বিজ্ঞাপন

ট্রাইব্যুনালে টিপুর স্ত্রী

‘আমার কিছু হলে সন্তানদের কী হবে’, এরপরই এলো বন্দুকযুদ্ধে নিহতের খবর

‘আমার কিছু হলে সন্তানদের কী হবে’, এরপরই এলো বন্দুকযুদ্ধে নিহতের খবর

প্রাণনাশের আশঙ্কায় এলাকায় থাকা নিরাপদ মনে করছিলেন না ছাত্রদল নেতা টিপু হাওলাদার। স্ত্রী সুমা আক্তারের পরামর্শে ঢাকায় যান তিনি। কিন্তু দু’দিন পর গভীর রাতে ডিবি পুলিশ পরিচয়ে তাকে তুলে নেওয়া হয়। পরদিন সকালে টেলিভিশনে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ তার নিহত হওয়ার খবর আসে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দেওয়া জবানবন্দিতে ঘটনার বর্ণনা দিয়ে জড়িতদের বিচার চেয়েছেন টিপুর স্ত্রী সুমা আক্তার।

মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) ট্রাইব্যুনাল-২ এর সদস্য বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীরের একক বেঞ্চে তার জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়।

বরিশালের আগৈলঝাড়ায় বন্দুকযুদ্ধে দুজনকে হত্যার ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাবেক এমপি আবুল হাসানাত আবদুল্লাহসহ চারজনের বিরুদ্ধে ২০ নম্বর সাক্ষী হিসেবে সাক্ষ্য দেন তিনি। 

টিপু আগৈলঝাড়া উপজেলা জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। হত্যাকাণ্ডের শিকার আরেকজন হলেন একই উপজেলা জাতীয়তাবাদী সামাজিক সাংস্কৃতিক সংস্থার সাংগঠনিক সম্পাদক কবির মোল্লা।

৩৫ বছর বয়সী সুমার বাড়ি আগৈলঝাড়া উপজেলার নগরবাড়ি এলাকায়। বর্তমানে তার দুই সন্তান রয়েছে। টিপু হত্যাকাণ্ডের সময় সন্তানরা ছোট ছিল।

জবানবন্দিতে সুমা বলেন, ২০১১ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি পারিবারিকভাবে টিপু হাওলাদারের সঙ্গে আমার বিয়ে হয়। বিয়ের পর জানতে পারি আমার স্বামী একটি এনজিও পরিচালনার পাশাপাশি বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। আগৈলঝাড়া থানার বিভিন্ন লোকজনসহ ছাত্রদলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীর সঙ্গে তার সুসম্পর্ক ছিল। এ কারণে তৎকালীন উপজেলা চেয়ারম্যান মর্তুজা খান, উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সালেহ মোহাম্মদ লিটন, সহসম্পাদক রইস সেরনিয়াবাতসহ বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা আমার স্বামীকে তাদের দলে যোগ দেওয়ার কথা বলেন। এতে প্রায় রাতেই বিষণ্ণ হয়ে থাকতেন টিপু। কারণ জিজ্ঞাসা করলে আমার স্বামী বলেন যে, তাকে একটি সভায় দেখা করতে বলেছেন এমপি আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ। এ নিয়ে অনেক চাপের মধ্যে ছিলেন তিনি। 

সুমা বলেন, এক রাতে টিপু বলেন যে, বরিশালে দু-তিনটি ক্রসফায়ার হয়েছে। আমার কিছু হয়ে গেলে তোমার ও সন্তানদের কী হবে। টিপু মাস্টার্স সম্পন্ন করেছিলেন। এজন্য তাকে সাময়িকভাবে ঢাকায় গিয়ে চাকরির চেষ্টার পরামর্শ দেই। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে এলাকায় আসতে বলা হয়। অন্তত যেন তার জীবন বেঁচে যায়। আমার কথামতো ২০১৫ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি ঢাকার উদ্দেশে রওনা দেন টিপু। তিনি আমার মামার বাসায় ওঠেন। ১৯ ফেব্রুয়ারি রাত আড়াইটার দিকে মামি ও অপর আত্মীয় নাহার আপা আমাকে ফোন করে বলেন যে, ডিবি পুলিশ এসে টিপু হাওলাদারকে তুলে নিয়ে গেছে। আমি তখন গ্রামের বাড়িতে ছিলাম। পরে আত্মীয়স্বজনকে ফোনের মাধ্যমে ঘটনাটি জানানো হয়।

ঘটনার পর শাশুড়ি-ভাসুরসহ ওই দিন ভোরে আগৈলঝাড়া থানায় যান সুমা। কিন্তু টিপু হাওলাদারকে গ্রেপ্তারের বিষয়ে তারা কিছুই জানেন না বলে পুলিশ সদস্যরা জানান। তখন উপজেলা চেয়ারম্যান মর্তুজা খান, সাধারণ সম্পাদক সালেহ মোহাম্মদ লিটন, সহসম্পাদক রইস সেরনিয়াবাতসহ আওয়ামী লীগের নেতাদের বাসায় গিয়ে টিপুর বিষয়ে খোঁজ করার চেষ্টা করেন তারা। তবে তারা কিছুই করতে পারবেন না বলে জানান। এমপি আবুল হাসানাতের কাছে যাওয়ার পরামর্শ দেন এসব নেতা। তাদের পরামর্শে শাশুড়ি ও ভাসুরকে নিয়ে এমপির বরিশাল বাসায় যান টিপুর স্ত্রী। কিন্তু দারোয়ান তাদের ভেতরে ঢুকতে দেননি। অনেকক্ষণ ধরে তার সঙ্গে দেখা করার চেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে বাড়িতে ফেরত আসেন তারা।

টিপুর স্ত্রী বলেন, ২০ ফেব্রুয়ারি সারাদিন আমার স্বামীর কোনো খোঁজ পাইনি। ২১ ফেব্রুয়ারি সকালে বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলে দেখতে পাই আগৈলঝাড়া ছাত্রদলের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক টিপু হাওলাদার ও জাসাসের নেতা কবির বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছেন। এ খবর পেয়ে আমি ভেঙে পড়ি। আমার আত্মীয়স্বজন আগৈলঝাড়া থানায় খোঁজ নিতে গেলে ঢুকতে দেননি তৎকালীন ওসি মনিরুল ইসলাম ও এসআই নজরুল ইসলাম। ওই দিন বিকেল ৩টা-৪টার দিকে ময়নাতদন্ত শেষে একজন আত্মীয়সহ আমার মেঝো ভাসুরের কাছে টিপুর লাশ হস্তান্তর করা হয়। একই সঙ্গে তাড়াতাড়ি দাফন করার নির্দেশ দেওয়া হয়। স্থানীয় আওয়ামী লীগের লোকজনসহ পুলিশ সদস্যরা আমাদের তাড়াতাড়ি দাফন করতে হুমকি দেন। এজন্য টিপুর লাশ দেখতে পাননি আমার এক ভাসুর ও ননদ। ওই দিন শনিবার ছিল। সেদিন সন্ধ্যায় তাকে দাফন করা হয়। 

তিনি বলেন, ঘটনার কিছুদিন পর লোকমুখে জানতে পারি, স্থানীয় এমপি আবুল হাসানাত, বরিশালের তৎকালীন পুলিশ সুপার এহসান উল্লাহর নির্দেশে উজিরপুর থানার এএসআই মো. মাহাবুল ইসলাম ও এএসআই জসিম উদ্দিন এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছেন। আমি তাদের মৃত্যুদণ্ড প্রার্থনা করছি। 

ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানি করেন প্রসিকিউটর ফারুক আহাম্মদ। সঙ্গে ছিলেন প্রসিকিউটর সুলতান মাহমুদ ও মঈনুল করিম।

এ মামলায় চার আসামির মধ্যে গ্রেপ্তার রয়েছেন দুজন। তারা হলেন- উজিরপুর থানার সাবেক এএসআই মো. মাহাবুল ইসলাম ও এএসআই জসিম উদ্দিন। আবুল হাসানাত ও এহসান পলাতক আছেন।

এমআরআর/বিআরইউ