বিজ্ঞাপন

ট্রাইব্যুনালে পুলিশ কর্মকর্তার সাক্ষ্য

সিমেন্টের বস্তায় লাশ, পোশাক দেখে মেলে সাবেক বিডিআর সদস্যের পরিচয়

সিমেন্টের বস্তায় লাশ, পোশাক দেখে মেলে সাবেক বিডিআর সদস্যের পরিচয়

গুম-খুনের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়েছেন বাগেরহাটের শরণখোলা থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. নিজাম উদ্দিন হাওলাদার। 

সাক্ষ্যে তিনি বলেন, ২০১০ সালের ১৭ মে বলেশ্বর নদীর পশ্চিম তীরে সিমেন্টের বস্তায় হাত-পা বাঁধা ও পেট কাটা এক গলিত লাশ উদ্ধার করা হয়। পরে থানায় সংরক্ষিত মৃতের শার্ট-প্যান্ট দেখে লাশটি শনাক্ত করেন স্বজনরা। মরদেহটি সাবেক বিডিআর সদস্য নজরুল ইসলামের ছিল বলে দাবি করেন তারা।

রোববার (২৩ আগস্ট) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর সদস্য বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরীর একক বেঞ্চে ৯ নম্বর সাক্ষী হিসেবে নিজাম উদ্দিনের জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়। 

৬০ বছর বয়সী নিজাম অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ছিলেন। ২০১০ সালে শরণখোলা থানায় ওসি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তার বাড়ি খুলনা শহরে।

সাক্ষ্যে নিজাম উদ্দিন বলেন, ২০১০ সালের ১৭ মে আমি সরকারি বিশেষ কাজে পুলিশ সুপারের কার্যালয় বাগেরহাটে যাই। ওই দিন বিকেল ৩টার পর শরণখোলা থানার একজন চৌকিদার আমাকে ফোন দিয়ে জানান যে, বলেশ্বর নদীর পশ্চিম তীরে অজ্ঞাতনামা এক ব্যক্তির লাশ পড়ে আছে। ওই এলাকাটির নাম চাল রায়েন্দা। লাশটির শরীরে সিমেন্টের বস্তা বাঁধা ছিল। লাশটি ছিল গলিত ও পেট কাটা। মাথাটি কাপড় দিয়ে ঢাকা ও হাত-পা বাঁধা ছিল। ফোনে চৌকিদার এসব বলার পর থানার দায়িত্বে থাকা এসআই ইকবালকে জানিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেই।

তিনি বলেন, নির্দেশ পেয়ে জিডিমূলে ঘটনাস্থলে যান এসআই ইকবাল। তিনি লাশের সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুত করেন। সন্ধ্যা হওয়ায় লাশটি থানায় নিয়ে আসেন। ওই দিন আর সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়নি। এ ঘটনায় চৌকিদার বাদী হয়ে একটি এজাহার করলে এসআই ইকবাল একটি নিয়মিত হত্যা মামলা করে নিজেই তদন্তভার নেন।

পুলিশের সাবেক এই কর্মকর্তা বলেন, ওই দিন রাতে থানায় ফিরে আমি লাশটি দেখি। লাশে পচন ধরায় শুধু লাশের বাহ্যিক অবস্থা দেখা হয়। পরদিন সকালে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয় সদর হাসপাতালে। লাশটি অজ্ঞাত হওয়ায় আঞ্জুমান মফিদুল ইসলামের মাধ্যমে দাফন করা হয়। এর দুদিন পর আমাকে ফোন দিয়ে লাশটি নিজের ভাইয়ের বলে দাবি করেন এক ব্যক্তি। দুই-তিন মাস আগে গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া থেকে তার ভাই অপহৃত হন বলেও জানান তিনি।

এ ঘটনায় কোটালীপাড়া থানায় অপহরণ মামলা করেছেন জানালে তাদের থানায় আসতে বলেন নিজাম উদ্দিন। চার-পাঁচদিন পর মৃতের দুই ভাই, স্ত্রী ও চাচা থানায় আসেন। একইসঙ্গে থানায় রক্ষিত শার্ট ও প্যান্ট দেখে মৃত ব্যক্তিকে শনাক্ত করেন তারা। দাফন নিয়ে জানতে চাইলে বাগেরহাট কবরস্থানে কবর দেওয়া হয়েছে বলে তাদের জানান তৎকালীন এই ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা।

নিজাম উদ্দিন বলেন, লাশটি নিজেদের এলাকায় নেওয়ার কথা জানান স্বজনরা। তখন ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়ার পর জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে লাশটি নেওয়া যাবে বলে আমি তাদের জানাই। ওই সময় তারা বলেন- 'লাশটি একজন সাবেক বিডিআর সদস্যের। তার নাম নজরুল ইসলাম। পিলখানা ঘটনার পর তিনি পলাতক অবস্থায় গোপালগঞ্জের একটি ক্লিনিকে মেডিকেল এসিস্ট্যান্ট হিসেবে কর্মরত ছিলেন'। তবে লাশ উদ্ধারের চার-পাঁচদিন পর খুলনা বিডিআর সেক্টর থেকে কর্নেল পরিচয়ে আমাকে ফোন করেন একজন। পত্রিকার মাধ্যমে জেনে লাশের সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য জানতে চেয়েছেন ওই ব্যক্তি। এছাড়া একজন বিডিআর সদস্য থানায় আসবেন বলেও আমাকে জানানো হয়। এমনকি তাকে যেন কাগজপত্র দিয়ে সহায়তা করি। প্রয়োজনে তিনিও ডিএনএ পরীক্ষার ব্যবস্থা করতে চান। থানায় আসা নিহতের স্বজনরাও ডিএনএ পরীক্ষার জন্য রাজি হন।

ট্রাইব্যুনালে এই কর্মকর্তা বলেন, ঘটনার দুই সপ্তাহ পর আমি বদলি হয়ে রামপাল থানায় চলে যাই। শরণখোলা থানায় আমি ১১ মাস চাকরি করেছি। ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হিসেবে মোট ছয় বছর দায়িত্ব পালন করি। সমসাময়িক সময়ে আমি পত্রিকার মাধ্যমে জানতে পারি যে, ওই সময় দেশের বিভিন্ন স্থানে গুলিবিদ্ধ ব্যক্তিদের লাশ পাওয়া যাচ্ছিল।

ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানি করেন প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম ও শাইখ মাহদী। সঙ্গে ছিলেন প্রসিকিউটর তাসমিরুল ইসলাম, মঈনুল করিম, আবদুস সাত্তার পালোয়ানসহ অন্যরা।

আসামিপক্ষে ছিলেন জিয়াউলের আইনজীবী মিজানুর রহমান, সাহিদুর রহমান ও নাজনীন নাহার। এ সময় মামলার একমাত্র আসামি জিয়াউলও কাঠগড়ায় ছিলেন। 

এমআরআর/এমএসএ