বিজ্ঞাপন

ইলিশের পাঙাশ হয়ে ওঠার ‘গালগপ্প’

ইলিশের পাঙাশ হয়ে ওঠার ‘গালগপ্প’

দ্য ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্য সি। মার্কিন সাহিত্যিক ও সাংবাদিক আর্নেস্ট হেমিংওয়ে ছোট, কিন্তু কালজয়ী উপন্যাস। ১৯৫২ সালে লিখেছিলেন। এক বৃদ্ধ জেলে সান্তিয়াগোর অদম্য জেদ ও সমুদ্রের সাথে লড়াইয়ের গল্প। বৃদ্ধ সান্তিয়াগো গভীর সাগরে শিকারে গিয়ে টানা ৮৪ দিন মাছ পাননি। ক্লান্ত সান্তিয়াগো এরপর বিশাল একটি মার্লিন মাছ ধরে ফেলেন। কিন্তু এরপরই ঘটে বিপত্তি। মার্লিন মাছ দেখতে পেয়ে আক্রমণ চালায় হাঙর। অবিরাম আক্রমণে মাছটি হারিয়ে যায়। তবে হার মানেননি সান্তিয়াগো। কালজয়ী ১৯৫৪ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেয়ে যান হেমিংওয়ে। যে উপন্যাসে রয়েছে এমন অ্যাডভেঞ্চার, সেই কাহিনি জেনে হলিউডে ১৯৫৮ সালে সিনেমাও নির্মিত হয়। এই উপন্যাস দাগ কেটে আছে মনে।

এবার ফিরি আমার কথায়। ১৯৮৪ সালে আমরা কলকাতা বেড়াতে যায়। জ্যোতির্ময় মৌলিক কাকা তার বাড়িতে নিমন্ত্রণ করেন। ফেব্রুয়ারি মাস, কলকাতায় সরস্বতী পূজা চলছে বেশ ধুমধাম করে। ঝাপসা মনে পড়ে সেদিনের কথা। মৌলিক কাকার বাড়িতে ইলিশ মাছ রান্না হচ্ছে। আমার মা রন্ধনশালায় গেলেন। কাকিমা ইলিশের আঁশ ভালো করে নিলেন ধুয়ে। পরিষ্কার কাপড়ে রেখে পুঁটলি করলেন। ব্যাস গরম ডালের মধ্যে ডোবালেন। কারণ জানতে চাইলে কাকিমা আমার মাকে বলেন, তাদের এখানে তো আর বাংলাদেশের ইলিশ সহজে মেলে না। তাই ডালে ইলিশের ফ্লেভার রাখতে এই কৌশল।

কাকিমার ইলিশকে নিয়ে সব দেখে-জেনে আমার মা হয়ে যান ভীষণ অবাক। দেশে ফিরে যখনই ইলিশ কাটতে বসতেন, সেই সময় কাকিমার ‘ইলিশে ডালের’ গল্প বলতেন।

মা নেওটা হওয়ায় আমার মস্তিষ্কে সেই গল্প গেঁথে আছে। ইলিশ কিনতে বা খেতে বসলে মা-কাকির কথা মনে পড়ে যায়।

ইলিশ আমাকে চিনিয়েছিলেনও আমার মা। খুব ছোটবেলায় বাজারে একেবারে ৮ বছর বয়স থেকে যেতে হয়েছে। দয়াগঞ্জ বাজার, বসুবাজার থেকে ১০ মিনিটের পথ। তখন অনেক দূর মনে হতো। আমার বাবা বাজার করতে খুব ভালোবাসতেন। বড় বড় মাছ কেনা ছিল তার শখ। মাছ শিকারেও যেতেন ছুটির দিনে। দয়াগঞ্জ বাজারের সেই বুড়ো দাড়িওয়ালা মাংস ব্যবসায়ী বাবাকে আমার দাদুর কথা বলে হাড় ভর্তি শক্ত মাংস গছিয়ে দিতেন। তাই দেখে খুব রেগে যেতেন মা। মায়ের ধারণা বাবা ইলিশ মাছ খুব ভালো যাচাই করতেন না, মাংসও নয়। আবার আমার বাদল মামার মাছ-মাংস যাচাই করার দক্ষতা ভালো ছিল। মামাও ভালো ইলিশ কিনতে পারতেন। বাবার চিনতে না পারার কারণে তাই কখনো কখনো বেশ রেগে যেতেন মা।

দয়াগঞ্জ বাজারে বছরজুড়ে প্রচুর মাছ মিলত। হরেক রকমের মাছ। সবই নদী-হাওরের। তখন মাছ চাষ খুব একটা হতো না। বুড়িগঙ্গা ছিল প্রমত্তা, বয়ে চলত স্বচ্ছ পানি। মাছও পাওয়া যেত অনেক রকমের। মেঘনা, ধলেশ্বরী, শীতলক্ষ্যা তো ছিল। যাত্রাবাড়ী, কেরানীগঞ্জেও খাল-বিলে ভরা। তাজা মাছের অভাব ছিল না। কেজি হিসাবে বিক্রির চলন নেই। আকার-আকৃতিতেই চলত দর-কষাকষির পালা। হিসাবে-ক্ষমতায় মিললেই থলি ভরে নিয়ে বাড়ি ফেরা।

পদ্মার ইলিশ তো দয়াগঞ্জ বাজারে পাওয়া যেত। বাঁশ-টিনের দয়াগঞ্জ বাজারে সকালের নরম রোদ মাছের ঝুড়ি ছোঁয়া দিতেই ইলিশগুলো ঝকঝক-চকচক করত। আমার কেন জানি মনে হয়, তখন দয়াগঞ্জে বাজারে আসা ইলিশের আকার বড় ছিল। ওজনে তুলনা করলে ৮০০ থেকে কমপক্ষে এক কেজি তো হবেই। কেজি দেড়-দুয়েকের ইলিশ আসত। বছরজুড়েই ইলিশের ছড়াছড়ি রেললাইনের পাশে দয়াগঞ্জের মাছের সেই বাজারে।

পৌষ-মাঘের শীতের সকালে বাবার বড় বড় বোয়াল, আইড় কিনে থলিভরে বাড়িফেরা আর দেখতে পাবো না কখনোই। আর বর্ষার পর আশ্বিন মাসে দয়াগঞ্জে থাকত ইলিশের ছড়াছড়ি। ৫-১০ টাকায় ইলিশ কেনা যেত। বরফের ব্যবহার বা ঘরে-বাড়িতে ফ্রিজ না থাকায় মাছ বিক্রির তাগিদটাও মাছওয়ালাদের বেশি থাকত। না হলে পচে যাওয়ার শঙ্কা।     

১৯৮৮ সালের বন্যার পর আশ্বিন মাস, মানে সেপ্টেম্বর মাসের কোনো একসময় টানা কয়েক দিন ধরে দয়াগঞ্জ বাজারের প্রচুর ইলিশ এলো। ইলিশময় পুরো মাছবাজার। সব বাড়ির রন্ধনশালা থেকে ইলিশ ভাজার ঘ্রাণ ছড়িয়ে যায় বসুবাজারজুড়ে। নরম ইলিশ ২-৩ টাকা, তাজা ইলিশ ৫-১০ টাকা। এর বেশি। ইলিশ কিনে নোনা দেবেন মা। লবণ মাখিয়ে রোদে দেবেন। এরপর কাচের বয়ামে ভরে রাখা হবে।

বাজারে ইলিশভর্তি—আমাদের গৃহকর্মী রহিমার মায়ের কাছ থেকে খবর শুনে থলি ধরিয়ে দিলেন মা। আঁচলে বেঁধে রাখা একটি নোট দিলেন আমার হাতে। সম্ভবত ৫০ টাকার ভাঁজ করা একটি নোট।

মা আমাকে বললেন, ‘ইলিশ মাছ হাতে নিয়ে আগে ধরবি। তোর বাবার মতো শুধু তাকিয়েই দাম করবি না। যেই মাছটির ঘাড় মোটা, কিছুটা কালচে, পেট রূপালি সেই ইলিশ নিবি। চোখ লালের ইলিশ নিবি না। সবার আগে পুরো বাজার ঘুরে দেখবি।’

এই হলো আমার ইলিশ কেনার প্রথম অভিযান। আমার মনে আছে সেবার ৫০ টাকায় গোটা পাঁচেক ইলিশ কিনে বাড়ি ফিরে আসি।

দুপুরে স্কুলে যাওয়ার আগে ইলিশই ছিল মায়ের ভরসা। সারা দিন সংসারের কাজ তার। দুপুর ১২টায় নারিন্দা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে ক্লাস শুরু আমার। সাড়ে ১১টার মধ্যে রওনা। তাই ঝটপট এক টুকরো ইলিশ ভেজে প্লেটে দিতেন। ধোঁয়া ওঠা গরম ভাতের সঙ্গে ডাল। পড়িমরি করে খেয়ে দৌড়। কখনো কখনো ইলিশ মাছ একনাগাড়ে খেতে খেতে মায়ের সঙ্গে ঘ্যান ঘ্যানও করতে হতো।

বাজারের সস্তার মাছ ছিল ইলিশ। আর তখন সবচেয়ে দামি মাছ ছিল পাঙাশ। বড় বড় পাঙাশও দয়াগঞ্জে পাওয়া যেত। তবে বেশ টাটকা। চিতল, আইড়ের মতো বড় আর দামি মাছ বাড়িতে এলেও, কেন জানি আমাদের বাড়ি পাঙাশের কদর ছিল না। বাবাও কিনতেন না।

৩০-৪০ বছর পর ইলিশ আর পাঙাশ বিপরীত স্রোতে গা ভাসিয়েছে। ইলিশ হয়ে গেছে দামে চড়া, আকারে বেশ ছোট। কোনটি পদ্মার, কোনটি মেঘনার, কোনটি বরিশাল বা চাঁদপুরের আর কোনটি বঙ্গোপসাগরের, সেসব নিয়ে ভাবনাচিন্তা নেই। ৩০০০-৪০০০ টাকা কেজির ইলিশ এখন ‘লাটসাহেবদের’ মাছ। আর পাঙাশ এখন গরিবের মাছ।

ক’দিন আগে ইলিশ কিনলাম। পয়লা বৈশাখের ভাবনায় নয়। এমনিতেই। সুপার শপে তেল কিনতে গিয়ে। ছোট-বড় কিনা জানি না। বরফের ওপর বেশ সাজিয়ে-গুছিয়ে রাখা। সারি সারি করে আদর-যত্নে। মূল্য তালিকায় লেখা ৩০০ থেকে ৩৩০ গ্রাম। দাম ২৬০ টাকা। মা চলে গেছেন ৩৪ বছর আগে। তবে তার সেই নির্দেশ মেনে কয়েকটি ইলিশ হাতে নিলাম। ঘোরালাম, এ-হাত ও-হাতে নিলাম। ইলিশের ঘাড় যেন সুতোর মতো। চোখ লাল টকটকে। সাগরের, নাকি নদীর বোঝার ক্ষমতা আমার নেই। তবুও কিনলাম।

পহেলা বৈশাখ ১৪৩৩, বসে ভাবছি, যদি বিরাট ইলিশ শিকার করে এখন হাঙরের কবলে পড়তেন, তাহলে কী করতেন আর্নেস্ট হেমিংওয়ের অমন চরিত্র সেই বৃদ্ধ জেলে সান্তিয়াগো।

অথবা মায়ের হাতে লাল টকটকে চোখের সুতোর মতো ইলিশ দিতাম, তাহলে তিনি কী বলতেন। মা কি আমাকে ভেজে দিতেন—‘ইলিশ’।       

বিজ্ঞাপন