বর্তমানে গণমাধ্যমের প্রতি মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনা সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বলে মন্তব্য করেছেন ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশের (ইউল্যাব) মিডিয়া স্টাডিজ অ্যান্ড জার্নালিজম বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. মাহমুদুন্নবী। গণমাধ্যমভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান কমিউনিকেশন অ্যান্ড রিসার্চ ফাউন্ডেশন আয়োজিত 'জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্র ও গণতন্ত্র পুনর্গঠনে গণমাধ্যমের ভূমিকা' শীর্ষক সংলাপে এ মন্তব্য করেন তিনি।
এ সময় অনুষ্ঠানে আগত বক্তারা বলেন, রাষ্ট্র ও গণতন্ত্র পুনর্গঠনের জন্য স্বাধীন, বস্তুনিষ্ঠ এবং জবাবদিহিমূলক গণমাধ্যমের কোনো বিকল্প নেই। তারা বলেন, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত না হলে রাষ্ট্রীয় সংস্কার, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালীকরণ এবং জনগণের আস্থা পুনর্গঠন সম্ভব নয়।
বুধবার (২৯ জুলাই) জাতীয় প্রেসক্লাবের তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে গণমাধ্যমভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান কমিউনিকেশন অ্যান্ড রিসার্চ ফাউন্ডেশন আয়োজিত 'জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্র ও গণতন্ত্র পুনর্গঠনে গণমাধ্যমের ভূমিকা' শীর্ষক সংলাপে এসব কথা বলেন বক্তারা।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব ও সঞ্চালনা করেন কমিউনিকেশন অ্যান্ড রিসার্চ ফাউন্ডেশনের ভাইস চেয়ারম্যান এবং শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পলিটিক্যাল স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. শাহাবুল হক। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশের (ইউল্যাব) মিডিয়া স্টাডিজ অ্যান্ড জার্নালিজম বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. মাহমুদুন্নবী।
মূল প্রবন্ধে ড. মাহমুদুন্নবী বলেন, বর্তমানে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো গণমাধ্যমের প্রতি মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনা।
তিনি বলেন, ব্যক্তি হিসেবে সাংবাদিকের নিজস্ব রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত মত থাকতে পারে, তবে সংবাদ পরিবেশনের ক্ষেত্রে অবশ্যই বস্তুনিষ্ঠতা, সত্যনিষ্ঠা ও পেশাদারিত্ব বজায় রাখতে হবে। এজন্য প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের পাশাপাশি সাংবাদিকতার মানসিকতা ও পেশাগত চর্চারও পরিবর্তন প্রয়োজন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক ড. গীতি আরা নাসরীন বলেন, জুলাইয়ের ঘটনাকে অনেকে বিপ্লব বললেও প্রকৃত অর্থে বিপ্লব তখনই হবে, যখন রাষ্ট্রের কাঠামোয় মৌলিক পরিবর্তন দৃশ্যমান হবে। তিনি বলেন, স্বাধীনতার পর থেকেই বিভিন্ন সময়ে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, করপোরেট মালিকানা ও অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতার কারণে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা সংকুচিত হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে গণমাধ্যমকে জনস্বার্থের পরিবর্তে ব্যবসায়িক ও রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করা হচ্ছে, যা সম্পাদকীয় স্বাধীনতার জন্য বড় বাধা।
বিএনপির মিডিয়া সেলের সদস্য মাহমুদা হাবিবা বলেন, বর্তমান সময়ে রাষ্ট্র পুনর্গঠনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার গণমাধ্যম। রাষ্ট্র, নাগরিক এবং গণমাধ্যমের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা গড়ে তুলতে না পারলে গণতান্ত্রিক সংস্কার সফল হবে না। তিনি সাংবাদিকদের চাকরির নিরাপত্তা, ন্যায্য বেতন এবং আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে জুলাই অভ্যুত্থানের সময় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দায়িত্ব পালনকারী সাংবাদিকদের ভূয়সী প্রশংসা করেন।
জাতীয় সংসদে বিরোধী দলীয় মুখপাত্র ব্যারিস্টার নাজিবুর রহমান মোমেন বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্যে প্রণীত ‘জুলাই সনদ’ দ্রুত বাস্তবায়ন প্রয়োজন। তিনি বলেন, সংস্কারের নামে সময়ক্ষেপণ না করে নির্বাচন ও রাষ্ট্র সংস্কার বিষয়ে সুস্পষ্ট রোডম্যাপ ঘোষণা করা উচিত। পাশাপাশি নির্বাচন কমিশনসহ গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের নিরপেক্ষতা নিশ্চিত এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন।
মিডিয়া সাপোর্ট নেটওয়ার্কের আহ্বায়ক ও গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের সাবেক সদস্য জিমি আমির বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানের সময় মাঠের বাস্তবতা এবং অনেক গণমাধ্যমের উপস্থাপনার মধ্যে স্পষ্ট ব্যবধান ছিল। তিনি অভিযোগ করেন, অনেক সাংবাদিক স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারেননি। গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের বিভিন্ন সুপারিশ বাস্তবায়নে প্রশাসনিক বাধার বিষয়টিও তুলে ধরেন তিনি।
চ্যানেল ২৪-এর অ্যাসাইনমেন্ট এডিটর মাকসুদ-উন-নবী বলেন, সাংবাদিকতার প্রথম দায়িত্ব সত্য যাচাই করা। কোনো ঘটনার দুই পক্ষের বক্তব্য তুলে ধরাই যথেষ্ট নয়, বরং বাস্তবতা যাচাই করে সত্য প্রকাশ করাই একজন সাংবাদিকের মূল দায়িত্ব। একই সঙ্গে ভুয়া তথ্য ও অপতথ্যের বিরুদ্ধে আরও কার্যকর ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান তিনি।
সংলাপে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, সাংবাদিক, গবেষক, শিক্ষার্থী, নীতিনির্ধারক, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। বক্তারা রাষ্ট্র পুনর্গঠন, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালীকরণ, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা, জবাবদিহিতা, তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা এবং গণমাধ্যম সংস্কারের বিভিন্ন বিষয়ে গুরুত্বারোপ করেন।
এসএএ/এনটি
