বিজ্ঞাপন

ট্রাইব্যুনালে সাক্ষীর বর্ণনা

বিজয় মিছিলে ছিলেন বাবা, ফোন পেয়ে হাসপাতালে গিয়ে দেখলেন ছেলের লাশ

বিজয় মিছিলে ছিলেন বাবা, ফোন পেয়ে হাসপাতালে গিয়ে দেখলেন ছেলের লাশ

গুলির শব্দে মুহূর্তেই ছত্রভঙ্গ হয়ে যান সবাই। প্রাণ বাঁচাতে যে যার মতো ছোটাছুটি করছিলেন। এর মধ্যেই খোঁজ মিলছিল না সামিদের। তার ফোনে একের পর এক কল দিচ্ছিলেন বন্ধু আবদুল নাসির উদ্দিন। কিন্তু কোনো সাড়া মিলছিল না। শেষ পর্যন্ত অচেনা নম্বর থেকে ফোন পেয়ে নাসির ছুটে যান হাসপাতালে। আইসিইউতে গিয়ে দেখা মেলে রক্তাক্ত সামিদের। তার ফোন পেয়ে বিজয় মিছিল থেকে হাসপাতালে গেলেও ছেলেকে আর জীবিত পাননি বাবা।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় ইন্টারনেট বন্ধ করে হত্যাযজ্ঞের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলায় দেওয়া সাক্ষ্যে এমনই বর্ণনা দিয়েছেন নাসির। সোমবার (১৭ আগস্ট) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর সদস্য বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরীর একক বেঞ্চে অষ্টম সাক্ষী হিসেবে তার জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়।

এ মামলায় আসামি হিসেবে রয়েছেন ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় ও সাবেক আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক। তবে পলক গ্রেপ্তার থাকলেও পলাতক আছেন জয়।

নাসির বর্তমানে নরসিংদী পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে লেখাপড়া করেন। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট আন্দোলনের সময় গাজীপুরের টঙ্গীর চেরাগআলীতে থাকতেন তিনি।

জবানবন্দিতে নাসির বলেন, ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই আবু সাঈদকে হত্যার পর থেকে আমি কোটাবিরোধী আন্দোলনে অংশ নিই। ১৮ জুলাই ইন্টারনেট বন্ধ হয়ে যায়। ৫ আগস্ট দুপুর ১২টার দিকে আমি, বন্ধু সামিদসহ চার-পাঁচজন মিলে ‘লং মার্চ টু ঢাকা’র উদ্দেশে টঙ্গীর চেরাগআলী থেকে বের হই। দুপুর ২টার দিকে উত্তরা বিএনএস এলাকায় পৌঁছাই আমরা। আড়াইটা থেকে উত্তরা পূর্ব থানার দিক থেকে পুলিশ ও আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা আমাদের ওপর এলোপাতাড়ি গুলি ছুড়তে থাকেন। এতে আমরা ছত্রভঙ্গ হয়ে যাই। সামিদকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। তার ফোনে অনেক কল দিলেও রিসিভ হচ্ছিল না। বিকেল ৫টায় একটি অপরিচিত নম্বর থেকে আমার ফোনে কল আসে। কল রিসিভ করার পর সামিদের সন্ধান দিয়ে উত্তরা কুয়েতমৈত্রী হাসপাতালে যেতে বলা হয়। হাসপাতালে অনেক খোঁজাখুঁজির পর তাকে আইসিইউতে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় পাই। তার কপালে গুলি লেগে মাথার পেছন দিয়ে বেরিয়ে যায়।

ট্রাইব্যুনালে সাক্ষী বলেন, সামিদ রক্তাক্ত অবস্থায় ছিলেন। তখন তার বাবাকে আমি কল করি। শেখ হাসিনার পতনের পর উত্তরায় বিজয় মিছিলে ছিলেন তিনি। কিছুক্ষণ পর সামিদের বাবা হাসপাতালে আসেন। কিন্তু তিনি ছেলেকে মৃত পান। ওই দিন রাত ৮টার দিকে সামিদের লাশ হাসপাতাল থেকে বের করে আমরা টঙ্গীর চেরাগআলীতে যাই। রাত ১১টায় সেখানে প্রথম জানাজা হয়। জানাজা শেষে লাশ নিয়ে তার গ্রামের বাড়ি ময়মনসিংহের মুক্তাগাছার উদ্দেশে রওনা হই। রাত ৩টায় তার গ্রামের বাড়িতে পৌঁছাই। লাশ রেখে একই অ্যাম্বুলেন্সে করে আমি চেরাগআলীতে ফেরত আসি।

সাক্ষ্যে তিনি উল্লেখ করেন, ৫ আগস্ট সকালে ইন্টারনেট ছিল না। ওই দিন শেখ হাসিনার নির্দেশে উত্তরা এলাকায় গুলি করে প্রায় ৩০ থেকে ৪০ জন মানুষকে হত্যা করা হয়। বহু মানুষকে গুলি করে আহত করা হয়। ওই দিন যারা হত্যার শিকার হয়েছেন, তাদের মধ্যে সামিদ, সানজিদ, জসিম ও সোহেলও রয়েছেন।

শেখ হাসিনা ও তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়ের নির্দেশে ইন্টারনেট বন্ধ করে দেন পলক, যেন দেশের এসব হত্যাকাণ্ডের খবর বিশ্ববাসী জানতে না পারেন। আন্দোলনকারীরা যেন নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ করতে না পারেন। এজন্য ইন্টারনেট বন্ধ করা হয় বলে দাবি করেন নাসির। একই সঙ্গে, হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শান্তি চান তিনি।

জবানবন্দি শেষে তাকে জেরা করেন পলকের আইনজীবী লিটন আহমেদ ও পলাতক জয়ের পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী মনজুর আলম।

ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউশনের পক্ষে ছিলেন প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম, মার্জিনা রায়হান, মামুনুর রশিদ, সহিদুল ইসলাম সরদারসহ অন্যান্য প্রসিকিউটর।

এমআরআর/এসএএস