বিজ্ঞাপন

হাইকোর্টের রায়

জব্দকৃত পচনশীল খাদ্যশস্য থানায় ফেলে রেখে বিনষ্ট করার সুযোগ নেই

জব্দকৃত পচনশীল খাদ্যশস্য থানায় ফেলে রেখে বিনষ্ট করার সুযোগ নেই

মজুতদারির অভিযোগে জব্দকৃত পচনশীল খাদ্যশস্য দীর্ঘদিন থানায় ফেলে রেখে বিনষ্ট করার কোনো আইনি অবকাশ নেই বলে অভিমত দিয়েছেন হাইকোর্ট। আইনি প্রক্রিয়ার দীর্ঘ সূত্রিতায় ভোগ্যপণ্য নষ্ট হওয়া রোধে আদালত এক রায়ে এমন গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন।

দীর্ঘদিন ধরে থানায় পড়ে থাকা জব্দকৃত চালের মালিকানা নিয়ে যুগ্ম জেলা জজ আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে ফৌজদারি রিভিশনের পরিপ্রেক্ষিতে জারি করা রুল যথাযথ ঘোষণা করে দেওয়া রায়ে এ পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন হাইকোর্ট।

মো. শিবলু হোসেন বনাম রাষ্ট্র মামলায় হাইকোর্ট এমন পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন। মঙ্গলবার (১ আগস্ট) রায়ের অনুলিপি ঢাকা পোস্টের হাতে এসেছে।

রায়ে আদালত বলেছেন, ২০২৫ সালের জুলাই থেকে দীর্ঘ এক বছরেরও বেশি সময় ধরে এসব চাল থানা হেফাজতে অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। পচনশীল ভোগ্যপণ্য দীর্ঘদিন এভাবে ফেলে রাখা কোনো যুক্তিযুক্ত উদ্দেশ্যে ব্যবহার হতে পারে না। এতে রাষ্ট্র বা ব্যক্তি কারও লাভ নেই। রায়ে আদালত নওগাঁয় জব্দ করা ওই ২৫ টন চালের প্রয়োজনীয় নমুনা রেখে অবশিষ্ট চাল ১৫ লাখ টাকার বন্ডে আসামি (আবেদনকারীর) জিম্মায় দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।

গত ১৯ আগস্ট বিচারপতি মো. খায়রুল আলম ও বিচারপতি মো. রাফিজুল ইসলামের হাইকোর্ট বেঞ্চের দেওয়া পূর্ণাঙ্গ রায়ে এসব কথা বলা হয়। হাইকোর্টের দেওয়া ওই রায়টি লিখেছেন বিচারপতি মো. খায়রুল আলম।

রায় ঘোষণাকালে আদালতে আবেদনের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী মো. মাহবুবুর রহমান। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মির্জা আল মাহমুদ ও মো. মাসুদুল আলম দোহা।

মামলার পটভূমি ও প্রেক্ষাপট

মামলার বিবরণী থেকে জানা যায়, ২০২৫ সালের ৩ জুলাই গোপন সংবাদের ভিত্তিতে নওগাঁর বদলগাছী উপজেলার খাদ্য নিয়ন্ত্রক মো. মিজানুর রহমানের নেতৃত্বে এক অভিযান পরিচালনা করা হয়। অভিযানে আসামি মো. জাহিদুল ইসলামের বাড়ি থেকে অবৈধভাবে মজুতকৃত ২৫ হাজার কেজি (২৫ মেট্রিক টন বা ৫০০ বস্তা) কাটারি আতপ চাল উদ্ধার করা হয়। এর আনুমানিক বাজার মূল্য ছিল ১৫ লাখ টাকা। উক্ত ঘটনার পরদিন ৪ জুলাই বদলগাছী থানায় ‘খাদ্যদ্রব্য উৎপাদন, মজুত, স্থানান্তর, পরিবহণ, সরবরাহ, বিতরণ ও বিপণন (ক্ষতিকর কার্যক্রম প্রতিরোধ) আইন, ২০২৩’-এর ৩(ঘ)/৪ ধারায় শিবলু হোসেন ও জাহিদুল ইসলামের নামে মামলা দায়ের করা হয়।

পরবর্তী সময়ে মামলাটি বিচারার্থে নওগাঁর তৃতীয় যুগ্ম জেলা জজ আদালতে স্থানান্তরিত হয়। তদন্ত চলাকালে আবেদনকারী মো. শিবলু হোসেন উক্ত চালের প্রকৃত মালিক দাবি করে তা নিজের জিম্মায় পেতে বিচারিক আদালতে আবেদন করেন। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ২০২৫ সালের ১৮ জুলাই আদালতে দাখিলকৃত প্রতিবেদনে শিবলু হোসেনকে জব্দকৃত চালের প্রকৃত মালিক হিসেবে উল্লেখ করেন। কিন্তু উক্ত প্রতিবেদন থাকা সত্ত্বেও বিজ্ঞ ম্যাজিস্ট্রেট ২০২৫ সালের ২২ জুলাই তারিখের আদেশে জব্দকৃত চালের জিম্মা চেয়ে পিটিশনারের আবেদনটি প্রত্যাখ্যান করেন। পরে দায়রা আদালত আবেদন খারিজের করে দেন।

এরপর ২২ জুলাই আদেশের বিরুদ্ধে পিটিশনার নওগাঁর সেশনস জজের কাছে ফৌজদারি রিভিশন দায়ের করেন। সেই রিভিশনও প্রত্যাখ্যাত হয়।

পরে আসামি-পিটিশনার ১৩ নভেম্বর পুনরায় জব্দকৃত চালের জিম্মা পাওয়ার জন্য বিচারিক আদালতে নতুন করে আবেদন করেন। সেই আবেদনও একই তারিখে প্রত্যাখ্যান করে আদেশ দেন আদালত।

পরে সংক্ষুব্ধ হয়ে একই দিনে অর্থাৎ, ১৩ নভেম্বর অধস্তন আদালতের আদেশ বাতিল এবং জব্দকৃত চাল নিজের জিম্মায় পেতে আবেদনকারী হাইকোর্ট বিভাগে ফৌজদারি রিভিশন দায়ের করেন।

আদালত সে আবেদনের শুনানি নিয়ে হাইকোর্ট রুল জারি করেন। এরপর গত ১৯ আগস্ট আগের জারি করা রুল যথাযথ ঘোষণা করে রায় দেন হাইকোর্ট।

হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ 

হাইকোর্ট বলেন, জব্দকৃত চাল দীর্ঘদিন পুলিশ হেফাজতে থাকায় নষ্ট হয়ে মানুষের ভোগের অনুপযোগী হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এভাবে তা পুলিশ হেফাজতে রেখে কোনো কার্যকর উদ্দেশ্য পূরণ হবে না। হাইকোর্ট ‘খাদ্যদ্রব্য উৎপাদন, মজুত, স্থানান্তর, পরিবহণ, সরবরাহ, বিতরণ ও বিপণন (ক্ষতিকর কার্যক্রম প্রতিরোধ) আইন, ২০২৩’-এর ১১ ধারার বিধান বিশ্লেষণ করেন।

আদালত উপরোক্ত আইনের ১১(১) ধারা উদ্ধৃত দিয়ে বলেন, এই আইনের অধীনে জব্দকৃত খাদ্যশস্য পচনশীল বা অপচনশীল যাই হোক না কেন—আদালতের দায়িত্ব হলো আলামত হিসেবে প্রমাণের জন্য কেবল প্রয়োজনীয় পরিমাণের ‘নমুনা’ সংরক্ষণ করা এবং অবশিষ্ট অংশ দ্রুত প্রকাশ্যে নিলামে বা আইনসম্মত উপায়ে নিষ্পত্তি করা।

আইনের ১১(৩) ধারার আলোকে আদালত উল্লেখ করেন, বিচার শেষে অপরাধ প্রমাণিত হলে বিক্রয়লব্ধ অর্থ বা জামানত সরকারের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত হবে। আর অপরাধ প্রমাণিত না হলে তা প্রকৃত মালিক ফেরত পাবেন।  

আদালতের রায় ও নির্দেশনা

রায়ে হাইকোর্ট বলেন, আলোচ্য মামলায় প্রতীয়মান হয় যে, মজুতদারির অভিযোগে ২০২৫ সালের ৩ জুলাই তারিখে কথিত চাল জব্দ করা হয়েছিল। জব্দকৃত চাল যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ ও সংরক্ষণ ছাড়া এক বছরেরও বেশি সময় ধরে থানার হেফাজতে রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে, এসব চাল দীর্ঘদিন পুলিশ হেফাজতে থাকায় নষ্ট হয়ে মানুষের ভোগের অনুপযোগী হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। মামলার উপরোক্ত তথ্য ও পরিস্থিতিতে আমরা এই অভিমত পোষণ করি যে, জব্দকৃত চাল এভাবে পুলিশের হেফাজতে রেখে কোনো কার্যকর উদ্দেশ্য পূরণ হবে না।

অতএব, রুলটিতে সারবত্তা রয়েছে এবং সে অনুযায়ী রুলটি চূড়ান্ত (যথাযথ) করা হলো।

আদালত আরও বলেন, সংশ্লিষ্ট আদালতকে (সেশন কোর্ট) নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে, জব্দকৃত চালের শুধুমাত্র প্রয়োজনীয় পরিমাণ সাক্ষ্যপ্রমাণের উদ্দেশ্যে নমুনা হিসেবে সংরক্ষণ করা হবে এবং অবশিষ্ট চাল আবেদনকারী অর্থাৎ মো. শিবলু হোসেনকে ১৫ লাখ টাকার বন্ড/জামানত সম্পাদনের শর্তে হস্তান্তর করা হবে। 

বিচার প্রক্রিয়া শেষে যদি আসামির (মো. শিবলু হোসেন) বিরুদ্ধে অপরাধ প্রমাণিত হয়, তবে উক্ত ১৫ লাখ টাকার বন্ডের অর্থ বাজেয়াপ্ত হয়ে সরকারি কোষাগারে জমা হবে। আর অপরাধ প্রমাণিত না হলে উক্ত বন্ড/জামানতটি মালিকের (শিবলু হোসেনের) অনুকূলে বাতিল বলে গণ্য হবে।

এমএইচডি/আরএফ