মানুষের ত্রিশের দশকটিকে বিকাশের দশক হিসাবে দেখা হয়। কর্মজীবনের উন্নতি, পারিবারিক দায়িত্ব, আর্থিক লক্ষ্য এবং ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষা- সবকিছুই যেন একসঙ্গে ত্বরান্বিত হয়। এইসব স্বপ্নের নিরলস সাধনার মাঝে অনেকেই অজান্তে একটি সম্পদকে অবহেলা করেন, তা হলো স্বাস্থ্য।
সত্যিটা হলো, অনেক দীর্ঘস্থায়ী রোগ আমাদের ত্রিশের দশকে নীরবে শুরু হয়। এই দশকটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ, আগামী দশকগুলোতে আমরা কীভাবে কাজ করবো, কেমন অনুভব করবো তার অনেককিছুরই সূচনা হয় এখান থেকে। আমাদের মধ্যে বেশিরভাগই ত্রিশ বছরের পর নিজের স্বাস্থ্য নিয়ে কিছু ভুল করে থাকেন। কী সেই ভুলগুলো? চলুন জেনে নেওয়া যাক-
ঘুমকে বিলাসিতা হিসেবে গণ্য করা
অনেকে ঘুমের অভাবকে সম্মানের প্রতীক হিসেবে গ্রহণ করেন। তাদের কাছে গভীর রাতে কাজের ফোন, একটানা টিভি দেখা এবং অবিরাম স্ক্রোলিং বিশ্রামের চেয়ে বেশি প্রাধান্য পায়। এভাবে ঘুমকে বিসর্জন দিতে থাকলে ভবিষ্যতে তা গুরুতর স্বাস্থ্য সমস্যার কারণ হতে পারে। অপর্যাপ্ত ঘুম নীরবে বিপাকক্রিয়া, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা, হরমোনের ভারসাম্য, স্মৃতিশক্তি এবং মানসিক সুস্থতাকে নষ্ট করে দেয়।
‘আমি ভালো আছি’ মানেই ‘আমি সুস্থ’- এই ধারণা করা
আমাদের মধ্যে থাকা সবচেয়ে বিপজ্জনক ভুল ধারণাগুলোর মধ্যে একটি হলো, কোনো উপসর্গ না থাকাকেই প্রকৃত সুস্থতা মনে করা। দুঃখজনকভাবে, ‘আমি বেশ ভালো আছি’- এটি রোগ নির্ণয়ের জন্য একটি দুর্বল উপায়। ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স, ফ্যাটি লিভার ডিজিজ, উচ্চ কোলেস্টেরল এবং উচ্চ রক্তচাপের মতো রোগগুলো কোনো সতর্ক সংকেত ছাড়াই বছরের পর বছর ধরে নীরবে শরীরে বাসা বাঁধতে পারে। সুস্থ বোধ করাটা চমৎকার, কিন্তু স্বাস্থ্য পরীক্ষার মাধ্যমে স্বাস্থ্যের অবস্থা পরিমাপ করাও সমানভাবে জরুরি।
শুধুমাত্র সপ্তাহান্তে ব্যায়াম করা
অনেক পেশাজীবী তাদের অলস জীবনযাত্রার ক্ষতিপূরণের জন্য সপ্তাহান্তে কঠোর ব্যায়াম করার চেষ্টা করেন। একে ‘উইকেন্ড-ওয়ারিয়র’ সিনড্রোম বলা হয়। বিএমসি পাবলিক হেলথ-এ প্রকাশিত ২০২৫ সালের একটি প্রতিবেদন অনুসারে, যদিও যেকোনো ধরনের ব্যায়ামই উপকারী, তবে শরীর নিয়মিত ও ধারাবাহিক নড়াচড়ার মাধ্যমেই সবচেয়ে ভালোভাবে কাজ করে। দিনে আট থেকে দশ ঘণ্টা বসে থাকা হৃদপিণ্ড ও বিপাকীয় স্বাস্থ্যের এমনভাবে অবনতি ঘটায়, যা সপ্তাহান্তে জিমে দুই ঘণ্টার ব্যায়াম দিয়ে কোনোভাবেই পূরণ করা যায় না। শরীরকে সতেজ ও প্রাণবন্ত রাখতে প্রতিদিন শরীরচর্চা প্রয়োজন।
দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপকে স্বাভাবিক বলে ধরে নেওয়া
ত্রিশের দশকে বেশিরভাগ মানুষকেই অনেক চাপ সামলাতে হয়। যেখানে বয়স্ক বাবা-মা, ছোট সন্তান এবং কর্মজীবনের চরম চাপের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করতে হয়। এই সময়ে এক ধরনের উদ্বেগ ও দুশ্চিন্তা অবিরাম বিরাজ করে। মানসিক চাপকে স্বাভাবিক মনে হতে পারে, কিন্তু এটি কখনোই স্বাভাবিক অবস্থা হয়ে ওঠা উচিত নয়। কর্টিসলের মতো স্ট্রেস হরমোন ক্রমাগত উচ্চ মাত্রায় থাকলে তা শরীরের অভ্যন্তরীণ প্রদাহ, ঘুমের অভাব, ওজন বৃদ্ধি এবং জৈবিক বার্ধক্য ত্বরান্বিত করার অনুঘটক হিসেবে কাজ করে।
স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি তৈরি হওয়ার আগে ব্যবস্থা না নেওয়া
আমরা প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার চেয়ে প্রতিক্রিয়াশীল হতে বেশি অভ্যস্ত। আমরা বছরে একবার আমাদের গাড়ির সার্ভিসিং করাই এবং বাড়িঘরের যত্ন নিই, অথচ আমাদের শরীরের প্রতি মনোযোগ দেওয়ার আগে আক্ষরিক অর্থেই হার্ট অ্যাটাক বা ডায়াবেটিস ধরা পড়ার জন্য অপেক্ষা করি। আমাদের দেশের বেশিরভাগ মানুষের মধ্যেই প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবা দুঃখজনকভাবে অবহেলিত। নিয়মিত চেকআপ আপনাকে সূক্ষ্ম শারীরিক পরিবর্তনগুলো ধরতে সাহায্য করবে।
এইচএন
