সতেরো এবং আঠারো শতকে বাংলা ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে সমৃদ্ধশালী অঞ্চল। এসময় বাংলা পৃথিবীর অন্যতম প্রধান চরিত্রে পরিণত হয়। বাংলার ভূখণ্ড ছিল কৃষি ও শিল্পের মূলকেন্দ্র। পশ্চিমি সমাজের ধনী হওয়ার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে বাংলা। বাংলার উর্বর ভূমি, অপরিমেয় কৃষিপণ্য, কম খরচে ভালো যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে মোঘল সাম্রাজ্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও নির্ভরতার প্রতীক হয়ে ওঠে সুবা বাংলা। সতেরো শতকে সুবা বাংলাকে ‘জান্নাত-আবাদ’ বা ‘জান্নাতাবাদ’ অর্থাৎ স্বর্গরাজ্য নামে আখ্যায়িত করা হতো। মোগল বাদশাহ হুমায়ূন নিজে এই নাম দিয়েছিলেন। আরেক মোগল বাদশাহ আলমগীর বা আওরঙ্গজেব বাংলাকে সম্বোধন করতেন ‘জাতির স্বর্গ’ বলে। এমনই অনেক দুর্লভ তথ্য নিয়ে প্রকাশিত হয়েছে সাংবাদিক ও গবেষক মোহাম্মদ মাহমুদুজ্জামানের লেখা বাংলার ইতিহাসের গৌরবময় ও বিশ্ব সভ্যতায় বাংলার অবদান নিয়ে ব্যতিক্রমী বই ‘স্বর্গভূমি বাংলা’।
হাজারো বছর ধরে কৃষি, বাণিজ্য, শিল্প, শিক্ষাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে পৃথিবীকে নেতৃত্ব দিয়েছে বাংলা। পৃথিবীর প্রাচীন সভ্যতার অংশ হিসেবে উপমহাদেশের অন্যান্য অঞ্চল, গ্রিক, রোমান, ইজিপশিয়ান কিংবা চায়নিজ সভ্যতার চেয়ে বাংলা কোনো ভাবেই পিছিয়ে ছিল না। শুধু প্রাচীন কাল নয়, বর্তমান সময়ের সুপার পওয়ার আমেরিকার অর্থনীতির বিকাশ ঘটেছে বাংলায় বাণিজ্যের মাধ্যমে, ইংল্যান্ডের শিল্প বিপ্লবের পেছনে রয়েছে বাংলার অর্থ, বাংলা থেকে চায়নিজরা জ্ঞান যেমন অকাতরে গ্রহণ করেছেন তেমনি বাংলার ওপর বাণিজ্যেও তারা নির্ভরশীল ছিলেন। পুরো ইউরোপ বাংলায় উৎপাদিত বস্ত্রের জন্য অপেক্ষা করতো। আরব ও আফ্রিকায় বাংলার পণ্য ছিল খুবই আদৃত। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় দেশ থেকে শুরু করে অস্ট্রেলিয়া পর্যন্ত বাংলার বাণিজ্যের পাশাপাশি সমৃদ্ধ সংস্কৃতি দিয়েও প্রভাবিত হয়েছে। একটি একক অঞ্চল হিসেবে উপমহাদেশের ধারণা সৃষ্টির পেছনেও রয়েছে বাংলার গুরুত্বপূর্ণ অবদান।
বাংলা সারা পৃথিবীতে প্রভাব রেখেছে উপনিবেশ স্থাপন করে নয়, যুদ্ধ করে নয়, রাহাজানি বা লুটপাট করে নয়। বাংলা তার অসাম্প্রদায়িক, উদার মানবিকতা, মেধা, দক্ষতা, শিক্ষা, শিল্প ও বাণিজ্য এবং সৃষ্টিশীলতা দিয়েই তা করেছে। যা বাংলাকে অনন্য এক চরিত্রে পরিণত করেছে। অর্থনৈতিক বিষয়েই শুধু নয়, বাংলা সব সময়ই পরিচিতি পেয়েছে আতিথেয়তা, বদান্যতা এবং ভালো মানুষের দেশ হিসেবেও।
‘স্বর্গভূমি বাংলা’ বইটিতে লেখক মোহাম্মদ মাহমুদুজ্জামান তার প্রায় দুই দশকের গবেষণা ও অনুসন্ধানে বাংলার ইতিহাসের গৌরবময় ও ইতিবাচক দিকগুলো তুলে ধরেছেন। পাশাপাশি প্রচলিত ধারার ইতিহাস বইয়ের বাইরে গিয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে নতুন এক বাংলাকে পাঠকের সামনে নিয়ে এসেছেন। বইটি প্রকাশনা সংস্থা রুটস প্রকাশ করেছে। প্রচ্ছদ করেছেন খ্যাতিমান শিল্পী সব্যসাচী হাজরা। বইয়ের দোকানের পাশাপাশি বইটি অনলাইনে পাওয়া যাচ্ছে রকমারি ডট কমে।
জেআই
