ব্রুনাইয়ের সুলতানের ঢাকা সফর

অগ্রাধিকারে জ্বালানি-জনশক্তি রপ্তানি, জট খুলতে পারে আকাশ পথের

Nazrul Islam

২৯ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০৯:৪৪ পিএম


অগ্রাধিকারে জ্বালানি-জনশক্তি রপ্তানি, জট খুলতে পারে আকাশ পথের

ব্রুনাইয়ের সুলতান হাসানাল বলকিয়া / ফাইল ছবি

দুই দিনের সফরে আগামী ১৪ অক্টোবর ঢাকায় আসছেন দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার দেশ ব্রুনাইয়ের সুলতান হাসানাল বলকিয়া। সুলতানের সফরে জ্বালানি খাতে অগ্রাধিকার, জনশক্তি রপ্তানি, আকাশ পথে সরাসরি যোগাযোগ, প্রতিরক্ষাসহ আরও দু’একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সইয়ের প্রস্তুতি চলছে। এর মধ্যে একটি নবায়ন হবে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে। মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা নাম না প্রকাশের শর্তে জানান, ২০১৯ সালের এপ্রিলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ব্রুনাই সফর করেন। তার ফিরতি সফর হিসেবে পরের বছর ব্রুনাইয়ের সুলতানের ঢাকায় আসার কথা ছিল। কিন্তু করোনা মহামারিসহ বিভিন্ন ঝামেলার কারণে সফরটি হয়নি। নতুন করে এখন সফর চূড়ান্ত হয়েছে। আগামী ১৪-১৬ অক্টোবর ঢাকায় সফর করবেন সুলতান।

মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, সুলতানের সফরে কয়েকটি সমঝোতা ও চুক্তি নিয়ে আলোচনা চলছে। ব্রুনাইয়ের সঙ্গে জ্বালানি, শ্রমবাজার, সরাসরি বিমান চলাচল, প্রতিরক্ষা এবং নাবিকদের সনদের স্বীকৃতি বিষয়ক সমঝোতা সই হতে পারে। এগুলো নিয়ে কাজ চলছে। আশা করা হচ্ছে সুলতানের সফরে এগুলো নিষ্পত্তি করা সম্ভব হবে। এছাড়া দ্বৈত কর পরিহার এবং বিনিয়োগ সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে কাজ চলছে।

আরও পড়ুন : ব্রুনাইয়ে বাংলাদেশে বি‌নিয়োগ সম্ভাবনার কথা তুলে ধরল হাইক‌মিশন

এ কর্মকর্তা বলেন, সুলতানের সফরে রোহিঙ্গা ইস্যুটা গুরত্বপূর্ণ। কেননা, ব্রুনাই আসিয়ানের গুরত্বপূর্ণ সদস্য। সুলতানের সফরে বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে আসিয়ানের জোরালো ভূমিকা চাইবে। সবচেয়ে বড় বিষয় যেটা, এ সফরে বর্তমান মিয়ানমার পরিস্থিতির কারণে বাংলাদেশ যেসব সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে, সেটা তুলে ধরার সুযোগ পাবে।

dhakapost
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ব্রুনাইয়ের সুলতান হাসানাল বলকিয়ার/ ফাইল ছবি

জানা যায়, সুলতানের ঢাকা সফরে রাষ্ট্রপতি মো. আব্দুল হামিদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ হতে পারে। তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে বসবেন। এছাড়া পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন ও সরকারের গুরত্বপূর্ণ মন্ত্রীরা সুলতানের সাক্ষাৎ পেতে পারেন।

সুলতানের সফর সম্পর্কে জানতে চাইলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক জ্যৈষ্ঠ কর্মকর্তা ঢাকা পোস্টকে বলেন, সুলতানের সফরে আমরা চাইবো কয়েকটা গুরত্বপূর্ণ বিষয়ে চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক সই করতে। এর মধ্যে শ্রমবাজার সংক্রান্ত একটা সমঝোতা, সরাসরি বিমান চলাচলে চুক্তি, জ্বালানি নিয়ে আগে একটা সমঝোতা আছে; সেটার নবায়ন হতে পারে। এছাড়া প্রতিরক্ষা সহযোগিতা নিয়ে একটা এমওইউ হতে পারে। এই মুহূর্তে নিশ্চিত করে বলা যাবে না মোট কয়টা চুক্তি হবে। এটা নির্ভর করবে সুলতানের ওপর।

জ্বালানি
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মতো বাংলাদেশও জ্বালানি সংকটে পড়েছে। এ সংকট মোকাবিলায় ঢাকা সংশ্লিষ্ট সোর্সগুলো থেকে জ্বালানি আনার প্রচেষ্টা করছে। এক্ষেত্রে জ্বালানি রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে ব্রুনাই বাংলাদেশের জন্য গুরত্বপূর্ণ সোর্স জানিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, ব্রুনাই জ্বালানির বিষয়ে আমাদের জন্য গুরত্বপূর্ণ সোর্স। তারা প্রচুর পরিমাণে জ্বালানি এক্সপোর্ট করে। তাদের মূল আয় জ্বালানি খাতে। গুরত্বপূর্ণ এ সোর্সকে আমরা কাজে লাগাতে চাচ্ছি।

আরও পড়ুন : বাংলাদেশ থেকে আম নিতে আগ্রহী ব্রুনাই

এ কর্মকর্তা বলেন, আমাদের সঙ্গে ব্রুনাইয়ের একটা জ্বালানি সংক্রান্ত স্মারকও ছিল, সেটার মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। আমরা চেষ্টা করছি, সেটাকে নবায়ন করতে। সুলতানের সফরে এটাকে আমরা নবায়ন করতে চাই। জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কথা বলেছি, এটা করার বিষয়ে। এটা করা গেলে সংকট মুহূর্তে জ্বলানি চাহিদা পূরণ করা যাবে। এতে ব্রুনাইয়ের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক, অর্থনৈতিক ও অন্যান্য সম্পর্ক বাড়বে।

dhakapost
ব্রুনাইয়ে গত সেপ্টেম্বরে কন্সট্রাকশন সাইট পরিদর্শন করেছেন পরাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেন এবং সফরকারী দলের সদস্যরা।

শ্রমবাজার
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ ব্রুনাই বাংলাদেশি কর্মীদের একটি গুরত্বপূর্ণ শ্রমবাজার। দুই দেশের মধ্যে কোনো চুক্তি না থাকায় বেসরকারি খাতের ব্যবস্থাপনায় কর্মী যাচ্ছে দেশটিতে। এতে বাংলাদেশি কর্মীরা প্রতারিত হওয়াসহ বিভিন্ন সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। দেশটির অবকাঠামো নির্মাণ খাত ছাড়াও নার্স, গৃহকর্মী, কৃষি ও প্রকৌশলী খাতে দক্ষ কর্মীর চাহিদা রয়েছে। বাংলাদেশ থেকে কর্মী নিতেও আগ্রহ রয়েছে দেশটির। সেজন্য বাংলাদেশ চাইছে, সুলতানের এ সফরে জনশক্তি রপ্তানি নিয়ে ব্রুনাইয়ের সঙ্গে একটি সমঝোতা স্মারক সই করতে।

আরও পড়ুন : ব্রুনাইয়ের রাষ্ট্রদূত হ্যারিস নোয়াখালীতে

সুলতানের সফরে শ্রমবাজার সংক্রান্ত চুক্তিটি সইয়ে বাংলাদেশের অগ্রাধিকার রয়েছে উল্লেখ করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, ব্রুনাইয়ের শ্রমবাজার আমাদের জন্য খুব সম্ভবনাময়। গত আগস্টের ৩১ তারিখ বাংলাদেশ-ব্রুনাইয়ের মধ্যে দ্বিতীয় ফরেন অফিস কনসালটেশন (এফওসি) বৈঠক হয়। সে সময় ব্রুনাই জানিয়েছে, তারা বেশ কিছু বড় মেগা প্রজেক্ট হাতে নেবে, সেটা হাতে নিলে তাদের কর্মীর প্রয়োজন হবে। তারা বাংলাদেশের কর্মী নিতে চায়। তারা বলেছে, আমাদের কর্মীরা পরিশ্রমী। সেজন্য আমাদের কর্মীদের বিষয়ে তাদের আগ্রহ রয়েছে।

জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো-বিএমইটি’র তথ্য বলছে, ১৯৯২ সাল থেকে ব্রুনাইয়ে বাংলাদেশি কর্মী যাওয়া শুরু হয়। সে বছর দেশটিতে ২২৮ জন কর্মী যান। ২০১৮ সালে ৪ হাজার ৪৮০ জন, ২০১৯ সালে ৩ হাজার ৬২৮, ২০২০ সালে ৫৩০ এবং গত বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত দেশটিতে কর্মী গেছে মাত্র ১০ জন। কর্মী যাওয়া শুরুর পর থেকে গত ৩০ বছরে দেশটিতে মোট কর্মী গেছে ৭৫ হাজার ৪৩৩ জন।

বিমান যোগাযোগ/কানেক্টিভিটি
২০১৯ সালের এপ্রিলে ব্রুনাই সফর করেছিলেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সে সেময় দু’দেশের মধ্যে সরাসরি বিমান যোগাযোগের বিষয়ে আলোচনা হয়। পরবর্তী এ বিষয়ে দুই থেকে আড়াই বছর আলোচনা চলছে। বর্তমানে বর্তমানে এটি প্রায় চূড়ান্ত অবস্থানে রয়েছে। ব্রুনাইয়ের সুলতানের সফরে সরাসরি বিমান যোগাযোগ বিষয়ে চুক্তিটি স্বাক্ষর হবে বলে জানান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওই কর্মকর্তা।

আরও পড়ুন : ব্রুনাই বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘বঙ্গবন্ধু-বাংলাদেশ’ বুক কর্নার

তিনি বলেন, আমরা ব্রুনাইয়ের সঙ্গে কানেক্টিভিটি চাই। দেশটির সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ না থাকায় যতেষ্ঠ সম্ভবনা থাকা সত্ত্বেও ব্যবসা-বাণিজ্য, পর্যটন, পিপল টু পিপল কনট্রাক্ট সম্প্রসারিত হচ্ছে না। যোগাযোগ অন্তরায় এর প্রধান কারণ। দু’দেশের মধ্যে ওভাবে বিমান চলাচল নেই, ঘুরে যেতে হয়। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে আমরা যোগাযোগ ব্যবস্থায় এয়ার এগ্রিমেন্টটা করতে চাই। এগ্রিমেন্টটা প্রায় চূড়ান্ত। সুলতানের সফরে এটি হওয়ার সম্ভবনা বেশি। সরাসরি ফ্লাইট হলে আমাদের শ্রমিকদের অভিবাসন খরচ কমে আসবে।

প্রতিরক্ষা
ফোর্সেস গোল-২০৩০ অর্জনে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে প্রতিরক্ষা খাতে সহযোগিতার বিষয়ে কাজ করছে বাংলাদেশ। তারই ধারাবাহিকতায় ব্রুনাই থেকে প্রতিরক্ষা খাতে সহযোগিতা পেতে চায় বাংলাদেশ। সেই লক্ষ্যে দেশটির সুলতানের ঢাকা সফরে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বিষয়ক এমটি সমঝোতা স্মারক সইয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছে ঢাকা।

প্রতিরক্ষা সহযোগিতার ধরন জানতে চাইলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, মূলত, দু’দেশের প্রতিরক্ষা সংস্থা বা বাহিনী যারা আছেন তাদের মধ্যে যোগাযোগ, বোঝাপড়া বিষয়ক সমঝোতা। এখানে প্রশিক্ষণের বিষয়টি থাকবে।

একই বিষয়ে জানতে চাইলে মন্ত্রণালয়ের ওই জ্যৈষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, প্রতিরক্ষা বলতে অস্ত্র কেনান বিষয় না। প্রতিরক্ষা বিষয়ক প্রশিক্ষণ, সফর বিনিময়ের বিষয়গুলো থাকবে এতে।

এনআই/এসএম

Link copied