রাজধানীর উত্তরায় বাস র্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) প্রকল্পের প্রায় ৫০ টন ওজনের কংক্রিটের গার্ডার চাপায় একই পরিবারের পাঁচ সদস্যের মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনায় দায়ের করা মামলার তদন্ত শেষ হয়েছে। চার বছর পর আদালতে জমা পড়া তদন্ত প্রতিবেদনে (চার্জশিট) উঠে এসেছে দুই চীনা নাগরিকসহ কাদের চরম দায়িত্বহীনতা ও অবহেলায় সেদিন পাঁচ প্রাণ ঝরেছিল।
চার্জশিটে চীনা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চায়না গ্যাঝুবা গ্রুপ করপোরেশনের (সিজিজিসি) দুই কর্মকর্তাসহ ১২ জনকে অভিযুক্ত করা হয়। এর মধ্যে ১০ জন জামিনে থাকলেও মূল দুই কারিগর- চীনা নাগরিক সান লেই ও জিয়াং জিয়াও ঘটনার পর থেকেই পলাতক। তাদের গ্রেপ্তারে পরোয়ানা জারি করা হলেও আজ পর্যন্ত হদিস মেলেনি। তবে পলাতক থাকলেও আইনে তাদের অনুপস্থিতিতে মামলার বিচার সম্পন্ন করার বিধান রয়েছে।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা উত্তরা পশ্চিম থানার পরিদর্শক মুনিরুজ্জামান গত ৩০ এপ্রিল আদালতে এ চার্জশিট দাখিল করেন। তিনি বলেন, তদন্ত শেষে আদালতে চার্জশিট দিয়েছি। পলাতক থাকায় দুই চীনা নাগরিকের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির সুপারিশ করা হয়। আসলে তারা কোথায় রয়েছে বা তাদের অবস্থান কী এই বিষয়ে জানা নেই।
ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর ওমর ফারুক ফারুকী ঢাকা পোস্টকে বলেন, আসামি পলাতক থাকলেও তার অনুপস্থিতিতেই বিচার চলতে বাধা নেই। এক্ষেত্রে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির পর নির্দিষ্ট সময়ে আসামি হাজির না হলে, ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৩৯বি ধারা অনুযায়ী দুটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দিয়ে আদালত বিচার শুরুর আদেশ দেন। তবে অপরাধের সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন থাকলে আসামির অনুপস্থিতিতে ন্যায়বিচারের স্বার্থে রাষ্ট্রীয় খরচে আইনজীবী (স্টেট ডিফেন্স) নিয়োগ দেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। দীর্ঘ তদন্ত শেষে আদালতে চার্জশিট দাখিল হয়েছে। আশা করি দ্রুত সময়ের মধ্যে এ মামলায় অভিযোগ গঠন ও পরবর্তী বিচার শেষ করা সম্ভব হবে।
দুই চাইনিজ ছাড়া চার্জশিটভুক্ত অপর আসামিরা হলেন- ক্রেন চালক আলামিন হোসেন ওরফে হৃদয়, তার সহকারী রাকিব হোসেন, সিগন্যাল ম্যান মো. রুবেল ও আফরোজ মিয়া, সেফটি ইঞ্জিনিয়ার মো. জুলফিকার আলী , আইএফএসসিওএন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ইফতেখায়ের ও আজহারুল ইসলাম মিঠু (তারা কাজের অনুপযোগী ক্রেন সরবরাহ করেছিলেন), তোফাজ্জল হোসেন, বিলট্রেড গ্রুপের প্রশাসনিক কর্মকর্তা রুহুল আমিন মৃধা ও মনজুরুল ইসলাম।
অনুমোদন ছাড়া বন্ধের দিনে কাজ, ফিটনেসবিহীন ক্রেন ও চরম অবহেলায় ঝরে পাঁচ প্রাণ
তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, ঘটনার দিন ২০২২ সালের ১৫ আগস্ট তৎকালীন জাতীয় শোক দিবসের সরকারি ছুটির দিনে বিআরটি প্রকল্পের কোনো কাজ হওয়ার কথা ছিল না। নিয়ম অনুযায়ী সরকারি প্রতিনিধি বা পরামর্শক প্রতিষ্ঠান স্মেক ইন্টারন্যাশনালের অনুমোদন ছাড়া ছুটির দিনে কাজ করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। কিন্তু আন্তর্জাতিক চুক্তিকে তোয়াক্কা না করে সিজিজিসির প্রতিনিধি সান লেই এবং জিয়াং জিয়াও নিজেদের সিদ্ধান্তে কাজ চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেন। পরামর্শক ও সরকারি তদারককারীদের চোখ ফাঁকি দিয়ে এই দুই চীনা কর্মকর্তা মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করে মামলার তদন্তে প্রাপ্ত আসামি আলামিন, রাকিব, রুবেল, আফরোজ, জুলফিকার, তোফাজ্জলসহ অন্যান্য শ্রমিক ও নির্মাণ কাজে জড়িত সদস্যদের উত্তরা পশ্চিম থানার ৩ নং সেক্টরস্থ প্যারাডাইস টাওয়ারের সামনে আসতে বলেন। ছুটির দিন হলেও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের ফোন পেয়ে আসামিরা সেখানে এসে চায়নীজ নাগরিকদের নির্দেশ মোতাবেক কাজ শুরু করে। তারা ওই দিন ফ্লাইওভারের গার্ডার লরিতে উত্তোলন করে অন্যত্র সরানোর সিদ্ধান্ত নেয়। ইফতেখায়ের এবং আজহারুল তাদের প্রতিষ্ঠান আইএফএসসিওএন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মাধ্যমে ওই নির্মাণ কাজে হাইড্রলিক ক্রলার ক্রেন সরবরাহ করেছিলেন যা কাজের অনুপযোগী ছিল বলে প্রতীয়মান হয়েছে। রুহুল আমিন এবং মনজুরুল ইসলাম ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন কর্মকর্তা ও কর্মচারীসহ শ্রমিকদের নিয়োগ দাতা। তারা বিভিন্ন সময় নির্মাণ কাজে নিয়োজিত অদক্ষ শ্রমিকদের নিয়োগ দিয়েছিলেন। ঘটনার দিন চায়নীজ আসামিরা ফ্লাইওভারে ব্যবহৃত বিভিন্ন বক্স গার্ডার লরিতে লোড দিয়ে অন্যত্র সরানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে আলামিন, রাকিব, রুবেল, আফরোজ, জুলফিকার, তোফাজ্জলদের কাজ শুরু করার নির্দেশ দেয়। বিকেল ৪টার দিকে তারা কাজ শুরু করেন। সান লেই ও জিয়াং জিয়াও ক্রেনের সাহায্যে ফ্লাইওভারে বক্স গার্ডার গুলো রাস্তার এক পাশ থেকে নিয়ে অন্য পাশে এনে লরীতে তোলার জন্য ক্রেন অপারেটর আলামিনকে নির্দেশ দেন। আলামিন হোসেন নিজে ক্রেনটি পরিচালনা না করে তার হেলপার রাকিবকে দিয়ে পরিচালনা করাতে থাকে। রাকিবের পূর্বে ভারী ক্রেন পরিচালনার কোনো অভিজ্ঞতা ছিল না। যেখানে ক্রেনটি বসানো হয়েছিল সেখানকার মাটি ছিল নরম ও ভেজা। এছাড়া ৫০ টনের ভারী গার্ডার সরাতে রাস্তার উভয় পাশে নিরাপত্তামূলক ব্যারিকেড দেওয়া বাধ্যতামূলক হলেও তা করা হয়নি। এসব অনিয়ম ও অবহেলার বলি হন টঙ্গীমুখী সড়কে চলমান একটি প্রাইভেটকারে থাকা একই পরিবারের সদস্যরা। বিকেল ৪টার দিকে ভারসাম্য হারিয়ে ক্রেনটি একদিকে হেলে পড়লে বিশাল গার্ডারটি আছড়ে পড়ে গাড়িটির ওপর। দুর্ঘটনার পর নবদম্পতি হৃদয় ও রিয়া মনিকে স্থানীয়রা উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠাতে পারলেও, গাড়ির ভেতরে আটকে থাকেন অন্য পাঁচজন। ঘটনার পর চালক, হেলপার ও দুই চীনা কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্ট সবাই স্থান ত্যাগ করে পালিয়ে যান। পরে ফায়ার সার্ভিস ও অন্যান্য সংস্থার সহায়তায় দীর্ঘ ৩ ঘণ্টা ১০ মিনিট পর সন্ধ্যা ৭টা ২০ মিনিটে গার্ডার সরিয়ে উদ্ধার করা হয় পাঁচজনের ক্ষতবিক্ষত মরদেহ। নিহতরা হলেন : হৃদয়ের বাবা আইয়ুব আলী হোসেন রুবেল, রিয়ার মা ফাহিমা আক্তার, খালা ঝর্না আক্তার এবং ঝর্নার দুই শিশুপুত্র জান্নাতুল ও জাকারিয়া।
ঘটনার পরদিন রিয়ার মামা আফরান মন্ডল বাবু ‘অবহেলাজনিত মৃত্যুর’ অভিযোগ এনে ঠিকাদার কোম্পানি, ক্রেইন চালক এবং প্রকল্পের নিরাপত্তার দায়িত্বপ্রাপ্তদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন। ডিএমপির প্রসিকিউশন বিভাগের উপ-পরিদর্শক হেল্লাল উদ্দিন জানান, পলাতক দুই চীনা নাগরিকের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে। মামলার প্রতিবেদন গ্রহণ করে ঢাকার অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জাকির হোসাইনের আদালত এ আদেশ দেন। অপর ১০ আসামি জামিনে রয়েছেন। পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তার সংক্রান্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য আগামী ২২ সেপ্টেম্বর দিন ধার্য রয়েছে।
এদিকে পুলিশের দেওয়া চার্জশিটে পুরোপুরি সন্তুষ্ট নন জানিয়ে আফরান মন্ডল বলেন, ‘কোম্পানির নামে মামলা করেছিলাম। আর চার্জশিট দিছে ব্যক্তির বিরুদ্ধে। কোম্পানি কেন কর্মচারীর দায়ভার নেবে না। পুরো কোম্পানিকে আইনের আওতায় আনার দাবি জানাচ্ছি। পরিবারের পাঁচ সদস্য হারিয়েছি, ন্যায়বিচার চাই।’
এনআর/আরএফ
