কূটনীতির মেরুকরণ: দিল্লি থেকে দূরে, ইসলামাবাদের কাছে ঢাকা?

পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের কূটনীতিতে এখন বইছে পরিবর্তনের নতুন হাওয়া। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার বিপ্লবের পর দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির পাশাপাশি আমূল বদলে গেছে আঞ্চলিক সম্পর্কের মানচিত্রও। দীর্ঘ দেড় দশকের একমুখী ধারার অবসান ঘটিয়ে ঢাকা এখন তার প্রতিবেশী ও বন্ধুদের সঙ্গে সম্পর্কের নতুন বয়ান লিখছে। তবে, এই অগ্রযাত্রায় একদিকে যেমন দিল্লির সঙ্গে তৈরি হয়েছে নজিরবিহীন কূটনৈতিক শীতলতা ও টানাপোড়েন, অন্যদিকে ইসলামাবাদের সঙ্গে তৈরি হচ্ছে দীর্ঘ দেড় যুগের স্থবিরতা ভাঙার নতুন সম্ভাবনা।
তবে, একাত্তরের গণহত্যার জন্য আনুষ্ঠানিক ক্ষমাপ্রার্থনা, প্রায় সাড়ে চার বিলিয়ন ডলার পাওনা পরিশোধ এবং আটকে পড়া পাকিস্তানি নাগরিকদের প্রত্যাবাসনের মতো অমীমাংসিত ইস্যুগুলো সামনে এলে কিছুটা অস্বস্তিতে পড়ছে ইসলামাবাদ।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকেই বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক একধরণের অস্বস্তির মধ্য দিয়ে এগোচ্ছে। যদিও গত ১৬ মাসে উভয় পক্ষ সম্পর্ক স্বাভাবিক করার কথা বলেছে, কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন। এক্ষেত্রে বরাবরই প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অবস্থান। এছাড়া, সম্প্রতি ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান হাদি এবং ময়মনসিংহে পোশাক শ্রমিক দীপু চন্দ্র দাস হত্যাকাণ্ডের ঘটনা দুই দেশের সম্পর্কে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।
সম্প্রতি ভারতে অবস্থিত বাংলাদেশের মিশনগুলোতে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। এর প্রতিবাদে দিল্লি ও আগরতলায় ভিসা ও কনস্যুলার সেবা বন্ধ করে দিয়েছে ঢাকা। অন্যদিকে, সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতনের অভিযোগ তুলে পশ্চিমবঙ্গের শিলিগুড়িতে বাংলাদেশের ভিসা কেন্দ্রে হামলা চালিয়েছে ভারতের হিন্দুত্ববাদী তিনটি সংগঠন, যার পরিপ্রেক্ষিতে কেন্দ্রটি অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ করে দেওয়া হয়। এছাড়া, চট্টগ্রামে ভারতীয় সহকারী হাইকমিশনেও হামলার ঘটনা ঘটেছে।

এসব ঘটনাকে কেন্দ্র করে দুই দেশের কূটনীতিকদের পাল্টাপাল্টি তলব দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে উত্তেজনা বাড়িয়েছে। গত দুই সপ্তাহের ব্যবধানে উভয় দেশ দুবার করে পরস্পরের দূতকে তলব করে প্রতিবাদ ও উদ্বেগ জানিয়েছে। সবশেষ ২৩ ডিসেম্বর সকালে ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মাকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে তলব করা হয়। এর প্রতিক্রিয়ায় ওই দিন বিকেলেই দিল্লিতে বাংলাদেশের হাইকমিশনার রিয়াজ হামিদুল্লাহকে তলব করে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। দুই দেশের সম্পর্কের ইতিহাসে একই দিনে দুই দূতকে পাল্টাপাল্টি তলবের ঘটনা এটিই প্রথম।
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশে ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তন ভারত সহজভাবে গ্রহণ করতে পারেনি। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে দেশটির আচরণ খুব একটা সহযোগিতামূলক ছিল না। বিভিন্ন সময়ে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টা চললেও দুই দেশের রাজনৈতিক নেতাদের বক্তব্য এবং শেখ হাসিনা ইস্যু বারবার বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আসন্ন জাতীয় নির্বাচন প্রসঙ্গে বিশ্লেষকরা বলছেন, নির্বাচনের আগে ভারতের সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের সম্পর্ক খুব বেশি স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা কম। পরবর্তী নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় আসার পর ভারত হয়তো তাদের সঙ্গে নতুন করে পথচলার কৌশল নির্ধারণ করবে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক কীভাবে চলছে— সেটি সবাই দেখতে পাচ্ছে। সম্পর্ক সবসময় একরকম যায়ও না। তবে, প্রতিবেশীর সঙ্গে বৈরী সম্পর্ক কারও জন্যই সুখকর নয়। সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে ভারতের দিক থেকে আরও বেশি আন্তরিকতা প্রয়োজন।
এদিকে, ৫ আগস্টের পর পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কে গতির সঞ্চার হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারপ্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনূস গত ১৬ মাসে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরীফের সঙ্গে তিনবার বৈঠক করেছেন। এছাড়া, পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন ও পাকিস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রী ইসহাক দারের মধ্যেও কয়েক দফা বৈঠক ও আলোচনা হয়েছে।

আওয়ামী লীগের টানা ১৫ বছরের শাসনামলে পাকিস্তানের কোনো মন্ত্রীর দ্বিপাক্ষিক সফর না হলেও গত এক বছরে দেশটির চারজন মন্ত্রী বাংলাদেশ সফর করেছেন।
আওয়ামী লীগের দেড় দশকের শাসনকালে এক হিনা রাব্বানি খাঁর ছাড়া পাকিস্তানের আর কোনো মন্ত্রীর বাংলাদেশ সফর হয়নি। তিনি ২০১২ ও ২০২২ সালে দুবার ঢাকায় এলেও কোনোটিই দ্বিপক্ষীয় সফর ছিল না। অথচ ২০২৪-এর পটপরিবর্তনের পর দেশটির চারজন মন্ত্রী বাংলাদেশ সফর করেছেন।
সম্পর্ক পুনরুজ্জীবনের প্রথম ধাপ হিসেবে গত এপ্রিলে পররাষ্ট্রসচিবদের বৈঠকে অংশ নিতে ঢাকায় এসেছিলেন পাকিস্তানের পররাষ্ট্রসচিব আমনা বালুচ। এরপর আগস্টে দুই দিনের ব্যবধানে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নিয়ে আলোচনার জন্য ঢাকায় এসেছিলেন পাকিস্তানের বাণিজ্যমন্ত্রী জাম কামাল খান এবং উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার। গত জুলাইয়ে ঢাকায় এসেছিলেন পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন রাজা নকভি।
দুই দশক পর গত ২৭ অক্টোবর ঢাকায় বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের যৌথ অর্থনৈতিক কমিশনের (জেইসি) নবম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। দীর্ঘ বিরতির পর অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে নেতৃত্ব দিতে ঢাকা সফর করেছিলেন পাকিস্তানের পেট্রোলিয়ামমন্ত্রী আলী পারভেজ মালিক। এছাড়া, পাকিস্তান নৌবাহিনীপ্রধান এডমিরাল নাভিদ আশরাফ ছাড়াও দেশটি আরও কয়েকটি প্রতিনিধিদল ঢাকা সফর করেছিলেন।
এই সময়ের মধ্যে বাংলাদেশের ধর্ম উপদেষ্টা আ ফ ম খালিদ হোসেন পাকিস্তান সফরে গিয়েছিলেন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব নাসিমুল গণি, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর শীর্ষপর্যায়ের একটি প্রতিনিধিদল ছাড়াও প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ড. আনিসুজ্জামান চৌধুরী পাকিস্তান সফরে গিয়েছেন।
সম্প্রতি পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়ে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন বলেন, বিগত সরকার ইচ্ছাকৃতভাবে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ রেখেছিল। আমরা কেবল একটি স্বাভাবিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করতে চাই। ‘কিছু সিদ্ধান্ত ছিল, যার কারণে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক আগের তুলনায় অবনতি হয়েছিল। ২০০৯ সালের আগে পাকিস্তানের সঙ্গে আমাদের যেসব বিষয় ছিল, তাতে কোনো পরিবর্তন হয়নি পরবর্তী ১৫ বছরে। বলতে পারেন, ক্ষমা চায়নি, সম্পদ ভাগাভাগির ইস্যু আছে। এটা তো আগেও হয়নি, পরেও হয়নি। কিন্তু এই সময়টাতে ইচ্ছাকৃতভাবে কিছু সিদ্ধান্ত নিয়ে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ করা হয়েছিল।’
‘আমাদের সিদ্ধান্ত ছিল— পাকিস্তানের সঙ্গে একটা স্বাভাবিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করব, অতিরিক্ত কোনো কিছু না। আমাদের আমদানি-রপ্তানির ক্ষেত্রে যদি বিকল্প একটি উৎস থাকে, সেটা তো মনে হয় আমাদের স্বার্থেই আসে। আমরা তো পাকিস্তান থেকে তুলা আনতে পারি, পেঁয়াজও এসেছে যখন ঘাটতি ছিল। এবার তো ঘাটতি নেই। কাজেই যখন সংকট থাকে, তখন একাধিক সোর্স থাকলে আমাদের জন্যই সুবিধা।’
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, ‘ফেব্রুয়ারিতে সংসদ নির্বাচন। সময় খুব কম। নির্বাচনের আগে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক আমূল পরিবর্তনের সুযোগ কম। তবে, রুটিন কাজগুলো সচল রাখা প্রয়োজন। আর পাকিস্তানের সঙ্গে অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হওয়ার সুযোগ থাকলে তা গ্রহণ করা উচিত। তবে, একই সঙ্গে অমীমাংসিত ঐতিহাসিক ইস্যুগুলো সমাধানের প্রচেষ্টাও অব্যাহত রাখতে হবে।’
এনআই/
