বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন বাস্তবায়নেই বড় ঘাটতি রয়েছে : ড. জাহিদ

Shaid Ripon

১৭ মার্চ ২০২১, ১৭:০৪

বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন বাস্তবায়নেই বড় ঘাটতি রয়েছে : ড. জাহিদ

ড. জাহিদ হোসেন

দরিদ্র লোকের সংখ্যা অনেক কমছে, এটা ঠিক। কিন্তু পুরো সমাজের ক্ষেত্রে ‘জাস্টিস ফর অল’ এখনও কেউ নিশ্চিত করতে পারেনি। দেশ স্বাধীনের ৫০ বছর পর বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীর বছরে এসেও তার স্বপ্ন বাস্তবায়নে বড় ঘাটতি রয়েছে...

সম্প্রতি ঢাকা পোস্টকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন বিশ্বব্যাংকের সাবেক লিড ইকোনমিস্ট ও অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন। বঙ্গবন্ধু প্রসঙ্গে তিনি বলেন, পাকিস্তানের বিরুদ্ধে আমাদের মূল অভিযোগ ছিল অর্থনৈতিক। ওই সময় দেশ একটি হলেও অর্থনীতি ছিল দুটি। এর মধ্যে একটা সম্পূর্ণ বঞ্চিত, আরেকটা সম্পদশালী। এখানে বঞ্চিতদের সম্পদ ব্যবহার করেই তারা সম্পদশালী হচ্ছিল। ওই সময় পশ্চিম পাকিস্তানের কোনো সম্পদেরই ভাগ পূর্ব পাকিস্তান পাচ্ছিল না। কাজেই একটা অন্তর্ভুক্তিমূলক সমৃদ্ধশালী সমাজ গড়ে তোলাই ছিল বঙ্গবন্ধুর লক্ষ্য। তিনি চেয়েছিলেন সবার জন্য স্যোশাল জাস্টিস নিশ্চিত করতে। অর্থনীতি ও সামাজিক ক্ষেত্রে সবাই ন্যায়বিচার পাবে, সেই ধরনের একটা সমাজ গড়ে তোলাই তার স্বপ্ন ছিল। সেদিক থেকে অর্থনীতির ক্ষেত্রে কিছু অগ্রগতি হলেও এখনও সবাই একরকম বিচার পাচ্ছে না। সমাজের কাছেও পাচ্ছে না, আবার আইনের কাছেও না। আইন তো কাগজে-কলমে সবাইকে এক চোখে দেখে। কিন্তু বাস্তব ক্ষেত্রে একজন গরিব লোকের আদালতে গিয়ে সুবিচার পাওয়া প্রায় অসম্ভব ব্যাপার।

দেশে অর্থনীতির বিষয়ে ড. জাহিদ বলেন, দেশ স্বাধীনের আগে ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ পরিবার অতিদরিদ্র ছিল। মানে অন্ন, বস্ত্র ও বাসস্থানের মতো মৌলিক চাহিদা পূরণে সক্ষমতা ছিল না। বর্তমানে এই সংখ্যাটা কোভিডের আগে প্রায় ২০ শতাংশে নেমে এসেছিল। মাত্র ৫০ বছরের ব্যবধানে ৭০-৮০ শতাংশ থেকে ২০ শতাংশে নামিয়ে আনা একটা বড় অর্জন। এটা দেশের উল্লেখযোগ্য অর্জন।’

বেড়েছে সাক্ষরতার হার

অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন  বলেন, ‘উন্নয়নের সঙ্গে সাক্ষরতার হারও ব্যাপকভাবে বেড়েছে। দেশ স্বাধীনের পর বেশিরভাগ মানুষের অক্ষর জ্ঞান ছিল না। বর্তমানে সাক্ষরতার হার ৭০ থেকে ৮০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। প্রাইমারি স্কুলে এনরোলমেন্ট প্রায় শতভাগ। মাধ্যমিকেও অনেক বেড়েছে। শিক্ষায় নারীদের অংশগ্রহণ বেড়েছে। এটাও উন্নয়নের আরেকটা অর্জন।’

৫০ বছরে গড় আয়ু বেড়েছে ৩০ বছর

তিনি বলেন, স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সূচক যেটা ধরা হয়, সেটা হচ্ছে আয়ুষ্কাল। আগে যেখানে মানুষ ৪০-৪১ বছর বাঁচত এখন সেটা ৭০-এর ওপরে। তার মানে ৫০ বছরে গড় আয়ু ৩০ বছর বৃদ্ধি পেয়েছে। এগুলো উন্নয়নের চূড়ান্ত আউটকাম।’

কৃষির ওপর নির্ভরতা কমেছে

ড. জাহিদ হোসেন বলেন, ‘বাংলাদেশের অর্থনীতির কাঠামোগত রূপান্তর রয়েছে। যেমন আমাদের শুরুতে সম্পূর্ণ কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি ছিল। ওই সময় প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষ কৃষি কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করত। সেখান থেকে বর্তমানে কৃষি অর্থনীতি ৪০-৪২ শতাংশে নেমে এসেছে। এখন সেবা, শিল্প ও নির্মাণ খাতে জনগণের অংশগ্রহণ বেড়েছে। বর্তমানে কৃষির বহুমুখীকরণ করা হয়েছে। তার মানে কৃষিতে এখন আধুনিকায়ন হয়েছে, প্রযুক্তির ব্যবহার বেড়েছে। বাণিজ্যিক ভিত্তিতে কৃষির উৎপাদন হচ্ছে। স্বাধীনতার পর পাট ও চা ছিল প্রধান রফতানি আয়ের উৎস। সেখান থেকে সম্পূর্ণ সরে এসে শিল্পপণ্যভিত্তিক রফতানিতে রূপান্তরিত হয়েছে।’

মধ্যবিত্তের সামর্থ্যের মধ্যে আবাসন সুবিধা

এ অর্থনীতিবিদ বলেন, ‘আজকের ঢাকায় যে বড় বড় ভবন হচ্ছে এরই পরিপ্রেক্ষিতে মধ্যবিত্তরা ঘরের মালিকানার স্বপ্ন দেখতে পাচ্ছেন। আগে কিন্তু এরকম আবাসনের সুযোগ ছিল না। নির্মাণ খাতে একটা বড় ধরনের রূপান্তর ঘটেছে।’

বদলে গেছে যোগাযোগ ব্যবস্থা

‘স্বাধীনতার পর আমরা যখন ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম যেতাম তখন তিনটি ফেরি পার হতে হতো। এখন তো সরসরি গাড়িতে উঠে এক ঘুমেই চট্টগ্রাম পৌঁছানো যায়। এখন দেশের দক্ষিণ ও উত্তর দিকে যোগাযোগের সার্বিক উন্নয়ন হয়েছে। এছাড়া পদ্মা সেতু ও কর্ণফুলী টানেলের কাজ হয়ে গেলে যোগাযোগের একটা বিশাল নেটওয়ার্ক তৈরি হবে। অন্যদিকে গ্রামীণ অবকাঠামোয় গ্রামের রাস্তা এবং বিদ্যুতায়নে আমরা ব্যাপক উন্নয়ন দেখেছি’ যোগ করেন ড. জাহিদ হোসেন।

জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে অভাবনীয় সাফল্য

‘১৯৭১ সালে একটা বিষয় দুঃস্বপ্নের মতো ছিল। দেশের সাড়ে ৭ কোটি মানুষ ছিল। তখন বছরে তিন শতাংশ হারে জনসংখ্যা বাড়ছিল। এটাকে বলা হতো, ‘মালথোসিয়ান পভার্টি’।  তার মানে এইভাবে যদি জনসংখ্যা বাড়তে থাকে তাহলে দেশ দারিদ্র্যের ফাঁদে পড়ে থাকবে। ১৯৮০ সাল থেকে আমাদের জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি ব্যাপকভাবে নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ এক্ষেত্রে অভাবনীয় সাফল্য দেখিয়েছে।’

কমেছে দারিদ্র্য বিমোচনের গতি

দেশের এতো অর্জন টেকসই করার জন্য আমাদের করণীয় কী এমন প্রশ্নের জবাবে এই অর্থনীতিবিদ বলেন, ‘২০১০ সালের পর থেকে দারিদ্র্য বিমোচন হয়েছে, কিন্তু গতিটা কমে গেছে। ২০০৫ থেকে ২০১০ সালে ১.৮ শতাংশ হারে দেশে দারিদ্র্যের হার কমেছে। ২০১০ সালের পর থেকে এ হার প্রায় ১.২ শতাংশের কাছাকাছি নেমে এসেছে। এসডিজির লক্ষ্য অনুযায়ী ২০৩০ সালে হতদরিদ্র মানুষের সংখ্যা আমরা শূন্যের কাছাকাছি নিয়ে আসব। সেটা অর্জন করতে হলে, দারিদ্র্যের হার কমানোর গতি বাড়াতে হবে। দারিদ্র্য বিমোচনের হার ধরে রাখতে হবে। সেই ক্ষেত্রে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর আয় বাড়ানোর ব্যবস্থা করতে হবে।

তিনি বলেন, ‘বর্তমানে মডার্ন ইকোনমি ঢাকা ও চট্টগ্রামকেন্দ্রিক। দেশের ইকোনমি কেন্দ্রীভূত হয়ে গেছে। সেজন্য ঢাকা এখন বসবাস অযোগ্য শহরে পরিণত হয়েছে। অপরিকল্পিতভাবে নগরায়ণ হচ্ছে এবং নগরায়ণের বিস্তার ঘটছে না। সুতরাং নগরায়ণের ব্যবস্থাপনাটা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যেসব উপশহর গড়ে উঠছে সেগুলোয় যেন একই পরিণতি না হয়, সেদিকে নজর দিতে হবে। এজন্য পরিকল্পিত নগর উন্নয়নের বিকেন্দ্রীকরণ করা বিশাল চ্যালেঞ্জ।’

অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, ‘২০৪১ সালের মধ্যে উচ্চ আয়ের দেশে প্রবেশের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। সেখানে যেতে হলে প্রযুক্তির উন্নয়ন, ব্যক্তি ও সরকারি খাতের বিনিয়োগ প্রয়োজন হবে। এটা একটা বড় চ্যালেঞ্জ। এসবের সঙ্গে দক্ষ শ্রমশক্তির প্রয়োজন হবে। প্রযুক্তির সঙ্গে মিলতে হলে বিজ্ঞানের চর্চা বাড়াতে হবে। বিজ্ঞান চর্চা না করলে পরবর্তী সময়ে প্রযুক্তির সঙ্গে চলা কঠিন হয়ে যাবে। আমাদের শিক্ষার প্রসার ঠিকই হয়েছে কিন্তু মানের দিক থেকে এখনও পিছিয়ে আছি। বাংলাদেশে যেই শিক্ষা আমাদের সাড়ে ৬ বছরে পাওয়ার কথা, সেই শিক্ষা পেতে সময় লাগে ১১ বছর। কাজেই এখানেই সাড়ে চার বছরের ঘাটতি আছে। ঘাটতি থাকা মানে অতিরিক্ত ব্যয় করতে হচ্ছে। শিক্ষা ব্যবস্থার মান উন্নয়ন চ্যালেঞ্জ বলে মনে হয়।’

প্রখ্যাত এ অর্থনীতিবিদ বলেন, উন্নয়ন টেকসই করতে হলে, সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে এখনও সরকারি বা বেসরকারি খাত ব্যাপকভাবে দুর্নীতিগ্রস্ত। সরকারি বিভিন্ন খাতে দুর্নীতি হলেও প্রাপ্য সার্ভিসটা নিশ্চিত করতে হবে। আর এটা নিশ্চিত করতে পারলে দুর্নীতি থাকা সত্ত্বেও দেশ এগিয়ে যাবে।’

এসআর/এসকেডি/এমএমজে

Link copied