জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় রাজধানীর বনশ্রী থেকে আফতাবনগরে বাঁশের সাঁকো পার হয়ে নিরাপদ স্থানে যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন আন্দোলনকারীরা। কিন্তু তাদের পারাপার ঠেকাতে পুলিশ ওই সাঁকোতে আগুন লাগিয়ে দেয় বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করেছেন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়ক মো. শাবাব হোসেন মেহের।
রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর সদস্য বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরীর একক বেঞ্চে তার জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়।
মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় ও সাবেক আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলকের বিরুদ্ধে নবম সাক্ষী হিসেবে সাক্ষ্য দেন মেহের। ২৩ বছর বয়সী মেহের আইন বিষয়ে স্নাতক পাশ করেছেন। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়ক তিনি।
জবানবন্দির একপর্যায়ে মেহের বলেন, ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই সকাল ১০টা থেকে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ফটকের সামনে আমরা অবস্থান কর্মসূচি পালন করি। কিন্তু বারংবার বাধা দিতে থাকে পুলিশ। ১৮ জুলাই আমরা পুনরায় একই কর্মসূচি পালন করতে থাকি। ওই দিন আমাদের ওপর হামলা চালান পুলিশ, র্যাব ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। তারা লাঠিচার্জ, টিয়ারশেল নিক্ষেপ, শটগান থেকে গুলি করতে থাকেন। শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসের ভেতরে গিয়ে আশ্রয় নিলেও রেহাই মেলেনি। গেটের ভেতরে শটগান ঢুকিয়ে গুলি করে পুলিশ। এতে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০০-২৫০ জন ও অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০০ জনের বেশি শিক্ষার্থী আহন হন। প্রাণও হারিয়েছেন অনেকে। ওই দিন ইম্পেরিয়াল কলেজের ছাত্র জিল্লুর শেখ পুলিশের গুলিতে শহীদ হন।
তিনি বলেন, সাড়ে ১২টার দিকে জিল্লুর লাশ আন্দোলনকারীরা ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে নিয়ে আসেন। আমিও ছিলাম। আহতদের বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল সেন্টার থেকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়। গুরুতরদের আশপাশের হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল। একই দিন রাত থেকে ইন্টারনেট কাজ করছিল না। কেননা সরকার ইন্টারনেট বন্ধ করে দিয়েছে। কারণ আমরা যেন আন্দোলনের পরিকল্পনা না করতে পারি। সিম ব্যবহার করতে যেন বাধ্য হই। ১৯ জুলাই ছিল শুক্রবার। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক কোনো পরিকল্পনা ছিল না। সরকার আগেই সব বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করে দিয়েছিল। জুমার নামাজ পড়তে আমি আফতাবনগর এ ব্লক মসজিদে যাই।
আমি ইস্ট-ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির পাশে একটি গলির মুখে দাঁড়িয়ে দেখি, পুলিশ, র্যাব, বিজিবি ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা রামপুরা সেতুর ওপর থেকে সাধারণ জনগণ ও আন্দোলনকারীদের লক্ষ্য করে গুলি করছেন। তখন আমি চার-পাঁচজনকে গুলি খেয়ে পড়ে যেতে দেখি। তাদের রিকশায় করে আফতাবনগরের ভেতরে নাগরিক হাসপাতালের দিকে নিয়ে যাওয়া হয়। পুলিশ আমাদের দিকেও গুলি করতে থাকায় বেশি সময় দাঁড়িয়ে থাকা নিজের জন্য নিরাপদ মনে করিনি। কারণ যেদিকে মানুষ দেখছিল, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সেদিকেই গুলি করছিল। আমি সেখান থেকে বাসায় চলে এসে ছাদে যাই। ছাদে গিয়ে দেখতে পাই হেলিকপ্টার থেকে টিয়ারশেল, গুলি ও সাউন্ড গ্রেনেড আন্দোলনকারীদের ওপর নিক্ষেপ করা হচ্ছিল। ছাদে থাকাও আমি নিরাপদ মনে না করায় নিচে নেমে আসি।
মেহের বলেন, বিকেলে বাসা থেকে বের হয়ে আমি আফতাবনগর ও বনশ্রীর মাঝামাঝি আইডিয়াল স্কুল সংলগ্ন বাঁশের সাঁকোর আফতাবনগর প্রান্তে গিয়ে দাঁড়াই। সেখানে দাঁড়িয়ে দেখতে পাই বনশ্রীতে বিজিবি ও পুলিশ আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি করছে। ওই সময় বেশকিছু মানুষ সাঁকো পার হয়ে বনশ্রী থেকে আফতাবনগর চলে আসেন। পুলিশ তখন আফতাবনগরের দিকেও শটগান দিয়ে গুলি ছুড়তে থাকে। আমার পাশে দাঁড়ানো একজন রিকশাওয়ালা তখন গুলিবিদ্ধ হন। এছাড়া পুলিশ ওই বাঁশের সাঁকোতে আগুন লাগিয়ে দেয় যেন আন্দোলনকারীরা পার না হতে পারেন। গুলিবিদ্ধ রিকশাওয়ালাকে নিজের রিকশায় করে আমি ও অন্য দুজন আন্দোলনকারী নাগরিক হাসপাতালে নিয়ে যাই। নাগারিক হাসপাতালে তাকে চিকিৎসা দেওয়া হয়। তার শরীর থেকে কিছু পিলেট বের করা হয়। কিছু পিলেট বের করতে চিকিৎসকরা অক্ষম হন। আমরা যাওয়ার আগেই আরও সাত-আট জন ব্যক্তি গুলিবিদ্ধ অবস্থায় ছিলেন।
এই প্রত্যক্ষদর্শী জানান, নাগরিক হাসপাতালের একজন কর্মচারী জানিয়েছেন যে, ১৯ জুলাই অসংখ্য গুলিবিদ্ধ ব্যক্তি হাসপাতালে এসেছিল। যাদের কয়েকজন মারা গেছেন। ৫ আগস্ট পর্যন্ত এই আন্দোলন চলমান থাকে। তিনিও আন্দোলনের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত ছিলেন। পুলিশ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের হামলায় এবং গুলিতে সারাদেশে বহু মানুষ নিহত ও আহত হন।
তিনি বলেন, আন্দোলন দমনের উদ্দেশে ইন্টারনেট বন্ধ করে এই গণহত্যা চালানোর জন্য দায়ী তৎকালীন সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তার মন্ত্রিপরিষদের সদস্য ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। বিশেষ করে ইন্টারনেট বন্ধ করে এই গণহত্যা চালানোর জন্য আরও দায়ী তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর আইসিটি উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়, আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক ও সালমান এফ রহমান। আমি এ হত্যাকাণ্ড ও নির্যাতনের জন্য দায়ীদের সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করি।
ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানি করেন প্রসিকিউটর আবদুস সাত্তার পালোয়ান। সঙ্গে ছিলেন প্রসিকিউটর জহিরুল আমিন, মামুনুর রশিদসহ অন্যান্য প্রসিকিউটর।
এমআরআর/এমএসএ
