বিজ্ঞাপন

যুক্তরাষ্ট্রে থেকেও দেশে সই! যেভাবে শত কোটির সম্পদ আত্মসাৎ

যুক্তরাষ্ট্রে থেকেও দেশে সই! যেভাবে শত কোটির সম্পদ আত্মসাৎ

জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে ঐতিহ্যবাহী ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান ‘আলাউদ্দিন সুইটমিট লিমিটেড হোটেল খাওয়া দাওয়া’-এর প্রায় শত কোটি টাকার সম্পত্তি আত্মসাৎ, ভুয়া লিকুইডেশন (কোম্পানি বন্ধকরণ) এবং বিপুল পরিমাণ রাজস্ব ফাঁকির চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে।

আদালতে দায়ের হওয়া এক মামলার তদন্তে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) নিশ্চিত করেছে, কোম্পানির কয়েকজন পরিচালক ও তাদের সহযোগীরা অন্য শেয়ারহোল্ডারদের অজ্ঞাতে জাল স্বাক্ষর, মিথ্যা তথ্য ও ভুয়া অডিট রিপোর্ট তৈরি করে অর্থ ও সম্পত্তি আত্মসাৎ করেছেন। প্রতিবেদনে ইবনে সিনা ফার্মাসিউটিক্যালসের ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ (এমডি) ছয়জনের বিরুদ্ধে জালিয়াতি, ভুয়া অডিট রিপোর্ট তৈরি ও কর ফাঁকির সুস্পষ্ট সত্যতা পাওয়ার কথা জানানো হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির একটি মূল্যবান জমি প্রকৃত বাজারমূল্যের তুলনায় বহুগুণ কম দেখিয়ে সরকারি রাজস্ব ফাঁকি দিয়েছে ইবনে সিনা।

আদালত সূত্রে জানা যায়, জালিয়াতি, প্রতারণা, তথ্য গোপন ও বিশ্বাসভঙ্গের মাধ্যমে সম্পত্তি আত্মসাতের অভিযোগে আলাউদ্দিন সুইটমিটের অন্যতম শেয়ারহোল্ডার কানিজ ফাতেমা বাদী হয়ে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে আদালতে মামলাটি দায়ের করেন।

দীর্ঘ ২০ বছর যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত শেয়ারহোল্ডার কানিজ ফাতেমাকে দেশে উপস্থিত দেখিয়ে ভুয়া সভা, জাল স্বাক্ষর ও ভুয়া অডিট রিপোর্টের মাধ্যমে সচল ‘আলাউদ্দিন সুইটমিট’ বন্ধ (লিকুইডেশন) ঘোষণা করা হয়। এর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠাতার অন্য ওয়ারিশদের বঞ্চিত করে পরিচালকরা শত কোটি টাকার সম্পদ আত্মসাৎ করেন

মামলার আসামিরা হলেন— বাদীর চাচি ও প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান সুফিয়া বেগম, চাচাতো বোন জেরিন আহম্মেদ, চাচাতো ভাই মো. ফাহমিদ, জেরিনের স্বামী মো. মারুফ আহম্মদ, ইবনে সিনা ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক অধ্যাপক ড. আবুল কালাম মোহাম্মদ সদরুল ইসলাম, প্যানাসিয়া সার্ভিসেস (প্রা.) লিমিটেডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক চৌধুরী মাহমুদ হাসান, আইনজীবী বনি আমিন এবং চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট এস এন মিয়াজি।

আদালতের নির্দেশে সিআইডির পরিদর্শক শাহজালাল মুন্সি সম্প্রতি তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেন। প্রতিবেদনে প্রথম ছয়জন আসামির বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির পৃথক ধারা এবং আয়কর আইন, ২০২৩-এর ৩১২ ধারায় অপরাধের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। অন্য দুজনের বিরুদ্ধে পর্যাপ্ত সাক্ষ্যপ্রমাণ না পাওয়ায় তাদের অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়েছে।

যেভাবে শুরু জালিয়াতি

তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৯৮২-৮৩ সালে নিবন্ধিত ‘আলাউদ্দিন সুইটমিট লি. হোটেল খাওয়া দাওয়া’-এর প্রতিষ্ঠাকালে সমহারে ১০০টি করে মোট ৬০০টি পরিশোধিত শেয়ারের মালিক ছিলেন ছয়জন। তারা হলেন— বাদীর বাবা মাহবুব, চাচা মো. মাসুম, চাচা মো. মাইজুদ্দিন, দাদি জেবুন্নেছা বেগম, মা ফাতেমা মাহবুব ও চাচি সুফিয়া বেগম।

২০০৫ সালে জেবুন্নেছা বেগম এবং ২০০৬ সালে মো. মাইজুদ্দিন মারা গেলে, তাদের উত্তরাধিকারীদের কাছে শেয়ার হস্তান্তর করা হয়নি। উল্টো অন্যান্য শেয়ারহোল্ডারের অগোচরে আসামি সুফিয়া বেগম ও তার প্রয়াত স্বামী মো. মাসুম যৌথ পারিবারিক কোম্পানিটিকে একক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করেন। পরে আইনি বিধি লঙ্ঘন করে ৬০০টি মূল শেয়ারকে ২০১৭ সালে ১ লাখ ৩৮ হাজার ৯২০টি এবং ২০১৮ সালে ১ লাখ ১০ হাজার ৯৬০টিতে উন্নীত করে নিজেদের মধ্যে বেআইনিভাবে বণ্টন করে নেন।

জালিয়াতির বিষয়টি জানা সত্ত্বেও সেনপাড়া পর্বতা মৌজার ২০.৮৩ কাঠার মূল শিল্পপ্লটটি কেনায় অংশ নেয় ইবনে সিনা ফার্মাসিউটিক্যালস। প্রায় ৬৩ কোটি টাকার জমি সাফ কবলা দলিলে মাত্র ১৭ কোটি টাকা দেখিয়ে অবশিষ্ট ৪৬ কোটি টাকা অবৈধভাবে নগদ লেনদেন করা হয়, যার মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ আয়কর ও স্ট্যাম্প ডিউটি ফাঁকি দেওয়া হয়েছে

এদিকে, মামলার বাদী কানিজ ফাতেমা দীর্ঘ ২০ বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছেন। ইমিগ্রেশন রেকর্ড পর্যালোচনা করে দেখা যায়, কানিজ ফাতেমা ২০০৫ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের ১ অক্টোবর পর্যন্ত বাংলাদেশে আসেননি। অথচ আসামিরা কানিজ ফাতেমাসহ অন্যান্য শেয়ারহোল্ডারের উপস্থিত দেখিয়ে ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে একটি ভুয়া বার্ষিক সাধারণ সভা (এজিএম) ও বোর্ড রেজুলেশন তৈরি করেন। এর ধারাবাহিকতায় ওই বছরের জুনে সচল কোম্পানিটিকে ভুয়া প্রক্রিয়ায় বন্ধ (লিকুইডেশন) ঘোষণা করা হয়।

অডিট রিপোর্টে ৬৩ কোটি টাকার জমি গায়েব

কোম্পানির লিকুইডেটর প্রয়াত মো. মাসুম ও চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট এস এন মিয়াজির তৈরি করা অডিট রিপোর্টে রাজধানীর দারুসসালাম থানাধীন সেনপাড়া পর্বতা মৌজায় কোম্পানির ২০.৮৩ কাঠার মূল শিল্পপ্লটটির তথ্য সম্পূর্ণ গোপন রাখা হয়। সেখানে পুরো কোম্পানির মোট স্থাবর সম্পদ দেখানো হয় মাত্র নয় লাখ ৩০ হাজার টাকা, যা পরবর্তী সময়ে জাল স্বাক্ষরের মাধ্যমে আসামিরা আত্মসাৎ করেন।

জাতীয় গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় এবং মিরপুর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের নথি পর্যালোচনায় দেখা যায়, ইবনে সিনা ফার্মাসিউটিক্যালসের এমডি অধ্যাপক ড. আবুল কালাম মোহাম্মদ সদরুল ইসলাম ও প্যানাসিয়া সার্ভিসেসের চেয়ারম্যান অধ্যাপক চৌধুরী মাহমুদ হাসান জালিয়াতির বিষয় জানা সত্ত্বেও জমিটি কেনায় অংশ নেন। ২০১৬ সালের জানুয়ারিতে এক চুক্তিপত্রে ইবনে সিনা জমিটির মূল্য নির্ধারণ করেছিল ৪০ কোটি টাকা।

তদন্ত কর্মকর্তা উল্লেখ করেন, ২০১৬ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে সম্পাদিত একাধিক ক্রয়চুক্তিতে জমির মূল্য ধাপে ধাপে ৪০ কোটি, ১৬ কোটি ২৫ লাখ ও ১ কোটি ৬১ লাখ টাকা দেখানো হয়। সবশেষ ২০১৮ সালে সাফ কবলা দলিলে জমির মূল্য দেখানো হয় মাত্র ১৭ কোটি টাকা। অথচ ওই সময়ে জমিটির প্রকৃত বাজারমূল্য ছিল প্রায় ৬৩ কোটি টাকা। ১৭ কোটি টাকা দলিলে দেখিয়ে অবশিষ্ট প্রায় ৪৬ কোটি টাকা অবৈধ নগদ লেনদেন করা হয়েছে, যার মাধ্যমে সরকার বিপুল পরিমাণ স্ট্যাম্প ডিউটি, গেইন ট্যাক্স ও আয়কর থেকে বঞ্চিত হয়েছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে কাল্পনিক দিন দিয়ে ২০ জন সদস্যের মধ্যে ১৫ জনের ভুয়া স্বাক্ষর সমন্বিত একটি বোর্ড রেজুলেশন তৈরি করা হয়। সেই রেজুলেশন জমা দিয়েই জাতীয় গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় থেকে জমি কেনাবেচার অনুমতি নেওয়া হয়েছিল। পরে সাফ কবলা দলিলের মাধ্যমে জমিটি অবৈধভাবে হস্তান্তর ও দখল করা হয়।

সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য ও আইনগত পদক্ষেপ

তদন্তের বিষয়ে সিআইডির পরিদর্শক শাহজালাল মুন্সি ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘অভিযোগের তদন্ত শেষে আদালতে প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়েছে। আট আসামির মধ্যে ছয়জনের বিরুদ্ধে জালিয়াতি, জাল স্বাক্ষর, মিথ্যা তথ্য, ভুয়া অডিট রিপোর্ট ও কর ফাঁকির প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেছে। তাদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধি ও আয়কর আইনে অভিযোগ আনা হয়েছে।’

সিআইডির তদন্তে ইবনে সিনার এমডিসহ ছয়জন আসামির বিরুদ্ধে জালিয়াতি, মিথ্যা তথ্য ও কর ফাঁকির অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ার কথা জানিয়ে প্রতিবেদন দাখিল করা হয়েছে। তবে, আদালতে নিয়মবহির্ভূত শুনানির অভিযোগ তুলে ন্যায়বিচার না পাওয়ার আশঙ্কায় বিচারকের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রকাশ করে মামলা বদলির আবেদন জানান বাদীপক্ষের আইনজীবী

বাদীপক্ষের আইনজীবী মো. একরামুল হক মজুমদার ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘মামলার বাদী দীর্ঘ দিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছেন। তিনি বিদেশে থাকাকালেই তাকে দেশে উপস্থিত দেখিয়ে স্বাক্ষর জাল করার মাধ্যমে কোম্পানির বিপুল সম্পদ আত্মসাৎ করেছেন আসামিরা। আমরা এ বিষয়ে জালিয়াতি ও প্রতারণার অভিযোগে মামলা দায়ের করেছিলাম। সিআইডি তদন্তে নেমে আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগের সুস্পষ্ট সত্যতা পেয়েছে এবং আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করেছে। এতে আসামিদের বিরুদ্ধে কর ফাঁকিরও স্পষ্ট প্রমাণ মিলেছে। উপরন্তু, যে প্রক্রিয়ায় জমিটি হস্তান্তর করা হয়েছে, তা মানি লন্ডারিং অপরাধের আওতায় পড়ে। এ বিষয়ে সরকার বা দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) আলাদা মামলা দায়ের করতে পারে।’

আদালতের সাম্প্রতিক কার্যক্রম নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে এই আইনজীবী আরও বলেন, ‘গত ৩ আগস্ট তদন্ত প্রতিবেদনের ওপর শুনানির দিন ধার্য ছিল। আমরা আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির জোর দাবি জানিয়েছিলাম। কিন্তু সেদিন বিধিবহির্ভূতভাবে আসামিপক্ষের আইনজীবীরা শুনানি করেন। শুনানি শেষে আদালত প্রথমে আসামিদের বিরুদ্ধে সমন জারির আদেশ দিলেও, পরবর্তী সময়ে পুনরায় শুনানির জন্য দিন ধার্য করেন।’

আইনজীবী একরামুল হক মজুমদার বলেন, ‘বিদ্যমান পরিস্থিতিতে এই আদালতে ন্যায়বিচার পাওয়ার কোনো সম্ভাবনা আমরা দেখছি না। তাই চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালতের কাছে সংশ্লিষ্ট বিচারকের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রকাশ করে মামলাটি অন্য কোনো আদালতে বদলির আবেদন করব।’

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে ইবনে সিনা ফার্মাসিউটিক্যালসের এমডি অধ্যাপক ড. আবুল কালাম মোহাম্মদ সদরুল ইসলামের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। তবে, প্রতিষ্ঠানটির নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহ করছি। আমাদের লিগ্যাল অফিসার দেশের বাইরে আছেন, তিনি ফিরলে বিষয়টি নিয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ ঠিক করা হবে। যেহেতু বিষয়টি আদালতে বিচারাধীন, তাই আপাতত কোনো মন্তব্য করছি না।’

এনআর/এসএম