চব্বিশের জুলাই-আগস্টের আন্দোলন ঘিরে রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের হামলার বর্ণনা দিয়েছেন মুহাম্মদ রিদওয়ান হাসান নামের এক মাদরাসা শিক্ষক। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দেওয়া জবানবন্দিতে তিনি বলেন, ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই জুমার নামাজ চলাকালে যাত্রাবাড়ীর বড় মাদরাসাকে লক্ষ্য করে টিয়ারশেল, সাউন্ড গ্রেনেড ও ছররা গুলি ছোড়ে পুলিশ। এতে নামাজরত মুসল্লিরা ছত্রভঙ্গ হয়ে যান।
ইমাম হাসান তাইম হত্যার ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ১১ আসামির বিরুদ্ধে ২৬তম সাক্ষী হিসেবে তার জবানবন্দি রেকর্ড করেন ট্রাইব্যুনাল-২ এর সদস্য বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।
৩৩ বছর বয়সী রিদওয়ান যাত্রাবাড়ী জামিয়া ইসলামিয়া দারুল উলুম মাদরাসা থেকে পড়াশোনা শেষ করেন। ২০১৩ সালের নভেম্বর থেকে একই প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। সচেতন নাগরিক হিসেবে নিজের জবানবন্দিতে আওয়ামী লীগ শাসনামলের চিত্র তুলে ধরেন তিনি। একইসঙ্গে কোটাবিরোধী আন্দোলন কীভাবে সরকার পতনের একদফা আন্দোলনে গড়িয়েছিল, সেসব বিবরণ দেন এই শিক্ষক।
জবানবন্দির একপর্যায়ে রিদওয়ান বলেন, ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই পুলিশ, ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের গুলিতে রংপুরের আবু সাঈদ, চট্টগ্রামের ওয়াসিমসহ ছয়জন শিক্ষার্থী শহীদ হন। এতে সারা দেশের মানুষ বিক্ষোভে ফেটে পড়েন। কওমি মাদরাসার শিক্ষক হিসেবে আমিও আন্দোলনে অংশ নেই। আমার ছাত্ররা আগে থেকেই সম্পৃক্ত থাকলেও এ ঘটনার পর আরও জোরালো হয়। ১৮ জুলাই রাত ৮টায় যাত্রাবাড়ী এলাকায় শিক্ষার্থীদের শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে ১৪ বছরের মাদরাসা ছাত্র আহমদ আব্দুল্লাহকে প্রথমে গুলি করে পুলিশ। এরপর তাকে সাঁজোয়া যান দিয়ে চাপা দেওয়া হয়। তাকে হাসপাতালে নিলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। ওই দিন সারাদেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের নেতাকর্মীরা আন্দোলনকারীদের ওপর ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ চালান। হত্যাযজ্ঞ যেন সাধারণ জনগণ জানতে না পারেন, সেজন্য ইন্টারনেট বন্ধ করে দেয় তৎকালীন সরকার।
তিনি বলেন, ১৯ জুলাই ছিল শুক্রবার। ওই দিন আমি যাত্রাবাড়ী বড় মাদরাসার মসজিদে জুমা নামাজ আদায় করছিলাম। নামাজ চলাকালেই বিনা কারণে মাদরাসাকে লক্ষ্য করে টিয়ারশেল, সাউন্ড গ্রেনেড ও ছড়রা গুলি ছুড়তে থাকেন পুলিশ সদস্যরা। এতে নামাজরত মুসল্লিরা ছত্রভঙ্গ হয়ে যান। পরে এ ঘটনার প্রতিবাদে মুসল্লি ও মাদরাসা ছাত্ররা একযোগে রাস্তায় নেমে আসেন। এদিন যাত্রাবাড়ী এলাকায় দুজনসহ সারাদেশে ২৩-২৪ জন মাদরাসা শিক্ষার্থী নিহত হন। এছাড়া যাত্রাবাড়ীর অন্যান্য এলাকা, রামপুরা, বাড্ডা, উত্তরা, মিরপুরসহ সারাদেশে ব্যাপকহারে হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়।
তাইম হত্যার বর্ণনা দিয়ে এই মাদরাসাশিক্ষক বলেন, ২০ জুলাই কারফিউ শিথিল হলে যাত্রাবাড়ীর কাজলা ফ্লাইওভারের পাশে একটি চায়ের দোকানে বসেছিলেন কিছু শিক্ষার্থী। পুলিশ তাদের বের করে এনে মারধরের পর প্রকাশ্যে গুলি চালিয়ে একজনকে হত্যা করে। নিহতের নাম ইমাম হাসান তাইম ভূঁইয়া। তিনিও একজন পুলিশ সদস্যের ছেলে ছিলেন। ২১ জুলাই আন্দোলনে তুলনামূলক হত্যাযজ্ঞ কম হলেও গণগ্রেপ্তার, মিথ্যা মামলায় হয়রানি ও নির্যাতন করা হয়। এভাবে ৩ আগস্ট পর্যন্ত চলতে থাকে। ৩ আগস্ট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের ব্যানারে সরকার পতনের একদফা কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। যাত্রাবাড়ীতে সেদিন ‘আমারও কিছু বলার আছে’ নামে কর্মসূচি পালন করে একদফার সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করি আমরা আলেম সমাজ। আমাদের কর্মসূচিতে পুলিশ এসে হুমকি দেয়। ওই সময় শনিরআখড়া সেতুর নিচে দেশীয় অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে মারমুখী অবস্থান নেন ছাত্রলীগ, যুবলীগের অসংখ্য নেতাকর্মী। এরপর আমরা পুলিশের সাহায্যে যার যার বাড়িতে ফিরে যাই।
তিনি বলেন, ৪ আগস্ট সারাদেশে আন্দোলনে ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ সংঘটিত হয়। একইভাবে যাত্রাবাড়ীতেও অসংখ্য লোক হতাহত হন। ওই দিনই ৫ আগস্ট ‘লংমার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি বস্তাবায়নের আহ্বান জানানো হয়। এ কর্মসূচি বাস্তবায়নে সারাদেশের মানুষ গণভবনের উদ্দেশে রওনা হন। ৫ আগস্ট ঢাকার প্রবেশমুখগুলো তথা যাত্রাবাড়ী, উত্তরা, আশুলিয়া, মিরপুর, নারায়ণগঞ্জের চাষাঢ়া বন্ধ করে দেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ আওয়ামী লীগের সশস্ত্র ক্যাডার বাহিনী। কিন্তু সাধারণ জনতা মুক্তির আশায় রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে গণভবনের উদ্দেশে যেতে থাকেন। আমিও যাত্রাবাড়ী থেকে দুপুর ২টায় মিছিল নিয়ে রওনা হই। তবে যাত্রাবাড়ী থানার সামনে পৌঁছালে শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে পালিয়ে গেছেন বলে খবর পাই। তবু আমরা গণভবনের দিকে যেতে থাকি।
রিদওয়ান বলেন, আমাদের মিছিলটি সায়েদাবাদ পেরিয়ে ওয়ারীর কাছাকাছি পৌঁছালে মোবাইলে ফোন করে একজন জানান যে, যাত্রাবাড়ী থানার সামনে প্রচণ্ড গোলাগুলি হচ্ছে। যাত্রাবাড়ী বড় মাদরাসায় তিনটি ছাত্র-জনতার লাশ আনা হয়েছে। ফোনে আমি লাশ তিনটি ঢাকা মেডিকেল কলেজে পাঠানোর ব্যবস্থা করতে বলি। গণভবনে পৌঁছে শেখ হাসিনার পতনের জন্য শুকরিয়া নামাজ আদায় করি। নামাজ আদায়ের পর জানতে পারি সেদিন যাত্রাবাড়ীতে পাঁচ-ছয়জন মাদরাসাশিক্ষার্থীসহ প্রায় ৬০ জনের মতো ছাত্র-জনতাকে হত্যা করেছে পুলিশ ও বিজিবি। আমি এ হত্যাকাণ্ডে জড়িত আওয়ামী লীগ, তার অঙ্গসংগঠন এবং জড়িত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের বিচার চাই।
জবানবন্দি শেষে রিদওয়ানকে জেরা করেন গ্রেপ্তার ও পলাতক আসামিপক্ষের আইনজীবীরা। প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানি করেন প্রসিকিউটর ফারুক আহাম্মদ। সঙ্গে ছিলেন প্রসিকিউটর মঈনুল করিম, মার্জিনা রায়হানসহ অন্যান্য প্রসিকিউটর।
এ মামলায় ১১ আসামির মধ্যে গ্রেপ্তার দুজন হলেন- যাত্রাবাড়ী থানার তৎকালীন ওসি আবুল হাসান ও সাবেক এসআই শাহাদাত আলী।
পলাতক আসামিরা হলেন- ডিএমপির তৎকালীন কমিশনার হাবিবুর রহমান, যুগ্ম কমিশনার সুদীপ কুমার চক্রবর্তী, ওয়ারি জোনের সাবেক ডিসি ইকবাল হোসাইন, এডিসি শাকিল মোহাম্মদ শামীম, ডেমরা জোনের তৎকালীন এডিসি মো. মাসুদুর রহমান মনির, তৎকালীন সহকারী পুলিশ কমিশনার নাহিদ ফেরদৌস, যাত্রাবাড়ী থানার তৎকালীন পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) জাকির হোসেন, পুলিশ পরিদর্শক (অপারেশন) ওহিদুল হক মামুন ও এসআই (নিরস্ত্র) সাজ্জাদ উজ জামান।
চলতি বছরের ২২ ফেব্রুয়ারি ১১ আসামির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে বিচার শুরুর আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল-২। এরপর সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয় ২৯ মার্চ।
এমআরআর/জেআই
