বিজ্ঞাপন

এগারসিন্দুর : সময়ের এক জটিল কোলাজ

এগারসিন্দুর : সময়ের এক জটিল কোলাজ

লেখার পুরোটা পড়ে মনেই হবে না লেখক একজন পুরোদস্তুর ব্যবসায়ী কিংবা কর্পোরেট ব্যক্তিত্ব। মনে হবে শিল্প-সাহিত্য পাড়ার পুরোনো কেউ। দারুণ নৈপুণ্যে গল্পের প্লটটিকে সাজিয়েছেন তিনি। রেজা গ্রুপের কর্ণধার, শিল্প উদ্যোক্তা সাহিদ রেজার লেখা উপন্যাস ‘এগারসিন্দুর’ একাধারে ভ্রমণকাহিনি, স্মৃতিচিত্র, সমাজ-বাস্তবতা ও ইতিহাসের এক অনন্য মিশ্রণ। 

এটি প্রচলিত প্লটনির্ভর উপন্যাস নয়; বরং চলমান জীবনের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত এক বহুস্বরিক বয়ান-যেখানে ট্রেনের হুইসেল, হাওরের ঢেউ, মানুষের স্মৃতি ও সময়ের ক্ষয় একসূত্রে গাঁথা।

উপন্যাসটির শুরুতেই যে ট্রেনযাত্রার বর্ণনা, তা কেবল একটি যাত্রাপথ নয়- বরং আধুনিক বাংলাদেশের অবকাঠামো, উন্নয়ন, ব্যর্থতা ও সম্ভাবনার প্রতীক হয়ে ওঠে। ডেমু ট্রেনের ব্যর্থতা, কোরিয়ান প্রযুক্তির আগমন কিংবা পরিবেশবান্ধব ডেমু ট্রেনের প্রসঙ্গ- এসব কেবল তথ্য নয়, এগুলো লেখকের দৃষ্টিভঙ্গির অংশ; যেখানে উন্নয়ন ও বাস্তবতার দ্বন্দ্ব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। 

এই অংশে লেখক একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপন করেন-আমরা কি সত্যিই টেকসই উন্নয়নের পথে হাঁটছি, নাকি কেবল বাহ্যিক অগ্রগতির মোহে আটকে আছি?

উপন্যাসটির সবচেয়ে শক্তিশালী দিক এর ভাষা ও বর্ণনাশৈলী। লেখক চিত্রকল্প নির্মাণে দক্ষ। ট্রেনকে “তেড়ে আসা ষাঁড়” বা “অজগর”-এর সঙ্গে তুলনা, কিংবা হাওরের বিস্তীর্ণ জলরাশিকে “কূলহীন পাথার” হিসেবে উপস্থাপন- এসব উপমা পাঠককে দৃশ্যের ভেতরে টেনে নেয়। বিশেষ করে হাওর অঞ্চলের বর্ণনায় লেখকের সংবেদনশীলতা লক্ষ্যণীয়। প্রকৃতি এখানে কেবল পটভূমি নয়, এক জীবন্ত চরিত্র- যার নিজস্ব ছন্দ, সৌন্দর্য ও ক্ষত আছে।

এই উপন্যাসের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ স্তর হলো স্মৃতি ও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার মিশ্রণ। আংটির গল্প, দাম্পত্যের সূক্ষ্ম আবেগ, বন্ধুত্বের সহজাত উচ্ছ্বাস-এসব ছোট ছোট অনুষঙ্গ উপন্যাসটিকে মানবিক করে তোলে। বিশেষ করে আংটির প্রসঙ্গটি এক ধরনের প্রতীক-সময়ের পরিবর্তন, সম্পর্কের স্থায়িত্ব এবং জীবনের অনিশ্চয়তার প্রতিফলন।

সামাজিক বাস্তবতাও এখানে তীক্ষ্ণভাবে উঠে এসেছে। টঙ্গীর বস্তি, শিল্পাঞ্চলের বৈষম্য, হাওরের দারিদ্র্য, পরিবেশ বিপর্যয়-সবকিছু লেখক নিরাবেগ কিন্তু গভীর সহানুভূতির সঙ্গে তুলে ধরেছেন। অলওয়েদার সড়ক নিয়ে তার পর্যবেক্ষণ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। উন্নয়নের নামে প্রকৃতির ওপর হস্তক্ষেপ কীভাবে দীর্ঘমেয়াদে বিপর্যয় ডেকে আনে, সে প্রশ্নটি উপন্যাসের অন্তর্লয়ে অনুরণিত হয়।

ইতিহাসের ব্যবহারও এ উপন্যাসের একটি বড় শক্তি। এগারসিন্দুরের অতীত, ঈসা খাঁর লড়াই, মোগল আমল, প্রাচীন বাণিজ্যকেন্দ্র- এসব তথ্য কেবল প্রেক্ষাপট তৈরি করে না, বরং বর্তমানের সঙ্গে অতীতের একটি সংলাপ তৈরি করে। এতে করে উপন্যাসটি একটি সময়-সেতু হয়ে ওঠে, যেখানে পাঠক একসঙ্গে অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎকে অনুভব করতে পারে।

তবে কিছু জায়গায় বর্ণনার বিস্তার উপন্যাসের গতি কিছুটা মন্থর করেছে। বিশেষ করে তথ্যভিত্তিক অংশগুলো কখনো কখনো প্রবন্ধধর্মী হয়ে ওঠে, যা গল্পের স্বাভাবিক প্রবাহে সামান্য বাধা সৃষ্টি করে। তবুও, এই বিস্তারই আবার উপন্যাসটিকে আলাদা মাত্রা দিয়েছে- একটি ডকুমেন্টারি ঘরানার গভীরতা এনে।

সবশেষে বলা যায়, ‘এগারসিন্দুর’ কেবল একটি উপন্যাস নয়; এটি বাংলাদেশের ভূগোল, ইতিহাস, মানুষ ও সময়ের এক জটিল কোলাজ। এখানে যেমন আছে বন্ধুত্বের উচ্ছ্বাস, তেমনি আছে সমাজের নির্মম বাস্তবতা; যেমন আছে প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য, তেমনি আছে তার ক্ষয়ের বেদনা। 

সাহিদ রেজা তার শিল্প উদ্যোক্তার পরিচয়ের বাইরে এসে একজন সংবেদনশীল গল্পকার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন এই রচনায়। এই উপন্যাস পাঠ শেষে মনে হয়-আমরা কেবল একটি যাত্রা শেষ করিনি; বরং নিজের ভেতরের এক দীর্ঘ ভ্রমণ পাড়ি দিয়েছি। লেখক ‘এগারসিন্দুর’কে বলেছেন এক জীবনের গল্প। 

বইটি প্রকাশ করেছে পানকৌড়ি প্রকাশন। প্রচ্ছদ করেছেন আব্দুল হালিম মন্টু। পাওয়া যাবে www.pankowri.com ও www.rokomari.com-এ। এছাড়াও পাওয়া যাবে ঢাকা, চট্টগ্রাম, ফেনীসহ দেশের বিভিন্ন লাইব্রেরিতে।

বিজ্ঞাপন