আওয়ামী আমলে বিচার বিভাগের চূড়ান্ত রাজনীতিকীকরণের মাধ্যমে ক্ষমতাকে দীর্ঘস্থায়ী করার একটি ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছিল। তবে বিচার বিভাগের এই রাজনীতিকীকরণের জন্য কেবল আওয়ামী লীগকে এককভাবে দায়ী করা যায় না; অতীতের বিভিন্ন শাসনামলও এ ধরনের রাজনীতিকরণে ভূমিকা রেখেছে। ফলে রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ অনেকাংশে নির্ভর করছে ভবিষ্যৎ রেজিমগুলো বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, আইনের শাসন ও গণতান্ত্রিক নীতির প্রতি কতটা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকে এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের মাধ্যমে এ ধারার কতটা পরিবর্তন আনতে সক্ষম হয় তার ওপর।
মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) সন্ধ্যায় অনুষ্ঠিত এক পাবলিক লেকচারে এ মন্তব্য করেন সংবিধান ও আইনের ইতিহাস বিষয়ক গবেষক আরিফ খান।
জুলাই অভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে বাংলা একাডেমির আল মাহমুদ লেখক কর্নার সভাকক্ষে ‘জুলাই অভ্যুত্থান: আইন ও বিচার বিভাগীয় পটভূমি এবং পরিণতি’ শীর্ষক এ লেকচার আয়োজন করে রিডিং ক্লাব ট্রাস্ট। আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সুপ্রিম কোর্ট রিপোর্টার্স ফোরামের সাধারণ সম্পাদক ও ঢাকা পোস্টের বিশেষ প্রতিনিধি মেহেদী হাসান ডালিম, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার প্রিয়া আহসান চৌধুরী এবং আইনজীবী হাবিবুর রহমান।

মূল প্রবন্ধে আরিফ খান বলেন, জুলাই আন্দোলনে বিচার বিভাগের অপরিণামদর্শী সিদ্ধান্ত জুলাই আন্দোলনকে প্রভাবিত করেছে, রূপায়িত করেছে। ২০২৪ সালের ৫ জুন, বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ সরকারি চাকরিতে মুক্তিযোদ্ধা কোটা বাতিলকারী ২০১৮ সালের সার্কুলারটিকে অবৈধ ঘোষণা করেন। তিনি এই রায়কে কোটা সংস্কার আন্দোলনের প্রধান অনুঘটক হিসেবে তুলে ধরার পাশাপাশি, ২০১৩ সালে গণজাগরণ মঞ্চের মাধ্যমে কোর্টের রায়ের বিরোধিতা করার ঘটনাটি উল্লেখ করে দেখান, কীভাবে আইন ও বিচার ব্যবস্থা একটি আন্দোলনের পটভূমি তৈরি করতে পারে এবং পরবর্তীতে সেই আন্দোলনেরই শিকার হতে পারে। ‘বিচার বিভাগকে খর্ব করার, বিকলাঙ্গ করার, ক্ষমতাবানদের দাসানুদাস করার দায় পূর্ববর্তী সকল রেজিম এর রয়েছে!’ এরূপ ব্যক্ত করেন আরিফ খান।
আলোচক সাংবাদিক মেহেদী হাসান ডালিম পঠিত প্রবন্ধের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে জুলাই ও তার পূর্ববর্তী অভিজ্ঞতা এবং ফ্যাসিবাদী রেজিম কর্তৃক বিচার বিভাগের রাজনীতিকীকরণের কিছু দৃষ্টান্ত তুলে ধরেন। তিনি বলেন, আওয়ামী সরকার বিচার বিভাগকে বিরোধীমত দমনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছিল। এর পরিণতি হয়েছে ভয়ংকর। জুলাই বিপ্লব পরবর্তী সরকার অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে বিচার বিচার বিভাগ রাজনীতিকরণের পথে হাঁটবে না বলে আশা প্রকাশ করেন। এসময় তিনি একজন বিতর্কিত ব্যক্তিকে দুদকের চেয়ারম্যান নিয়োগের সমালোচনা করেন।
আলোচক ব্যারিস্টার প্রিয়া আহসান চৌধুরী জুলাই অভ্যুত্থানকালে ম্যাজিস্ট্রেটদের মৌনতা এবং ওভারসাইট মেকানিজম হিসেবে কাজ করার ব্যর্থতা, আবার এর বিপরীতে আন্দোলনকালে ছাত্রদের গুলি করার বিপক্ষে সিনিয়র আইনজীবীদের পিটিশনের ঘটনা তুলে ধরেন। তিনি বলেন যে, ম্যাজিস্ট্রেটগণ পুলিশদের অযাচিত কর্মকাণ্ডকে সমালোচনা ও প্রশ্নবিদ্ধ করতে হবে। তিনি আরও বলেন যে, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে তাদের সমালোচনার এক্তিয়ার রাখতে হবে।
আলোচক হাবিবুর রহমান মনে করেন বর্তমান সময়ে বিচারবিভাগ এর ভূমিকা ও ত্রুটি উভয় নিয়ে আলোচনা করতে পারা জুলাই অভ্যুত্থান এর একটি সাফল্য। আলোচনাকালে তিনি হেনরি ডেভিড থোরোর সিভিল ডিসওবিডিয়েন্স গ্রন্থের বিখ্যাত উক্তি-“জাজেস, নট লজ, পুট মেন ইন প্রিজন” তুলে ধরে বলেন যে আমলা ও পুলিশদের পাশাপাশি অন্যায়কারী বিচারকদেরও জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে।
অনুষ্ঠানটিতে প্রশ্নোত্তর ও উন্মুক্ত আলোচনা পর্ব পরিচালনা করেন রিডিং ক্লাব ট্রাস্ট এর ট্রাস্টি রাশেদ রাহম। অনুষ্ঠানে নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশনের প্রধান ও নারীপক্ষের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি শিরীন পারভীন হক, গীতিকবি শহীদুল্লাহ ফরাজী, সাংবাদিক শুভ কিবরিয়া, আইনজীবী ও রিডিং অ্যাসোসিয়েটরা একই সঙ্গে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থী এবং নানা শ্রেণি পেশার মানুষ উপস্থিত ছিলেন।
এমএইচডি/বিআরইউ
