ঘরে ঘরে জ্বর-সর্দি, পরীক্ষার বিকল্প নেই

Tanvirul Islam

০৩ জুলাই ২০২২, ১২:৪৪ পিএম


ঘরে ঘরে জ্বর-সর্দি, পরীক্ষার বিকল্প নেই

এই রোদ এই বৃষ্টি। আবহাওয়ার পাশাপাশি তাপমাত্রার হঠাৎ পরিবর্তনের কারণে বাড়ছে জ্বর-সর্দি। সম্প্রতি দেশে ভাইরাল ফিভারের পাশাপাশি ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বেড়েছে। আবার করোনাভাইরাস সংক্রমণেরও নতুন ঢেউ প্রবেশ করেছে।

এ অবস্থায় করোনা না ডেঙ্গু, নাকি মৌসুমি জ্বর— এ নিয়ে দ্বিধায় রোগী ও তার স্বজনরা। চিকিৎসকরা বলছেন, এই মুহূর্তে জ্বর এলে বাসায় বসে থাকার সুযোগ নেই। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী করাতে হবে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা।

আরিফ মাহমুদ পেশায় বেসরকারি চাকরিজীবী। গত দুই দিন ধরে তিন বছরের শিশুসহ তার পরিবারের তিন সদস্যই সর্দি-জ্বরে ভুগছে। সাধারণ সর্দি-জ্বর ভেবে এখনও নেননি কোনো চিকিৎসকের পরামর্শ। চিকিৎসা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, পরিচিত চিকিৎসকের পরামর্শ মতো ওষুধ খাচ্ছি। তবে এখনও কোনো হাসপাতালে গিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা বা চিকিৎসা করানো হয়নি। দেখছি পরিচিত আরও কয়েকটি পরিবারেও এরকম সর্দি-জ্বর হয়েছে। এখন বুঝতে পারছি না সেটি সাধারণ জ্বর-সর্দি নাকি করোনা না ডেঙ্গু। আজ পরিবারের সবাইকে নিয়ে পরীক্ষা করাব।

শুধু আরিফ মাহমুদের পরিবার নয়, জ্বর-সর্দির রোগী এখন ঘরে ঘরে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে করোনা সংক্রমণের নতুন ঢেউ প্রবেশ করেছে। এই ঢেউয়ে সংক্রমণ দ্রুতগতিতে চূড়ার দিকে যাচ্ছে।

এদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডেঙ্গু বিষয়ক প্রতিবেদন বলছে, গত এক মাসে আগের মাসের তুলনায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা বেড়েছে কয়েকগুণ। এ অবস্থায় যারা জ্বর-সর্দিতে আক্রান্ত হয়েছেন বা হননি সবাইকেই সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একই সঙ্গে জনসমাগম এড়িয়ে চলার পাশাপাশি মাস্কের ব্যবহার বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন তারা।

দ্রুত পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হতে হবে করোনা না ডেঙ্গু

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ আবদুস সবুর খান ঢাকা পোস্টকে বলেন, এখন তো ঋতু পরিবর্তন হচ্ছে। দেখা যাচ্ছে দিনের বেলায় প্রচুর গরম, আবার তার ভেতরে হঠাৎ বৃষ্টি চলে এলো। কেউ কেউ একটু বৃষ্টিতেও ভিজল, ফলে হঠাৎ প্রচুর গরম থেকে শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল। তাছাড়া বাইরের প্রচণ্ড গরম থেকে ফিরে অনেকে বাসায় বা অফিসে গিয়ে এসির নিচে বসে যান। এই যে তীব্র গরম আর হঠাৎ ঠান্ডার একটা সংমিশ্রণ হয়েছে এখান থেকেই জ্বর-সর্দি চলে আসতে পারে।

তিনি বলেন, কমন কোল্ড সবসময়ই হতে পারে। কিন্তু এখন এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ডেঙ্গু জ্বর এবং কোভিড-১৯ সংক্রমণ। এখন জ্বর হলে এটা ডেঙ্গু, করোনা নাকি সাধারণ সর্দি-কাশি সেটা বুঝতে মানুষ সময় নিচ্ছে। আমার মনে হয়, যেকোনো জ্বর-সর্দিতেই যদি কোভিড আর ডেঙ্গু পরীক্ষাটা করে ফেলা যায়, তাহলে আর কোনো দ্বিধাই থাকবে না। শুরুতেই যদি পরীক্ষাটা করে নেওয়া যায়, তাহলে পরে জটিলতা তৈরি হয় না।

dhakapost

করোনা সংক্রমণ আরেকটু বাড়বে

দেশে করোনা সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতি নিয়ে ডা. সবুর খান বলেন, করোনা সংক্রমণ হয়ত আরেকটু বাড়বে। তার কারণ হলো সামনে ঈদ। ঈদে যাতায়াত হবে, হাজার হাজার মানুষ একসঙ্গে ঈদের নামাজ পড়বে, হাটে পশু বেচাকেনা হবে। যার ফলে সংক্রমণের হার এখন যেখানে ১৫ শতাংশে চলে গেছে, কিছুদিনের মধ্যে হয়ত সেটা আরেকটু ওপরে উঠবে। কিন্তু খুব বেশি উঠবে না এটাও ঠিক।

তিনি বলেন, আমরা অসংখ্য মানুষকে টিকা দিয়েছি, এমনকি এখনও দিচ্ছি। তাছাড়া কিছু লোকজনের দেহে তো আগে করোনা আক্রান্ত হওয়ায় এন্টিবডি তৈরি হয়ে আছে, ফলে এবার হয়ত গতবারের মতো আক্রান্তের হার ৩০ শতাংশের আশপাশে যাবে না।

এই জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ বলেন, আমাদের জন্য একটি ভালো দিক হলো এ বছর করোনা আক্রান্ত হয়ে হসপিটালাইজড রোগীর সংখ্যা কিন্তু এত বেশি না। কোভিড ডেডিকেটেড হাসপাতালগুলোতে অধিকাংশ শয্যাই ফাঁকা পড়ে আছে। সবকিছু মিলিয়ে আশা করছি সংক্রমণটা সহনীয় মাত্রাতেই থেকে যাবে।

নিয়ম-শৃঙ্খলায় শিথিলতা, ভারতে সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতিই কারণ

দেশের প্রখ্যাত মেডিসিন বিশেষজ্ঞ, প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত চিকিৎসক ও এমিরেটাস অধ্যাপক ডা. এবিএম আবদুল্লাহ ঢাকা পোস্টকে বলেন, করোনাভাইরাস একটি মিউটেন্ট ভাইরাস, এটি খুব দ্রুতই তার চরিত্র বদলায় এবং নতুন রূপ ধারণ করে। আর বর্তমানে সংক্রমণ যেটি বাড়ছে সেটিও ওমিক্রনের দুটি সাব-ভ্যারিয়েন্টের (বিএ-৪, বিএ-৫) প্রভাবে৷ এই দুটি এক হয়ে অনেক সংক্রমণশীল হয়ে উঠেছে, একজন থেকে এটি ১০ জনে ছড়িয়ে যেতে পারে।

তিনি বলেন, তিন সপ্তাহ আগেও তো আমরা ভালো ছিলাম। দেশে সংক্রমণের হার অনেক কম ছিল। কিন্তু এখন সেটি লাফিয়ে বাড়ছে। কারণ মানুষের মধ্যে একটি শিথিলভাব চলে এসেছে। বাইরে চলাফেরার ক্ষেত্রে কেউই শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখছে না, মাস্ক পরে না, এসব কারণেই সংক্রমণটা আবার বাড়ছে। আরেকটি কারণ হলো— ভাইরাসটি যেহেতু দ্রুত সংক্রমণশীল, এটি কিন্তু পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে পড়েছে। সে হিসেবে পার্শ্ববর্তী দেশে বাড়লে আমাদের দেশে বাড়ার একটি বড় ঝুঁকি থেকেই যায়। কারণ তাদের সীমান্তে আমাদের প্রচুর যাতায়াত হয়। বৈধ-অবৈধভাবে জলপথ, স্থলপথ ও বিমান পথে নিয়মিত মানুষ আসা-যাওয়া করে। ফলে সংক্রমণটি ভারত থেকে খুব সহজেই আমাদের দেশেও চলে আসতে পারে।

dhakapost

টিকা নেওয়া ব্যক্তিদের দেহে কার্যকারিতা কমে যাচ্ছে

ডা. এবিএম আবদুল্লাহ বলেন, ওমিক্রন এমন একটি ভ্যারিয়েন্ট, যেখানে প্রচলিত টিকাগুলো খুব বেশি কাজ করছে না। তাছাড়া যারা এখন পর্যন্ত টিকা নিয়েছেন, টিকার অ্যাকশন কিন্তু লংটাইম কাজ করে না। বড় জোর এটি একজন মানুষকে ৬ থেকে ৯ মাস সুরক্ষা দিয়ে থাকে। তার মানে আমাদের দেহে টিকার কার্যকারিতা কিন্তু আস্তে আস্তে কমে যাচ্ছে। অ্যান্টিবডি কমে যাওয়ার কারণেও কিন্তু করোনা সংক্রমণটা আবারও বেড়ে যাচ্ছে।

তিনি বলেন, অনেকে প্রথম ও দ্বিতীয় ডোজ নিলেও বুস্টার ডোজে খুব বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। টিকা নেওয়ার ক্ষেত্রে মানুষের গাফিলতিভাব চলে এসেছে। দেশে বুস্টার ডোজ কার্যক্রম শুরুর দীর্ঘদিন পার হলেও এখন পর্যন্ত ১৫ থেকে ২০ শতাংশের বেশি মানুষ সেটি নেয়নি। টিকা নেওয়ার ব্যাপারেও মানুষের মধ্যে একটা গাফিলতিভাব চলে এসেছে। সবমিলিয়েই সংক্রমণের ঝুঁকিটা বাড়িয়ে তুলছে।

করোনা বাড়তে থাকায় স্বাস্থ্যমন্ত্রী ‘চিন্তিত’

দেশে করোনার সংক্রমণ বাড়তে থাকায় বিষয়টি নিয়ে কিছুটা ‘চিন্তিত’ বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক। এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, করোনা এখন ঊর্ধ্বমুখী। আমরা কিছুটা চিন্তিত তবে শঙ্কিত নই। আমরা প্রস্তুত আছি।

মন্ত্রী বলেন, আমাদের হাসপাতালের উন্নয়ন চলমান আছে। হাসপাতালে তেমন রোগী নেই। রোগী এলে চিকিৎসা দেওয়ার পূর্ণ ব্যবস্থা আছে। তবে সংক্রমণ কিছুটা বাড়লেও রোগীদের মধ্যে তেমন কোনো জটিলতা নেই। কারণ আমরা দেশের টার্গেট করা প্রায় সবাইকেই টিকার আওতায় এনেছি। যে কারণে সংক্রমণ এক শতাংশের নিচে চলে এসেছিল। আমাদের মৃত্যু প্রায় শূন্যের কোটায়। কিন্তু এখন আবার সংক্রমণের হার ১৫ শতাংশে উঠে এসেছে। সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আমরা সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নিয়েছি।

তিনি আরও বলেন, করোনায় মন্ত্রণালয়ের অনেকেই আক্রান্ত হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অফিসেও বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা করোনায় আক্রান্ত হয়েছে। এ অবস্থায় আমাদের সচেতন হতে হবে। সবাইকেই মাস্ক পরতে হবে, সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে হবে।

dhakapost

করোনায় মৃত্যু ২৯ হাজার ১৬০ জনের, আক্রান্ত প্রায় ২০ লাখ

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, দেশে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে এখন পর্যন্ত মোট মৃত্যু দাঁড়িয়েছে ২৯ হাজার ১৬০ জনে। গতকাল (২ জুলাই) নতুন করে করোনায় ৬ জনের মৃত্যু হয়েছে।

এছাড়াও করোনায় মোট আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৯ লাখ ৭৬ হাজার ৭৮৭ জনে। গত একদিনে নতুন করে ১ হাজার ১০৫ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে।

এর আগে ২০২০ সালের ৮ মার্চ দেশে প্রথম ৩ জনের দেহে করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়। এর ১০ দিন পর ওই বছরের ১৮ মার্চ দেশে এ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে প্রথম একজনের মৃত্যু হয়। ২০২১ সালের ৫ ও ১০ আগস্ট দুদিন সর্বাধিক ২৬৪ জন করে মারা যান।

টিআই/এসএসএইচ

Link copied