হলি আর্টিজানের পর হামলা হতো বনানী-মগবাজার-বসুন্ধরায়

Md Adnan Rahman

০১ জুলাই ২০২২, ১২:০৫ এএম


হলি আর্টিজানের পর হামলা হতো বনানী-মগবাজার-বসুন্ধরায়

২০১৬ সালে বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় জঙ্গি হামলাটি হয় গুলশান হলি আর্টিজানে। সেদিন জঙ্গিদের গুলিতে প্রাণ হারিয়েছিল ২২ জন নিরীহ ব্যক্তি। সেনাবাহিনীর অপারেশন থান্ডারবোল্টে নিহত হয় ৬ হামলাকারী জঙ্গি। কয়েকদিনের মধ্যেই একইভাবে হামলা চালানো হয় কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়ার ঈদ জামাতে। সেখানেও নিহত হয় হামলাকারী জঙ্গিরা। তবে সদস্যদের মৃত্যুতেও থেমে ছিল না জঙ্গিরা। একের পর এক হামলার প্রস্তুতি নিয়েছিল তারা।

পুলিশ সদরদপ্তর সূত্রে জানা যায়, গুলশানের আর্টিজানের পরেই তাদের হামলার টার্গেট ছিল মগবাজারে বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির জাতীয় সদর দপ্তরে। সেখানে দেশি-বিদেশি কর্মকর্তা ও স্বেচ্ছাসেবক ছিল। জঙ্গিরা চেয়েছিল রেড ক্রিসেন্টের সদর দপ্তরের সবাইকে জিম্মি করবে। সেখানে বিদেশি থাকায় জিম্মিদশার সংবাদ আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় প্রকাশ পাবে, এ নিয়ে বিশ্বজুড়ে তারা নিজেদের শক্তি জানান দেবে।

জুলাইয়ের ১ তারিখ আর্টিজানের পর ১১/১২ তারিখের দিকে জঙ্গিদের টার্গেট ছিল রাজধানীর এয়ারপোর্ট রোডের আন্তর্জাতিক চেইন হোটেল রেডিসন ব্লুতে অতিথিদের জিম্মি ও হত্যা করা। জঙ্গিদের উদ্দেশ্য ছিল রেডিসনের দেশি বিদেশি অতিথিদের হত্যা করে বাংলাদেশকে ‘অনিরাপদ’ হিসেবে ঘোষণা করা।

dhaka post

জঙ্গিরা যখন রেড ক্রিসেন্ট ও রেডিসনে হামলার পরিকল্পনা করেছিল, তৎক্ষণাৎ তা টের পেয়ে যায় বাংলাদেশ পুলিশ। জানায় রেডিসন এবং রেড ক্রিসেন্টকে। কয়েক স্তরের নিরাপত্তা নেয় রেড ক্রিসেন্ট। আর সংবাদ পেয়েই হোটেলের প্রবেশপথ বন্ধ করে দেয় রেডিসন। বাতিল করা হয় সব হল বুকিং। মোতায়েন করা হয় অতিরিক্ত পুলিশ। রেডিসনের মূল ফটকের ভেতরের প্যাসেজ ও পার্কিংয়ে কাউকে হাঁটা-চলাও করতে দেয়নি কর্তৃপক্ষ।

এই দুই জায়গায় হামলার সুনির্দিষ্ট তথ্য থাকায় নস্যাৎ করে দেওয়া হয় জঙ্গিদের পরিকল্পনা। আর যিনি এ তথ্য পেয়ে এই দুই স্থাপনাকে জঙ্গিদের হামলা থেকে রক্ষা করেছেন তিনি হচ্ছেন তৎকালীন বগুড়া জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) মো. আসাদুজ্জামান। বর্তমানে তিনি পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের প্রধান। এই বীরত্বপূর্ণ অবদানের জন্য ২০১৭ সালে তাকে পুলিশের সর্বোচ্চ স্বীকৃতি বাংলাদেশ পুলিশ মেডেল (বিপিএম) পদক দেওয়া হয়েছিল।

dhaka post
পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের প্রধান মো. আসাদুজ্জামান

পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স সূত্রে জানা যায়, গুলশান হামলার পর জঙ্গি দমনে পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স স্পেশাল টাস্ক গ্রুপ (এসটিজি) গঠিত হয়। এসপি আসাদুজ্জামানের নির্দেশনা ও নিবিড় তত্ত্বাবধানে এসটিজি ১৯ জঙ্গিকে গ্রেপ্তার এবং ১৫টি সম্ভাব্য জঙ্গি হামলা ঠেকিয়ে দেয়। এছাড়া বিভিন্ন সম্প্রদায়ের কমপক্ষে ২০ ব্যক্তিকে টার্গেট কিলিংয়ের বিষয়ে আগাম তথ্য সংগ্রহ করে তাদের বাড়তি নিরাপত্তার ব্যবস্থা করেন এই পুলিশ কর্মকর্তা।

এছাড়াও গুলশান হামলার পর বসুন্ধরা সিটির সিনেপ্লেক্স এবং যমুনা ফিউচার পার্কে হামলারও হুমকি ছিল। তবে সেগুলোও নস্যাৎ করে দেয় বাংলাদেশ পুলিশ।

বর্তমানে জঙ্গিদের সক্ষমতা নিয়ে সিটিটিসি প্রধান মো. আসাদুজ্জামান বলেন, হলি আর্টিসান হামলার পর তাদের সক্ষমতা আমরা গুড়িয়ে দিয়েছি। তাদের যদি সক্ষমতা থাকতো, আপনার কি মনে হয় তারা বসে থাকতো? অবশ্যই তারা চেষ্টা করতো। তাদের আসলে সক্ষমতা নেই। যদিও তারা বিভিন্ন স্থানে বোমা পুতে বিস্ফোরণের মাধ্যমে হামলার চেষ্টা করেছে। কিন্তু তারা সক্ষম হয়নি। আমরা তাদের সব পরিকল্পনা নস্যাৎ করেছি, গুড়িয়ে দিয়েছি তাদের।

dhaka post

২০১৬ সালের ১ জুলাই হলি আর্টিজানের ওই হত্যাযজ্ঞের প্রথম দিনই দুই পুলিশ কর্মকর্তাসহ ২২ জন নিহত হন। পরদিন সকালে সেনাবাহিনীর অভিযানে ছয় হামলাকারী জঙ্গিও নিহত হন। ওই ঘটনার প্রায় দুই মাস পর পুলিশের অভিযানে নারায়ণগঞ্জে নব্য জেএমবির প্রধান ও গুলশান হামলার মাস্টারমাইন্ড তামিম আহমেদ চৌধুরী নিহত হন। কয়েক মাস পর নিহত হন অপর মাস্টারমাইন্ড ও তামিমের সহযোগী নুরুল ইসলাম ওরফে মারজান।

গুলশান হামলার ছয়দিন পর অর্থাৎ ৭ জুলাই কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়ার ঈদ জামাতে জঙ্গি হামলার চেষ্টাকালে পুলিশসহ তিনজন নিহত হন। পুলিশের গুলিতে হামলাকারী জঙ্গিও নিহত হন। এ ঘটনার পর দেশের বিভিন্ন স্থানে জঙ্গিবিরোধী চিরুনি অভিযান পরিচালিত হয়। এসময় পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধ ও আত্মঘাতী বিস্ফোরণে নিহত হন প্রায় অর্ধশতাধিক জঙ্গি।

এআর/এসএম

Link copied