সাংবাদিকতায় এআই : প্রযুক্তিনির্ভর বার্তাকক্ষে ঢাকা পোস্ট

একসময় ভোর মানেই ছিল কাগজের অপেক্ষা। চায়ের কাপে ধোঁয়া উঠত, পাতা উল্টে শুরু হতো দিন। এখন ভোরের আগেই খবর চলে আসে হাতে। মোবাইলের স্ক্রিন জ্বলে ওঠে। নোটিফিকেশনে ভেসে ওঠে ‘ব্রেকিং নিউজ’।
সময়ের এই পরিবর্তন শুধু গতি বাড়ায়নি, বদলে দিয়েছে সাংবাদিকতার ভিতও। সংবাদ এখন আর কেবল লেখা নয়। সংবাদ এখন একইসঙ্গে ডাটা, ভিডিও, লাইভ আপডেট, বিশ্লেষণ।
এসব কাজের কেন্দ্রে সহায়ক হিসেবে রয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই। যে প্রযুক্তিকে একসময় ভবিষ্যতের কল্পনা মনে হতো সেটিই আজ বার্তাকক্ষের নিত্যসঙ্গী।
বদলে যাওয়া বার্তাকক্ষ
ঢাকা পোস্টের বার্তাকক্ষে ঢুকলে পরিবর্তনটা বোঝা যায়। এখানে কেবল কীবোর্ডের শব্দ নয়, আছে ডাটার চলাচল। বড় পর্দায় ভেসে ওঠে অ্যানালিটিক্স। কোথায় কোন খবর পড়া হচ্ছে, কতক্ষণ ধরে পড়া হচ্ছে, কোন বিষয় নিয়ে পাঠকের আগ্রহ বাড়ছে, সবই চোখের সামনে।
একসময় সম্পাদকীয় সিদ্ধান্ত অনেকটাই নির্ভর করত অভিজ্ঞতা ও অনুমানের ওপর। এখন সেই অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণ। ডাটা বলে দেয়, কোন বিষয়ে পাঠক জানতে চাইছেন। কোন প্রশ্নটি এখন সবচেয়ে বেশি?
ট্রেন্ড বোঝার নতুন উপায়
এই কাজের জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে গুগল ট্রেন্ডস। বাংলাদেশে আজ কোন শব্দটি সবচেয়ে বেশি খোঁজা হচ্ছে, কোন ইস্যুতে আগ্রহ বাড়ছে, তা দ্রুত জানা যায়। ধরা যাক, কোনো নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়ে মানুষের কৌতূহল হঠাৎ বেড়ে গেল। ট্রেন্ডের গ্রাফ সেটি স্পষ্ট করে দেয়। এর ফলে সংবাদ পরিকল্পনা হয় সময়োপযোগী। পাঠকের প্রশ্নকে সামনে রেখে তৈরি হয় প্রতিবেদন। সংবাদ তখন আর শুধু তথ্য সরবরাহ নয়, হয়ে ওঠে সংলাপ।
গবেষণায় এআই সহায়তা
একটি বড় অনুসন্ধানী প্রতিবেদন তৈরি করতে কখনো কখনো শত পৃষ্ঠার নথি পড়তে হয়। বছরের পর বছর জমে থাকা ডাটা বিশ্লেষণ করতে হয়। এখানে সাহায্য করে গুগল এআই। এটি জটিল ডাটাকে সহজভাবে সাজিয়ে দেয়। দীর্ঘ নথির সারাংশ তুলে আনে। রিপোর্টার তখন দ্রুত ধরতে পারেন মূল বিষয়টি।
একইভাবে চ্যাটজিপিটি ব্যবহৃত হয় প্রাথমিক গবেষণায়। কোনো বিষয়ের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট জানতে, আন্তর্জাতিক তুলনা খুঁজতে বা ধারণা পরিষ্কার করতে এটি সহায়ক। তবে এখানেই শেষ নয়। প্রতিটি তথ্য যাচাই করেন সাংবাদিক। কারণ বিশ্বাসযোগ্যতা প্রযুক্তির হাতে ছেড়ে দেওয়া যায় না।
ডাটা বিশ্লেষণের আরও গভীরে যেতে ব্যবহার করা হচ্ছে ডিপসিক। বড় পরিসংখ্যানের ভেতর লুকিয়ে থাকা তথ্য বের করে আনতে এটি কার্যকর। সংখ্যার ভিড়ে যে গল্প লুকিয়ে থাকে সেটিও দৃশ্যমান হয়।
ভিডিও সাংবাদিকতার বিস্তার
ডিজিটাল যুগে ভিডিও অপরিহার্য। পাঠক এখন শুধু পড়তে চান না, দেখতে চান। ঘটনার চিত্র, মানুষের অভিব্যক্তি, পরিবেশের আবহ, সব মিলিয়ে একটি পূর্ণ অভিজ্ঞতা। ভিডিও পরিকল্পনায় সহায়ক হচ্ছে গুগলের জেমিনি। স্ক্রিপ্ট থেকে সম্ভাব্য দৃশ্য কল্পনা করা যায়। স্টোরিবোর্ড তৈরি সহজ হয়। তবে বাস্তব ফুটেজের বিকল্প নেই। এআই কেবল প্রস্তুতিতে সহায়তা করে। ক্যামেরার পেছনে থাকেন মানুষই।
প্রযুক্তি ও মানবিকতার ভারসাম্য
তবে একটি বিষয় স্পষ্ট। এআই সাংবাদিক নয়। এআই প্রশ্ন করে না। এআই মাঠে যায় না। এআই মানুষের দুঃখ, কষ্ট অনুভূতির মাধ্যমে বুঝতে পারে না। ঘটনাস্থলে দাঁড়িয়ে কোনো মর্মান্তিক ঘটনা দেখে তার চোখ থেকে পানি বের হয় না। অন্যায়ের সামনে মানুষ যেভাবে দৃঢ় কণ্ঠে প্রতিবাদ করে এআই তা পারে না।
এই সময়ের পাঠক দেখেছেন সংবাদপত্রের বিবর্তন। টেলিভিশনের উত্থান। অনলাইন বিপ্লব। এইসব রূপান্তরের পর এখন চলছে এআই যুগ। এতোসব রূপান্তরের সাক্ষী একজন পাঠক এখন প্রযুক্তি চান। কিন্তু প্রযুক্তির চেয়েও পাঠকের জন্য বিশ্বাসযোগ্যতা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
স্মার্ট বাংলাদেশের পথে
শুধু ডিজিটাল সেবাকে স্মার্ট বাংলাদেশ বলে না। বরং তথ্যসমৃদ্ধ সমাজ, সচেতন নাগরিক ও জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠানকে স্মার্ট বাংলাদেশ বলা হয়। এই যাত্রায় সংবাদমাধ্যমের ভূমিকা বড়। ঢাকা পোস্ট চেষ্টা করছে প্রযুক্তি ও নৈতিকতার সমন্বয় করতে। স্মার্ট বার্তাকক্ষ মানে শুধু আধুনিক যন্ত্র নয়। প্রযুক্তির সঙ্গে মানসিকতার পরিবর্তন এবং শেখার প্রস্তুতি ও দায়িত্বশীলতার পরিচয়।
ভুয়া তথ্যের এই সময়ে এআই আবার হয়ে উঠছে প্রতিরোধের হাতিয়ার। ডিপফেক চিহ্নিত করা যায়। ছবির উৎস যাচাই করা যায়। ভিডিওর মেটাডাটাও বিশ্লেষণ করা যায়।
সামনে যে পথ
আগামী দিনের বার্তাকক্ষ হবে আরও সমন্বিত। মানুষ ও মেশিন পাশাপাশি কাজ করবে। রিপোর্টার মাঠে গল্প খুঁজবেন। এআই সাজিয়ে দেবে প্রেক্ষাপট। সম্পাদক নিশ্চিত করবেন সত্যতা। শেষ পর্যন্ত সাংবাদিকতার প্রাণ একটাই। আর তাহলো সত্যের অনুসন্ধান।
প্রযুক্তি সেই অনুসন্ধানকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে সামনে আনছে। গভীরতা দিচ্ছ। কিন্তু সত্যের দায় মানুষের কাঁধেই সবসময়। এই বিশ্বাস নিয়েই এগোচ্ছে ঢাকা পোস্টের স্মার্ট বার্তাকক্ষ। এআই তাদের সহকারী। পাঠকের আস্থা তাদের মূল শক্তি।