনো কাজ না থাকায় আমিও আন্দোলনে যোগ দেই। ওই দিন সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত নারায়ণগঞ্জের চাষাঢ়া এলাকায় ছিলাম। ওই সময় আমাদের ওপর এলোপাতাড়ি গুলি ছুড়তে থাকেন তৎকালীন এমপি শামীম ওসমান, তার ছেলে অয়ন ওসমান, ভাতিজা আজমেরী ওসমান, একজন সাংবাদিকসহ ছাত্রলীগ-যুবলীগের নেতাকর্মীরা। তাদের ছোড়া গুলিতে আমার চোখ, মাথায় ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে বিদ্ধ হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ি। একই সময় দেলোয়ার হোসেন নামে আরেকজন সহযোদ্ধার গায়ে একশ’র বেশি পিলেট বিদ্ধ হয়।
তিনি বলেন, আমি মাটিতে লুটিয়ে পড়ার পর জ্ঞান ছিল না। জ্ঞান ফেরার পর ছোট ভাই মিল্লাত হোসেনসহ আরও একজন মিলে আমাকে খানপুরের হাসপাতালে নেন। সেখানে শরীরে ছয়-সাতটি ইনজেকশন পুশ করে চিকিৎসা দেওয়া হয়। মূলত আন্দোলন চলাকালে আমরা শিবু মার্কেটের কাছে সন্তাপুরে অবস্থান নেই। ঠিক তখনই আমাদের ওপর এ হামলা চালানো হয়।
সাক্ষী জানান, খানপুর হাসপাতাল থেকে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠান চিকিৎসকরা। ১৯ জুলাই রাতে ঢামেকে তার সারা শরীর ও দুই চোখে অপারেশন করা হয়। অপারেশন শেষে তিনদিন চিকিৎসাধীন ছিলেন তিনি। এরপর চিকিৎসকরা উন্নত চিকিৎসার জন্য জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট হাসপাতালে পাঠান। কারণ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসকরা আমাকে বলেন- 'আপনার চোখ এখনও স্বাভাবিক নয়। আপনাকে এক মাস পর জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট হাসপাতালে যেতে হবে।' কেননা অপারেশনের পরও আমি ডান চোখে দেখতে পাচ্ছিলাম না। এখনও আমি দেখতে পারি না। বাঁ চোখে দেখতেও সমস্যা হয়।
এই জুলাইযোদ্ধা বলেন, ঢামেক চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী আমি এক মাস পর ওই হাসপাতালে যাই। আমাকে সেখানে ভর্তি করা হয়। ১০ মাস চিকিৎসাধীন থাকাকালে আমার চোখে পাঁচটি অপারেশন হয়। কিন্তু এখনও আমার চোখে, মাথায় ও সারা শরীরে ৪০টির মতো পিলেট রয়েছে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা। তারা জানান- 'আমার চোখ আর ভালো হবে না। বরং দিন দিন খারাপ হতে থাকবে।'
সম্রাট বলেন, আমি একজন গেজেটভুক্ত আহত জুলাইযোদ্ধা। এ ঘটনার জন্য আমি শামীম ওসমান, অয়ন, আজমেরী, সাংবাদিক রাজুসহ ছাত্রলীগ-যুবলীগের নেতাকর্মীদের দায়ী করি।
প্রসিকিউশনের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে পরবর্তী সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য আগামী ১৮ আগস্ট দিন ধার্য করেছেন ট্রাইব্যুনাল। প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানি করেন প্রসিকিউটর জহিরুল আমিন। সঙ্গে ছিলেন প্রসিকিউটর সহিদুল ইসলাম সরদার ও আবদুস সাত্তার পালোয়ান।
এ মামলায় সব আসামিই পলাতক রয়েছেন। শামীম ওসমান ছাড়া অন্যরা হলেন- শামীম ওসমানের ছেলে ইমতিনান ওসমান অয়ন, ভাতিজা আজমেরী ওসমান, অয়নের শ্যালক মিনহাজ উদ্দিন আহমেদ ভিকি, নারায়ণগঞ্জ রাইফেলস ক্লাবের সাবেক সভাপতি তানভীর আহমেদ টিটু, বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল ডিবিসির নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি রাজু আহমেদ, ১৭ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর আব্দুল করিম বাবু, ১৮ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর কামরুল হাসান মুন্না, নারায়ণগঞ্জ মহানগর আওয়ামী লীগের সাবেক যুগ্ম সম্পাদক শাহ নিজাম উদ্দিন আহমেদ, যুবলীগ নেতা শাহাদাত হোসেন সাজনু, ছাত্রলীগ নেতা হাবিবুর রহমান রিয়াদ ও সোহানুর রহমান শুভ্র।
এমআরআর/বিআরইউ
