প্রায় সবারই হেঁচকি ওঠে। খুব দ্রুত খাওয়ার পর, কোনো কোমল পানীয় পান করার পর, বা এমনকী ভুল সময়ে হাসলেও এটি হতে পারে। সাধারণত হেঁচকি কয়েক মিনিটের মধ্যেই চলে যায় এবং এটি ক্ষতিকর নয়। কিন্তু আপনি কি কখনো ভেবে দেখেছেন যে এই হঠাৎ হিক শব্দটির কারণ আসলে কী?
ডায়াফ্রামের (গম্বুজাকৃতির পেশী যা আমাদের শ্বাস নিতে সাহায্য করে) একটি অনৈচ্ছিক সংকোচনের কারণে হেঁচকি হয়। যখন ডায়াফ্রাম হঠাৎ সংকুচিত হয়, তখন বাতাস দ্রুত ফুসফুসে প্রবেশ করে। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই স্বররজ্জুর মাঝের ফাঁক, যাকে গ্লটিস বলা হয়, তা বন্ধ হয়ে যায় এবং পরিচিত হিক শব্দটি তৈরি করে।
হেঁচকির সময় শরীরে কী ঘটে?
বায়োএসেইস জার্নালে প্রকাশিত একটি পর্যালোচনায় ব্যাখ্যা করা হয়েছে যে, স্বাভাবিক শ্বাস-প্রশ্বাসের সময় ডায়াফ্রাম একটি নিয়ন্ত্রিত উপায়ে সংকুচিত ও প্রসারিত হয়। কিন্তু হেঁচকির সময়, ডায়াফ্রাম হঠাৎ এবং অনৈচ্ছিকভাবে সংকুচিত হয়। এর পরেই গ্লটিস দ্রুত বন্ধ হয়ে যায়। প্রক্রিয়াটিকে সহজভাবে এভাবে বর্ণনা করা যায়- ডায়াফ্রাম হঠাৎ সংকুচিত হয়ে ফুসফুসে বাতাস প্রবেশ করে গ্লটিস বন্ধ হয়ে যায়, ফলে হেঁচকির শব্দ হয়। হেঁচকির প্রতিবর্ত ক্রিয়ায় শ্বাস-প্রশ্বাস নিয়ন্ত্রণকারী মস্তিষ্কের বেশ কয়েকটি স্নায়ু এবং এলাকা জড়িত থাকে। ফ্রেনিক স্নায়ু, যা ডায়াফ্রামকে নিয়ন্ত্রণ করে এবং ভেগাস স্নায়ু এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত পথগুলোর মধ্যে অন্যতম।
হেঁচকি ওঠে কেন?
বেশিরভাগ সময় এর কোনো একটি সুস্পষ্ট কারণ থাকে না। যখন কোনো কিছু এই প্রতিবর্ত ক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত স্নায়ুগুলোকে সাময়িকভাবে উত্তেজিত বা উদ্দীপিত করে তখন হেঁচকি উঠতে পারে। সাধারণ কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে- খুব দ্রুত খাওয়া, বেশি পরিমাণে খাওয়া, কার্বনেটেড পানীয় পান করা, মদ পান করা, পেটের তাপমাত্রার হঠাৎ পরিবর্তন, বাতাস গিলে ফেলা, হাসা বা উত্তেজিত হওয়া, মানসিক চাপ, তাপমাত্রার হঠাৎ পরিবর্তন। বেশি পরিমাণে খাওয়ার পর পেট ফুলে গেলে তা ডায়াফ্রাম বা কাছাকাছি স্নায়ুগুলোকে উত্তেজিত করতে পারে, যার ফলে হেঁচকি ওঠার সম্ভাবনা বেড়ে যায়।
খাওয়ার পর হেঁচকি ওঠে কেন?
ব্রিটিশ জার্নাল অফ জেনারেল প্র্যাকটিস অনুসারে, দ্রুত খাওয়া বা খুব বেশি খাওয়ার ফলে পাকস্থলী প্রসারিত হতে পারে। কোমল পানীয় গ্যাস তৈরি করতে পারে এবং পাকস্থলীর প্রসারণ আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে। খাওয়া বা পান করার সময় বাতাস গিলে ফেলাও এর কারণ হতে পারে। এটি হেঁচকি প্রতিবর্ত ক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত স্নায়ুগুলোকে উদ্দীপিত করতে পারে, যার ফলে ডায়াফ্রামের বারবার সংকোচন ঘটে। এই কারণেই ধীরে ধীরে খাওয়া, খুব বেশি পরিমাণে খাবার এড়িয়ে চলা এবং কোমল পানীয় সীমিত পরিমাণে পান করা কিছু ক্ষেত্রে হেঁচকি কমাতে সাহায্য করতে পারে।
মানসিক চাপ কি হেঁচকির কারণ হতে পারে?
হ্যাঁ, মানসিক পরিবর্তন কখনও কখনও হেঁচকির কারণ হতে পারে। উত্তেজনা, স্নায়বিকতা, হঠাৎ হাসি বা মানসিক চাপ শ্বাস-প্রশ্বাসের ধরণকে প্রভাবিত করতে পারে এবং হেঁচকি প্রতিবর্ত ক্রিয়াকে উদ্দীপিত করতে পারে। তবে মানসিক চাপের পরিস্থিতিতে হেঁচকি ওঠার অর্থ এই নয় যে এর অন্তর্নিহিত শারীরিক কারণ মানসিক চাপ। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বেশ কয়েকটি কারণ একসঙ্গে ঘটতে পারে।
কিছু মানুষের কেন বেশি হেঁচকি ওঠে?
কিছু মানুষের জন্মগতভাবেই হেঁচকি ওঠার প্রবণতা বেশি থাকতে পারে। খাদ্যাভ্যাস, পান করার ধরণ এবং এই প্রতিবর্ত ক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত স্নায়ুগুলোর ব্যক্তিগত সংবেদনশীলতা- এগুলো সবই এক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে। ঘন ঘন হেঁচকি ওঠা মাঝে মাঝে কোনো অন্তর্নিহিত শারীরিক অসুস্থতা বা ওষুধের সাথেও সম্পর্কিত হতে পারে, বিশেষ করে যখন এটি কোনো সুস্পষ্ট কারণ ছাড়াই শুরু হয় বা দীর্ঘ সময় ধরে চলতে থাকে।
সাধারণত হেঁচকি কতক্ষণ স্থায়ী হয়?
বেশিরভাগ সাধারণ হেঁচকি অল্প সময়ের জন্য স্থায়ী হয় এবং কয়েক মিনিটের মধ্যেই নিজে থেকে থেমে যায়। তবে মাঝে মাঝে হেঁচকি আরও অনেকক্ষণ ধরে চলতে পারে। ডাক্তাররা সাধারণত ৪৮ ঘণ্টার বেশি সময় ধরে চলা হেঁচকিকে দীর্ঘস্থায়ী হেঁচকি হিসেবে শ্রেণীবদ্ধ করেন। যেগুলো এক মাসের বেশি সময় ধরে চলে, সেগুলোকে অনিয়ন্ত্রিত হেঁচকি বলা হয়। দীর্ঘস্থায়ী হেঁচকি খুব একটা দেখা যায় না এবং এটি খাওয়া, পান করা, ঘুমানো এবং কথা বলার ক্ষেত্রে সমস্যা তৈরি করতে পারে।
কখন দীর্ঘস্থায়ী হেঁচকি সতর্ক সংকেত হতে পারে?
৪৮ ঘণ্টার বেশি সময় ধরে হেঁচকি চলতে থাকলে ডাক্তারের সঙ্গে আলোচনা করা উচিত, বিশেষ করে যদি এর কোনো সুস্পষ্ট কারণ না থাকে। ক্রমাগত হেঁচকি কখনও কখনও মস্তিষ্ক, স্নায়ু, বুক বা পরিপাকতন্ত্রের অবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। কিছু নির্দিষ্ট ওষুধ এবং বিপাকীয় সমস্যাও দীর্ঘস্থায়ী হেঁচকির কারণ হতে পারে।
যদি দীর্ঘস্থায়ী হেঁচকির সঙ্গে বুকে তীব্র ব্যথা, শ্বাসকষ্ট, দুর্বলতা, বিভ্রান্তি, পেটে তীব্র ব্যথা বা স্বাস্থ্যের অন্যান্য উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের মতো উপসর্গ দেখা দেয়, তবে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
এইচএন
