বিজ্ঞাপন

ট্রাইব্যুনালে রুমা

স্বামীকে হারিয়েছি গুলিতে, সাক্ষী দেওয়ায় মেয়েকে ধর্ষণ করে আ.লীগ নেতারা

স্বামীকে হারিয়েছি গুলিতে, সাক্ষী দেওয়ায় মেয়েকে ধর্ষণ করে আ.লীগ নেতারা

জুলাই অভ্যুত্থানে পুলিশ ও নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের ছোড়া একটি গুলি কেড়ে নিয়েছিল স্বামীকে। আর স্বামী হত্যার বিচার চাইতে গিয়ে হারাতে হয়েছে মেয়েকেও। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দাঁড়িয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে এমনই হৃদয়বিদারক বর্ণনা দিয়েছেন শহীদ মো. জসিম উদ্দিনের স্ত্রী রুমা বেগম। তার অভিযোগ, স্বামী হত্যার ঘটনায় তদন্ত কর্মকর্তার কাছে জবানবন্দি দিতে ঢাকায় আসেন তিনি। আর এ সুযোগে বাবার কবর জিয়ারত শেষে ফেরার পথে তার মেয়েকে ধর্ষণ করেন কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতারা। তবে মানসিক ট্রমা সইতে না পেরে শেষমেশ আত্মহত্যা করে মেয়েটি।

রাজধানীর মোহাম্মদপুরে ৯ জনকে হত্যার ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার সাক্ষ্যগ্রহণের দিন ছিল সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর)। এদিন সপ্তম সাক্ষী হিসেবে রুমার জবানবন্দি রেকর্ড করেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর সদস্য বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।

ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানি করেন প্রসিকিউটর তারেক আবদুল্লাহ। সঙ্গে ছিলেন প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিম, আবদুস সাত্তার পালোয়ানসহ অন্যান্য প্রসিকিউটর।

৪১ বছর বয়সী রুমার বাড়ি পটুয়াখালীর দুমকি উপজেলায়। তিনি একজন গৃহিণী। চব্বিশের জুলাই-আগস্ট আন্দোলনে পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারান তার স্বামী জসিম উদ্দিন। শহীদ জসিম মানবিক উন্নয়ন কেন্দ্র ‘পদক্ষেপ’ নামের একটি এনজিওতে চালক হিসেবে চাকরি করতেন।

জবানবন্দিতে রুমা বলেন, ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে গিয়েছিলেন আমার স্বামী। তখন আমরা আদাবর থানাধীন শেখেরটেক ৬ নম্বর রোডে একটি ভাড়া বাসায় থাকতাম। তিনি ওই দিন ধাওয়া খেয়ে ফিরে আসেন। এতে তিনি আঘাতও পান। তবে ধাওয়া খেয়ে ধানমন্ডির কোনো এক জায়গায় তার গাড়ি রেখে এসেছিলেন। এ কারণে ১৯ জুলাই সকাল থেকে তাকে বের হতে দিচ্ছিলাম না। দিনটি ছিল শুক্রবার। এজন্য জুমার নামাজ আদায়ের কথা বলে বাসা থেকে বের হন তিনি। কিন্তু বাসায় ফিরে না আসায় তার মোবাইলে ফোন করলেও বন্ধ পাই। সন্ধ্যা ৭টার দিকে প্রতিবেশী কোহিনুর বেগম আমাকে জানান যে, জসিম উদ্দিন আন্দোলনে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেঝেতে পড়ে আছেন বলে জানিয়েছেন তার ছেলে উজ্জ্বল। এ খবর পেয়ে পাগলের মতো ছোটাছুটি করতে থাকি।

রুমার কাছে বাসায় অল্প কিছু টাকা ছিল। পাশের বাসার ভাড়াটিয়ার কাছ থেকে আরও ১০ হাজার টাকা নিয়ে চাচা শ্বশুর সালাম গাজীর সঙ্গে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের উদ্দেশে পায়ে হেঁটে রওনা দেন তিনি। কিছুক্ষণ যাওয়ার পর তারা একটি রিকশা পান। কিন্তু বাধা দেয় পুলিশ। হাসপাতালে পৌঁছে অপারেশন থিয়েটারের সামনে স্বামীকে রক্তাক্ত শরীরে একটি ট্রলিতে পড়ে থাকতে দেখেন এই নারী। এ পর্যায়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন সাক্ষী।

রুমা বলেন, তখনও আমার স্বামীর জ্ঞান ছিল। আমার সঙ্গে কথাও বলেছিলেন। গুলিতে তার দুটি আঙুল উড়ে গেছে বলে জানিয়েছেন তিনি। তার বুকেও একটি গুলি লেগেছে। গুলিটি বুক দিয়ে ঢুকে পেছন দিয়ে বের হয়ে গেছে। তার বুকে ও পিঠের ক্ষতস্থানে গজ ভরে রক্ত বন্ধ করার চেষ্টা করা হয়েছে। এরপরও রক্ত বের হচ্ছিল। জুমার নামাজ পড়ে আন্দোলনে অংশ নেওয়ার জন্য মোহাম্মদপুর আল্লাহ করিম মসজিদের সামনে গিয়েছিলেন বলে জানিয়েছেন আমার স্বামী। আর সেখানেই পুলিশ ও ছাত্রলীগের গুলিতে গুলিবিদ্ধ হন তিনি।

সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে একজন আন্দোলনকারীর সঙ্গে পরিচয় হয় রুমার। তার নাম সাইফুল। তিনিই তার স্বামীকে হাসপাতালে নিয়ে আসেন। এর মধ্যে জসিমের অপারেশন করতে রক্ত লাগবে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা। এজন্য টাকা দিলে দুই ব্যাগ রক্ত নিয়ে আসেন সাইফুল। ওই দিন হাসপাতালে গুলিবিদ্ধ বহু আন্দোলনকারীকে আনা হয়। তাদের চিকিৎসা দিতে হিমশিম খেয়ে যান চিকিৎসক-নার্সরা। জ্ঞান থাকায় জসিমের অপারেশন করা হয় সবার শেষে। রাত আড়াইটার সময় তার অপারেশন সম্পন্ন হয়। তাকে পর্যবেক্ষণ কক্ষেই রাখা হয়। ওই কক্ষে কাউকে ঢুকতে দেওয়া হয়নি।

সাক্ষ্যে জসিমের স্ত্রী বলেন, ২০ জুলাই বেলা ১১টার দিকে আমি পর্যবেক্ষণ কক্ষে ঢুকি। সেখানে আমার স্বামীর শরীর দিয়ে রক্ত বের হতে দেখি। কোনোভাবেই রক্ত থামানো যাচ্ছিল না। তার হাতের ব্যান্ডেজ খুলে দেখি দুটি আঙুল নেই। পচনও ধরে গেছে। বিষয়টি চিকিৎসকদের জানালে আঙুল দুটির গোড়া থেকে কেটে ফেলতে হবে বলে জানান। পরদিন আঙুল কাটা হয়। ২২ জুলাই আমার স্বামীর অবস্থা খারাপ হওয়ায় চিকিৎসকরা আইসিইউতে রাখতে বলেন। ওই হাসপাতালে আইসিইউ খালি না থাকায় বক্ষব্যাধি হাসপাতালে অনেক চেষ্টা করে একটি আইসিইউ ব্যবস্থা করে ভর্তি করা হয়। সেখানে আমার স্বামীর বুকে আরেকটি অপারেশন করা হয়। অপারেশনের পর তার আর জ্ঞান ফেরেনি। এরপর আমার অনুরোধে তাকে লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হয়। ২৯ জুলাই রাত ৯টার দিকে আমার স্বামী শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। এ পর্যায়ে সাক্ষী পুনরায় কান্নায় ভেঙে পড়েন।

স্বামী মারা গেলেও পুলিশ ক্লিয়ারেন্স ছাড়া লাশ দিতে না চাইলে বনানী থানায় যান রুমা। বক্ষব্যাধি হাসপাতালটি মহাখালী এলাকায় হওয়ায় ক্লিয়ারেন্স দেয়নি বনানী থানা। তাদের মোহাম্মদপুর থানায় যেতে বলা হয়। মোহাম্মদপুর থানায় গেলে জানানো হয় এখানে কোনো গুলি হয়নি। বনানী থানায় যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। এভাবে ২৯ জুলাই রাতভর এক থানা থেকে আরেক থানায় দৌড়াদৌড়ি করেন রুমা। পরদিন দুপুর পর্যন্ত কোনো ক্লিয়ারেন্স মেলেনি। বিকেল ৩টার দিকে হাসপাতালের সামনে তিনটি ছোট ছোট বাচ্চা নিয়ে কান্নাকাটি করতে থাকেন এই নারী। একইসঙ্গে স্বামীর লাশ দিতে অনুরোধ করেন। তখন হাসপাতাল পরিচালকের কক্ষে যাওয়ার পরামর্শ দেন একজন।

রুমা বলেন, পরিচালকের কক্ষে গেলে তিনি বনানী ও মোহাম্মদপুর থানায় দুটি চিঠি পাঠান। মর্গের একজন লোকের সঙ্গে চিঠি নিয়ে আমি বনানী থানায় যাই। তখন আমার একটি সাত মাসের বাচ্চা ছিল। বনানী থানার ওসি জানান তার কিছু করার নেই। ওপর মহলের হুকুমে ক্লিয়ারেন্স দিতে পারছেন না। পরবর্তী সময়ে মোহাম্মদপুর থানায় একটি মামলা করি। কারণ শর্ত ছিল মামলা না করলে লাশ দেবে না। এরপর অনেক জটিলতা শেষে ৩১ জুলাই আমার স্বামীর লাশ হস্তান্তর করা হয়। ওই দিন সন্ধ্যায় লাশ নিয়ে গ্রামের বাড়ির উদ্দেশে রওনা দেই। ফজরের আজানের সময় গ্রামের বাড়িতে পৌঁছাই। যাওয়ার পথে দুমকি থানার পুলিশ আমাকে ফোন দিয়ে বলেন, ‘লাশ বাড়িতে এনে সঙ্গে সঙ্গে কবরস্থ করতে হবে’। সকাল ৮টার দিকে আমার স্বামীর লাশ কবরস্থ করি।

সাক্ষী বলেন, এরপর আমার মেয়ে লামিয়ার ফোনে দেখতে পাই ৫ আগস্ট খুনি হাসিনা পালিয়েছেন। এর কিছুদিন পর আমি ঢাকায় আসি। তখন ফেসবুক, ইউটিউব, পত্র-পত্রিকা, ভাইরাল হওয়া ভিডিও এবং স্থানীয় লোকমুখে জানতে পারি যে, শেখ হাসিনা, মেয়র তাপস, জাহাঙ্গীর কবির নানকদের নির্দেশে পুলিশ কমিশনার হাবিব, প্রলয় কুমার জোয়ার্দার, বিপ্লব কুমার সরকার, রওশানুল হক সৈকতদের সহায়তায় আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসী শেখ বজলুর রহমান, আজিজুল হক রানা, এমএ সাত্তার, তোফায়েল সিদ্দিকি তুহিন, ইসমাইল হোসেন, আরিফুর রহমান তুহিন, কাউন্সিলর আসিফ আহমেদ, জাহাঙ্গীর কবির নানকের এপিএস মাসুদুর রহমান বিপ্লব, কাউন্সিলর তারিকুজ্জামান রাজিব, কাউন্সিলর সৈয়দ হাসান নূর ইসলাম রাষ্ট্রন, বিচ্ছু জালাল, আহাদ হোসেন সোহাগ, রিয়াজ মাহমুদ হৃদয়, নাঈমুল হাসান রাসেল, সাজ্জাদ হোসেন, নুর মোহাম্মদ সেন্টু, ফজলে রাব্বি, ইউনুস, মাইনুল ইসলাম পলাশ, মোল্লা রুবেল ও আরও অনেকে এসব হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত। ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে আমি আসিফ আহমেদ, তারিকুজ্জামান রাজিব, মাসুদুর রহমান বিপ্লব, আহাদ হোসেন সোহাগ, ফজলে রাব্বীদের আগ্নেয়াস্ত্র হাতে গুলি করতে দেখি। সাজ্জাদ হোসেনের হাতে চাপাতি ছিল। আমি ১৫ বছর ধরে শেখেরটেক মোহাম্মদপুর এলাকায় ভাড়া থাকি। আমি তাদের আগে থেকেই চিনি।

এ সময় ট্রাইব্যুনালকে রুমা বলেন, এ মামলার তদন্ত কর্মকর্তার কাছে জবানবন্দি দিতে, ২০২৫ সালের ১৭ মার্চ আমি ঢাকায় আসি। সঙ্গে আমার ভাই বেলাল মৃধা, মেজো মেয়ে বুশরা ও ছোট ছেলে জুবায়ের ইসলাম ছিল। বড় মেয়ে লামিয়া তখন দুমকি কলেজে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী ছিল। তাই তাকে বাড়িতে রেখে আসি। বাড়িতে থেকে লেখাপড়া করতো মেয়েটি। ১৮ মার্চ বাবার কবর জিয়ারত করে ফিরছিল লামিয়া। পথে তাকে ধর্ষণ করেন স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারা। আমি এই ট্রাইব্যুনালে সাক্ষী দিতে আসার কারণে তারা আমার মেয়েকে ধর্ষণ করেন। এ খবর সব জায়গায় ছড়িয়ে যাওয়ার পর আমার মেয়ে মানসিক ট্রমায় আক্রান্ত হয়ে আত্মহত্যা করে। এ পর্যায়ে আবারও কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। ট্রাইব্যুনালের কাছে স্বামীর হত্যারও বিচার চেয়েছেন।

এমআরআর/এসএএস