বিজ্ঞাপন

প্রতিদিনের ছোট ছোট ভুল অভ্যাস ডেকে আনছে ডায়াবেটিস, হৃদরোগ ও স্ট্রোক
সেমিনারে অধ্যাপক ড. মজিবুল হক

প্রতিদিনের ছোট ছোট ভুল অভ্যাস ডেকে আনছে ডায়াবেটিস, হৃদরোগ ও স্ট্রোক

সঠিক খাদ্যাভ্যাস, স্বাস্থ্যকর জীবনধারা এবং বৈজ্ঞানিক উপায়ে স্বাস্থ্য চর্চা বিষয়ে রংপুরে অনুষ্ঠিত হয়েছে একটি সচেতনতামূলক সেমিনার। অনুষ্ঠানের আয়োজন করে আমেরিকান ওয়েলনেস সেন্টার। গত শুক্রবার রংপুর শিল্পকলা একাডেমিতে এ সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়।

সেমিনারে প্রধান বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশি-আমেরিকান চিকিৎসা গবেষক, যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি (WUST)-এর ইন্টিগ্রেটিভ মেডিসিনের অধ্যাপক ড. মজিবুল হক।

সেমিনারে তিনি বলেন, বর্তমান বিশ্বে হৃদরোগ, স্ট্রোক, ডায়াবেটিস, কিডনি রোগ এবং অন্যান্য দীর্ঘমেয়াদি অসংক্রামক রোগ উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা গেছে, অতিমাত্রায় প্রক্রিয়াজাত খাদ্য ক্যান্সার, হৃদরোগ, মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা এবং আরও বহু জটিল রোগের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দেয়। সুস্থ থাকার জন্য চিকিৎসার পাশাপাশি দৈনন্দিন খাদ্যাভ্যাস ও জীবনধারার পরিবর্তন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

তিনি বলেন, প্রতিদিনের কিছু ভুল অভ্যাস যেমন দেরিতে ঘুম থেকে ওঠা, অতিরিক্ত শর্করাযুক্ত সকালের নাশতা, সারাদিন বারবার খাওয়া, ফাস্টফুড গ্রহণ, পর্যাপ্ত পানি পান না করা, রাত জেগে থাকা এবং দীর্ঘদিন মানসিক চাপে থাকা ধীরে ধীরে শরীরের বিপাকীয় ভারসাম্য নষ্ট করে এবং দীর্ঘমেয়াদি রোগের ঝুঁকি বাড়ায়।

এ সময় খাদ্যাভ্যাস সম্পর্কে প্রচলিত কিছু ভুল ধারণার ব্যাখ্যা দেন তিনি। তার মতে, সব ধরনের চর্বি ক্ষতিকর নয়; বরং মাছ, বাদাম, অলিভ অয়েলসহ স্বাস্থ্যকর চর্বি শরীরের জন্য উপকারী। তিনি বলেন, সারাদিন অল্প অল্প করে বারবার খাওয়ার পরিবর্তে ব্যক্তির শারীরিক অবস্থা অনুযায়ী পরিকল্পিত খাদ্যাভ্যাস অনুসরণ করা উচিত। একই সঙ্গে তিনি অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, ট্রান্স ফ্যাট, ডুবো তেলে ভাজা খাবার, ফাস্টফুড এবং শিল্পোৎপাদিত পরিশোধিত তেল পরিহারের পরামর্শ দেন।

তিনি বলেন, প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় মৌসুমি ফল, শাকসবজি, স্বাস্থ্যকর চর্বি, মানসম্মত প্রোটিন এবং পরিমিত স্বাস্থ্যকর শর্করা অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। এগুলো শরীরের প্রদাহ কমাতে, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে এবং দীর্ঘমেয়াদে সুস্বাস্থ্য বজায় রাখতে সহায়ক।

ডায়াবেটিস প্রসঙ্গে প্রফেসর ড. মজিবুল হক বলেন, টাইপ-২ ডায়াবেটিস মূলত একটি মেটাবলিক ডিসঅর্ডার, যার অন্যতম কারণ ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স। তাই শুধু রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণ করাই যথেষ্ট নয়; বরং খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন, নিয়মিত ব্যায়াম, ওজন নিয়ন্ত্রণ, অন্ত্রের স্বাস্থ্য উন্নয়ন এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী জীবনধারার পরিবর্তনের মাধ্যমে ডায়াবেটিস কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

হৃদরোগ সম্পর্কে তিনি বলেন, দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ, ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স, মানসিক চাপ এবং অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপন রক্তনালির স্বাভাবিক কার্যকারিতা ব্যাহত করে হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায়। কিডনির স্বাস্থ্য নিয়েও তিনি বলেন, কিডনির ক্ষতি অনেক সময় দীর্ঘদিন নীরবে অগ্রসর হয়। তাই নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, পর্যাপ্ত পানি পান, সুষম খাদ্য গ্রহণ এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী জীবনযাপন কিডনি সুস্থ রাখতে গুরুত্বপূর্ণ।

জীবনধারা পরিবর্তনের ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, পর্যাপ্ত ও নিয়মিত ঘুম, মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ, নিয়মিত ব্যায়াম, যোগব্যায়াম, শ্বাস-প্রশ্বাসের অনুশীলন, ধ্যান এবং প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী উপবাস (Fasting) স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তিনি রাত ১০টার মধ্যে ঘুমানোর চেষ্টা এবং ঘুমানোর অন্তত দুই ঘণ্টা আগে মোবাইল, টেলিভিশন ও অন্যান্য ইলেকট্রনিক স্ক্রিন ব্যবহার বন্ধ রাখার পরামর্শ দেন।

ড. মজিবুল হক বলেন, দীর্ঘমেয়াদি সুস্থতার পাঁচটি প্রধান ভিত্তি হলো—সঠিক খাদ্যাভ্যাস, স্বাস্থ্যকর জীবনধারা, প্রাকৃতিক ও প্রমাণভিত্তিক চিকিৎসা, রিজেনারেটিভ থেরাপি এবং মানসিক প্রশান্তি। তিনি সবাইকে সচেতন জীবনযাপন এবং রোগ হওয়ার আগেই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানান।

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মোস্তাকার রহমান, ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার, বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ কর্পোরেশন (BCIC) এবং ডা. কাওছার আহমেদ, এমবিবিএস, এমফিল (সিসিইউ), সিসিডি, সিনিয়র মেডিকেল অফিসার, হাইপারটেনশন অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টার, রংপুর। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন মাহাবুবুর রহমান, চেয়ারম্যান, আমেরিকান ওয়েলনেস সেন্টার।

বিআরইউ