গত এক দশকে ইন্টারনেট ও ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যাপক প্রসারের ফলে সাংবাদিকতা জগতে আমূল পরিবর্তন এসেছে। সংবাদ সংগ্রহ থেকে প্রচারের ধরন পর্যন্ত বদলে গেছে। সংবাদমাধ্যমগুলো এখন আর শুধু প্রিন্ট বা টেলিভিশনের ওপর নির্ভরশীল নয়। অধিকাংশ সংবাদমাধ্যম অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, সোশ্যাল মিডিয়া এবং মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে দ্রুত খবর পৌঁছে দেওয়ার প্রতিযোগিতায় নেমেছে।
এখন আর কেউ পরদিনের পত্রিকার অপেক্ষায় থাকেন না— দিনের খবর পাঠক দিনেই জেনে যাচ্ছেন, এমনকি মুহূর্তের খবর মুহূর্তেই পাচ্ছেন। সোশ্যাল মিডিয়া ও স্মার্টফোনের সহজলভ্যতার ফলে সাধারণ মানুষও এখন সাংবাদিকতার অংশ হয়ে উঠেছে। মুহূর্তেই ঘটনাস্থল থেকে তথ্য ও ভিডিও ফেসবুক, ইউটিউব কিংবা টিকটকে ছড়িয়ে পড়ছে, যা প্রথাগত সংবাদমাধ্যমের কাজের ধরনকেই বদলে দিচ্ছে। অনেক সময় সাংবাদিকরাও সোশ্যাল মিডিয়ার তথ্যের ওপর নির্ভর করছেন, এমনকি যথাযথ যাচাই ছাড়াই তা সংবাদ হিসেবে প্রকাশ করছেন—যা গণমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতার জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করছে।
ইন্টারনেটের সহজলভ্যতায় এখন চারদিকে ভুয়া খবরের ছড়াছড়ি। কখনো কোনো তারকার মৃত্যু বা বিয়ের ভুয়া সংবাদ, কখনো ধর্মান্তরের গুজব, কখনো দুর্ঘটনা বা রোগে ব্যাপক মৃত্যুর মিথ্যা তথ্য—এসব বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ছে। সাম্প্রতিক সময়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি ভুয়া ছবি ও ভিডিও—যাকে বলা হচ্ছে ডিপফেক—এই সংকটকে আরও জটিল করে তুলেছে। পাঠকও অনেক সময় না বুঝেই এগুলো শেয়ার করছেন। ফলে সাংবাদিকদের দায়িত্ব এখন শুধু খবর প্রচার করা নয়, বরং সত্যতা যাচাই করে সঠিক তথ্য পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়া।
বর্তমানে শুধু অনলাইন নিউজ পোর্টাল নয়, দেশের বড় সংবাদপত্র ও বেসরকারি টেলিভিশনেরও নিজস্ব ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম রয়েছে। তারা মাল্টিমিডিয়া কনটেন্ট তৈরি করছে, লাইভ সম্প্রচার করছে, এমনকি সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যাপকভাবে সক্রিয়। এতে টেলিভিশন ও ডিজিটাল সাংবাদিকতা যেন মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে, আর পাঠকও একসঙ্গে একাধিক মাধ্যম থেকে খবর নিচ্ছেন।
গত এক দশকে ডিজিটাল মিডিয়ার প্রসারের ফলে ছাপা পত্রিকার প্রচারসংখ্যা ব্যাপকভাবে কমেছে। পাঠক টানতে ইংরেজি দৈনিকগুলোকেও এখন বাংলায় সংবাদ প্রকাশ করতে হচ্ছে। এমনকি অনেক জনপ্রিয় রেডিও সেবাও বন্ধ হয়ে গেছে, যেমন ২০২২ সালের ৩১ ডিসেম্বর বিবিসি বাংলা তাদের ৮১ বছরের রেডিও সম্প্রচার বন্ধ করে দেয়। তবে তারা অনলাইন ও টেলিভিশনে সংবাদ প্রচার চালিয়ে যাচ্ছে এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যতিক্রমী কনটেন্টের মাধ্যমে জনপ্রিয়তা ধরে রেখেছে।
গণমাধ্যমের নিবন্ধনের চিত্রেও পরিবর্তন এসেছে। তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশে নিবন্ধিত অনলাইন নিউজ পোর্টালের সংখ্যা ২১৩টি, দৈনিক পত্রিকা ১,৩১১টি এবং অনুমোদিত বেসরকারি টেলিভিশন ৪৫টি। এর মধ্যে ১৭টি বেসরকারি টেলিভিশন ও ১৯৬টি দৈনিক পত্রিকার অনলাইন পোর্টাল নিবন্ধন পেয়েছে। তবে এর বাইরেও অসংখ্য অনিবন্ধিত অনলাইন পোর্টাল ও ইউটিউব চ্যানেল সংবাদ প্রচার করছে, যা অনেক সময় পাঠকদের বিভ্রান্ত করছে। ফলে সাংবাদিকদের আরও সতর্ক হতে হবে, যাতে ভুল তথ্য ছড়িয়ে না পড়ে।

সোশ্যাল মিডিয়া এখন সাংবাদিকতার অন্যতম শক্তিশালী মাধ্যম। ফেসবুক, ইউটিউব, ইনস্টাগ্রাম ও টিকটকের মাধ্যমে দ্রুত সংবাদ পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে, বিশেষত তরুণ পাঠকদের কাছে। তবে এসব প্ল্যাটফর্মের অ্যালগরিদম ও ফিল্টার বাবল অনেক সময় নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়ার ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি করে, কারণ ব্যবহারকারীরা মূলত তাদের আগের পছন্দ অনুযায়ী কনটেন্ট দেখতে থাকেন, ফলে বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির তথ্য থেকে বঞ্চিত হন।
সিটিজেন জার্নালিজমের ফলে যে কেউ এখন খবর সংগ্রহ ও শেয়ার করতে পারছে। এটি গণমাধ্যমের জন্য সুবিধা হলেও, তথ্য যাচাই করা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ব্রেকিং নিউজ মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ছে, যা পাঠকদের আপডেট রাখতে সাহায্য করে, তবে এতে ভুল তথ্য প্রকাশের ঝুঁকিও বাড়ছে। তাই সংবাদমাধ্যমগুলোকে দ্রুততার পাশাপাশি নির্ভুলতা নিশ্চিত করতে ফ্যাক্ট-চেকিং ইউনিট গড়ে তুলতে হচ্ছে এবং একাধিক সূত্র থেকে তথ্য মিলিয়ে দেখার চর্চা জোরদার করতে হচ্ছে।
তথ্য সংগ্রহ ও প্রচারের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষা করা এখন বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষত অপরাধ বা দুর্ঘটনার সংবাদে ভুক্তভোগীর পরিচয় প্রকাশের ক্ষেত্রে সতর্কতা জরুরি হয়ে পড়েছে। সাংবাদিকদের অবশ্যই নৈতিক মানদণ্ড বজায় রেখে কাজ করতে হবে, যাতে দ্রুত প্রচারের তাড়নায় কারও ব্যক্তিগত জীবন বা মর্যাদা ক্ষুণ্ন না হয়।
বর্তমানে সাংবাদিকতা মাল্টিমিডিয়া কনটেন্টের ওপর ক্রমশ নির্ভরশীল হয়ে উঠছে। পাঠকরা শুধু লেখা নয়, ভিডিও, অডিও ও ইনফোগ্রাফিক্সের মাধ্যমে খবর উপভোগ করতে চান, বিশেষ করে স্বল্প সময়ে সহজে বোঝা যায় এমন কনটেন্ট এখন বেশি জনপ্রিয়। ফলে সংবাদমাধ্যমগুলোকেও প্রতিবেদন উপস্থাপনায় সৃজনশীল হতে হচ্ছে এবং প্রতিটি প্ল্যাটফর্মের উপযোগী আলাদা ফরম্যাটে কনটেন্ট তৈরি করতে হচ্ছে।
সাংবাদিকতা এখন প্রযুক্তির ওপর ক্রমেই নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইতিমধ্যে সংবাদ লেখা, অনুবাদ, তথ্য বিশ্লেষণ ও দর্শক-পাঠকের আচরণ বোঝার কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে, আর ভবিষ্যতে ভার্চুয়াল রিয়েলিটি ও ব্লকচেইন প্রযুক্তিও সংবাদ তৈরি, বিতরণ ও উপস্থাপনার ধরন বদলে দিতে পারে। এসব প্রযুক্তি কাজকে সহজ করলেও একই সঙ্গে ভুয়া কনটেন্ট শনাক্তকরণ, তথ্যসূত্রের নির্ভরযোগ্যতা যাচাই এবং সাংবাদিকতার নৈতিকতা বজায় রাখার প্রশ্নে নতুন নতুন চ্যালেঞ্জও তৈরি করছে।
সবমিলিয়ে বলা যায়, ডিজিটাল যুগে সাংবাদিকতা আরও প্রযুক্তিনির্ভর হবে, নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত মাধ্যমের মধ্যে প্রতিযোগিতা বাড়বে, তবে সঠিক তথ্য যাচাই, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষা ও পেশাগত নৈতিকতার মান ধরে রাখাই সাংবাদিকতার ভবিষ্যতের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকবে।
লেখক : সহকারী বার্তা সম্পাদক, ঢাকা পোস্ট
