বিজ্ঞাপন

ট্রাইব্যুনালে সাক্ষী

মসজিদে চলছিল মাগরিবের নামাজ, পেছন থেকে ছুটে আসে পুলিশ-আ.লীগের গুলি

মসজিদে চলছিল মাগরিবের নামাজ, পেছন থেকে ছুটে আসে পুলিশ-আ.লীগের গুলি

জুলাই গণ–অভ্যুত্থান চলাকালে নামাজে দাঁড়ানো মুসল্লিদের দিকেও গুলি ছোড়া হয়েছিল বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করেছেন ৫৫ বছর বয়সী এক প্রত্যক্ষদর্শী। তিনি জানান, রাজধানীর আজিমপুরের মেয়র হানিফ জামে মসজিদে মাগরিবের নামাজরত অবস্থায় পেছন থেকে যুবলীগ, আওয়ামী লীগ ও পুলিশের সদস্যরা গুলি চালান। এতে পেছনের দুই কাতারে থাকা অনেক মুসল্লি গুলিবিদ্ধ হন। 

রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর সদস্য বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদের নেতৃত্বাধীন দুই সদস্যের বিচারিক প্যানেলে তার জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়। প্যানেলের অন্য সদস্য বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী। 

মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য কামরুল ইসলাম ও ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেননের বিরুদ্ধে দুই নম্বর সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেন এই সাক্ষী। নিরাপত্তার স্বার্থে তার নাম-পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি।

ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানি করেন প্রসিকিউটর মঈনুল করিম। সঙ্গে ছিলেন প্রসিকিউটর আবদুস সাত্তার পালোয়ান, মামুনুর রশিদ, মার্জিনা রায়হানসহ অন্যান্য প্রসিকিউটর।

এ সাক্ষীর বাড়ি চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলায়। বর্তমানে ঢাকার লালবাগে থাকেন। তার দুই ছেলে জুলাই-আগস্ট আন্দোলনে অংশ নেন।

জবানবন্দিতে সাক্ষী বলেন, ২০২৪ সালের ১৪ জুলাই আন্দোলনকারী ছাত্রদের রাজাকার আখ্যা দেন শেখ হাসিনা। প্রতিবাদে পরদিন আন্দোলনে নামেন ছাত্র-জনতা। আমার দুই ছেলেও অংশ নেন। ওই দিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে আমাদের ছেলেদের ওপর অমানুষিক নির্যাতন চালায় ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও পুলিশ। এর পরিপ্রেক্ষিতে ১৬ জুলাই রংপুরে আবু সাঈদ, চট্টগ্রামে ওয়াসিমসহ সারাদেশে ছয়জন আন্দোলনকারী শহীদ হন। তাদের আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ ও পুলিশ সদস্যরা গুলি চালিয়ে হত্যা করেন।

১৭ জুলাই নিজের বড় ছেলে রেজাউল করিম রেজাকে খুঁজতে বাসা থেকে বের হয়ে নীলক্ষেতে যান ৫৫ বছর বয়সী এই সাক্ষী। তার ছেলে ঢাকা কলেজের সামনে আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন। রেজাউল ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ছাত্র। কয়েকবার ফোন করলেও রিসিভ করেননি ছেলে। ওই দিন এই সাক্ষীও ঢাকা টিচার্স ট্রেনিং কলেজের বিপরীত পাশে ছাত্রদের সঙ্গে আন্দোলনে অংশ নেন। সেদিন ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও পুলিশের গুলিতে বহু আন্দোলনকারী ছাত্র গুলিবিদ্ধ হন। তাদের মধ্যে দুজনকে পপুলার হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নেন রেজাউলের বাবা।

সাক্ষ্যে তিনি বলেন, ১৮ জুলাই সকাল ১০টা থেকে সাড়ে ১০টার সময় আমি আজিমপুর বাসস্ট্যান্ড এলাকায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্রদের সঙ্গে আন্দোলনে যোগ দেই। একই দিনে বিকেল ৩টার দিকে আজিমপুর মেয়র হানিফ জামে মসজিদের সামনে গিয়ে দেখি পুলিশ, আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি করছেন। নিজের জীবন বাঁচাতে আমি ভিকারুননেছা নূন স্কুলের বিপরীতে নির্মাণাধীন একটি সরকারি ভবনের তিনতলায় গিয়ে আশ্রয় নেই। সেখানে থেকে দক্ষিণ দিকে একটি গলির ভেতরে দেখতে পাই হাজি সেলিমের ছেলে সোলায়মান সেলিম, ইরফান সেলিম, মতিউর রহমান জামাল, হুমায়ুন কবির, নাসির আহম্মেদ, সজিব, রাকিব, কমিশনার হাসিবুর রহমান মানিক, আনোয়ার হোসেন আনুসহ স্থানীয় আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা উপস্থিত আছেন। তারা সবাই সাবেক মন্ত্রী কামরুল ইসলামের বাহিনী। তাদের অনেকের হাতে অস্ত্র ছিল। তারা পুলিশের সঙ্গে থেকে গুলি করছিলেন।

সাক্ষী বলেন, আজিমপুর বাসস্ট্যান্ডের মসজিদের পেছনে সাততলা সরকারি কোয়ার্টার সামনে আমার ছোট ছেলে ইমতিয়াজ হোসেন ইফতি ও তার বন্ধু খালেদ সাইফুল্লাহ, মোহাম্মদ আশরাফুলসহ আরও অনেকেই আন্দোলনরত অবস্থায় ছিলেন। আমার ছোট ছেলে হাফেজ আব্দুর রাজ্জাক মাদ্রাসায় দশম শ্রেণিতে অধ্যায়নরত ছিল। ওই দিন বিকেল ৫টার দিকে পুলিশ, ছাত্রলীগ, যুবলীগসহ কামরুল ইসলামের বাহিনী আমাদের ছেলেদের ওপরে গুলি করে। এতে আমার ছোট ছেলে ইফতি, আশারাফুল, খালেদ সাইফুল্লাহসহ অনেক আন্দোলনকারী গুরুতর আহত হন। আন্দোলনকারী ছাত্ররা তাদের ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিলে খালেদ সাইফুল্লাহকে মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসক। আশরাফুলের ডান চোখ গুলিতে অন্ধ হয়ে যায়। আমার ছেলে ইফতিকে ঢাকা মেডিকেল থেকে ছাত্রলীগের ছেলেরা তুলে নিয়ে যান। এরপর তাকে নির্মম নির্যাতন করা হয়। রাত ১১টার দিকে তার দুই বন্ধু তাকে বাসায় দিয়ে যান।

তিনি আরও বলেন, ১৮ জুলাই বিকেল সাড়ে ৫টার পর আজিমপুর বাসস্ট্যান্ডের মসজিদের পেছনে সাততলা সরকারি কোয়ার্টারের সামনে আমিও আন্দোলনে উপস্থিত ছিলাম। ওই সময় আমার ডান চোখে একটি টিয়ারশেল লাগে। এতে চোখ জ্বলতে থাকে। আমি মেয়র হানিফ জামে মসজিদে ঢুকে চোখে পানি দেই। এরপরও চোখে কিছু দেখতে পাচ্ছিলাম না। তখন মসজিদে ইসলামী ছাত্রশিবিরের অনেক ছেলেকে ইফতার করতে দেখি। আমি ওই মসজিদে মাগরিবের নামাজে দাঁড়াই। কিন্তু পেছন থেকে মুসল্লিদের লক্ষ্য করে গুলি ছুড়তে থাকেন যুবলীগ, পুলিশ ও আওয়ামী লীগের লোকজন। নামাজরত পেছনের দুই কাতারে অনেকের গায়ে গুলি লাগে। নামাজ শেষে আমি বাসায় যাই। 

জবানবন্দিতে উল্লেখ করা হয়, ছেলে ইফতিকে খোঁজার জন্য ওই দিন সন্ধ্যা ৭টার দিকে সাততলা সরকারি কোয়ার্টারের কলোনিতে যান এই সাক্ষী। একপর্যায়ে কলোনির ২৩ নম্বর ভবনের সামনে দেখতে পান দুলাল মোহাম্মদ নামে একজন সরকারি কর্মকর্তাকে গুলি চালিয়ে হত্যা করেছে পুলিশ ও হেলমেট বাহিনী। ১৯ জুলাই সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি আমার বড় ছেলে রেজা ঘরে নেই। সকাল সাড়ে ১০টা পর্যন্ত ছেলেটি বাসায় না আসায় খুঁজতে বের হই। একটু পর বাসা থেকে ফোন করে জানানো হয় রেজা ফিরেছে। ওই দিন ফার্মগেটে বাইতুস শরফ জামে মসজিদে জুমার নামাজ শেষে আমি জাহাঙ্গীর গেটে যাই। সেখানে গিয়ে শুনতে পাই মহাখালী রেলগেটের দিক থেকে গুলি ছোড়া হচ্ছে। গুলির শব্দ কমলে মহাখালী রেলগেটের দিকে গিয়ে দেখি আন্দোলনরত কিছু ছাত্র গুলিবিদ্ধ হয়ে পড়ে আছেন। তাদের মধ্যে আমার পরিচিত একজন সায়েম খানও ছিলেন। তার বুকে গুলি লেগে পাশ দিয়ে বেরিয়ে যায়। আন্দোনকারীদের সহায়তায় তাকে একটি রিকশায় তুলে হাসপাতালে পাঠাই। চিকিৎসার জন্য কিছু টাকাও তাকে দেই। এরপর বাড্ডার দিকে রওনা হয়ে মহাখালী বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত গিয়ে দেখি আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ ও পুলিশ গুলি করছে। ১৯ জুলাই রাত সাড়ে ১২টায় বাসায় ফিরে জানতে পারি গণভবনে শেখ হাসিনার সঙ্গে ১৪ দলীয় জোটের গোপন বৈঠক হয়। বৈঠকে কারফিউ জারি ও সেনা মোতায়েনের সিদ্ধান্ত হয়। এছাড়া ছাত্রদের আন্দোলন দমনের জন্য প্রয়োজনে গুলি করতে ওবায়দুল কাদেরকে পরামর্শ দেন কামরুল ইসলাম ও রাশেদ খান মেনন। তাদের কুপরামর্শ অনুযায়ী আমাদের শত শত ছেলে-মেয়েদের গুলি চালিয়ে হত্যা ও আহত করেছে আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও পুলিশ।

এমআরআর/জেআই