২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার বিপ্লবের পর থেকে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের টানাপোড়েন চলছে। সম্প্রতি সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মৃত্যু উপলক্ষ্যে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের ঢাকা সফর ইতিবাচক বার্তা দিলেও দুই দেশের সম্পর্কে আবারও তিক্ততা দেখা দিয়েছে। এবার এর উপলক্ষ্য ক্রিকেট।
বাংলাদেশি পেসার মোস্তাফিজুর রহমান এবারের আইপিএলে কলকাতা নাইট রাইডার্সের (কেকেআর) হয়ে খেলার কথা ছিল। তবে গত ৩ জানুয়ারি ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড বিসিসিআইয়ের নির্দেশে মোস্তাফিজকে দল থেকে বাদ দিয়েছে কেকেআর। এমন সিদ্ধান্তে বাংলাদেশে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া হয়েছে। এই ঘটনার জেরে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ খেলতে ভারতে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিসিবি। সবশেষ খবর হলো, আইসিসি বাংলাদেশের কাছে সুনির্দিষ্টভাবে জানতে চেয়েছে নিরাপত্তা উদ্বেগের বিষয়ে।

মোস্তাফিজুর রহমানকে বাদ দেওয়ার প্রতিক্রিয়ায় বাংলাদেশে আইপিএল সম্প্রচার বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়। গত সোমবার মন্ত্রণালয় থেকে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সম্প্রচার মাধ্যমগুলোকে চিঠি দেওয়া হয়।
চিঠিতে বলা হয়, ‘ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড আগামী ২৬ মার্চ থেকে অনুষ্ঠেয় ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ (আইপিএল) ক্রিকেট খেলায় বাংলাদেশের তারকা খেলোয়াড় মোস্তাফিজুর রহমানকে কলকাতা নাইট রাইডার্স দল থেকে বাদ দেওয়ার নির্দেশ দৃষ্টিগোচর হয়েছে। ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের এই সিদ্ধান্তের কোনো যৌক্তিক কারণ জানা নেই। এমন সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের জনগণকে ব্যথিত, মর্মাহত ও ক্ষুব্ধ করেছে। এ অবস্থায় পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত আইপিএলের সব খেলা এবং অনুষ্ঠান প্রচার বা সম্প্রচার বন্ধ রাখার জন্য অনুরোধ করা হলো।’

মোস্তাফিজ ইস্যুতে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের সমালোচনা হয়েছে ভারতেও। দেশটির সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী, কংগ্রেস নেতা ও লোকসভার সদস্য শশী থারুর প্রশ্ন তুলেছেন, ‘আমরা আসলে কাকে শাস্তি দিচ্ছি—একটি দেশকে, একজন ব্যক্তিকে নাকি তার ধর্মকে।’
ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর সঙ্গে আলাপকালে থারুর বলেন, খেলাধুলাকে রাজনীতি থেকে আলাদা রাখার ওপর জোর দিয়ে তিনি এই মন্তব্য করেছেন।
তিনি বলেন, 'বাংলাদেশ পাকিস্তান নয়। বাংলাদেশ সীমান্ত দিয়ে সন্ত্রাসী পাঠায় না। এই দুই দেশের পরিস্থিতি কোনোভাবেই এক নয়। তাছাড়া এই দুই দেশের সাথে আমাদের সম্পর্কও ভিন্ন রকম। বাংলাদেশের সঙ্গে আমাদের কূটনৈতিক আলোচনা বা সম্পর্কের পর্যায় পাকিস্তানের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা। আপনি এই দুই দেশকে একটি সাধারণ সমীকরণে মেলাতে পারেন না।'
৫ আগস্টের পর থেকেই সম্পর্কে অস্বস্তি
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকেই বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক এক ধরনের অস্বস্তির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। যদিও গত ১৬ মাসে উভয় পক্ষ সম্পর্ক স্বাভাবিক করার কথা বলেছে, কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন। এক্ষেত্রে বরাবরই প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান। এছাড়া, সম্প্রতি ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান হাদি এবং ময়মনসিংহে পোশাক শ্রমিক দীপু চন্দ্র দাস হত্যাকাণ্ডের ঘটনা দুই দেশের সম্পর্কে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।
সম্প্রতি ভারতে অবস্থিত বাংলাদেশের মিশনগুলোতে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। এর প্রতিবাদে দিল্লি ও আগরতলায় ভিসা ও কনস্যুলার সেবা বন্ধ করে দিয়েছে ঢাকা। অন্যদিকে, সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতনের অভিযোগ তুলে পশ্চিমবঙ্গের শিলিগুড়িতে বাংলাদেশের ভিসা কেন্দ্রে হামলা চালিয়েছে ভারতের হিন্দুত্ববাদী তিনটি সংগঠন, যার পরিপ্রেক্ষিতে কেন্দ্রটি অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এছাড়া, বাংলাদেশে চট্টগ্রামে ভারতীয় সহকারী হাইকমিশনেও হামলার ঘটনা ঘটেছে।

এসব ঘটনাকে কেন্দ্র করে দুই দেশের কূটনীতিকদের পাল্টাপাল্টি তলব দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে উত্তেজনা বাড়িয়েছে। ডিসেম্বরে দুই সপ্তাহের ব্যবধানে উভয় দেশ দুবার করে পরস্পরের দূতকে তলব করে প্রতিবাদ ও উদ্বেগ জানিয়েছে। সবশেষ ২৩ ডিসেম্বর সকালে ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মাকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে তলব করা হয়। এর প্রতিক্রিয়ায় ওই দিন বিকেলেই দিল্লিতে বাংলাদেশের হাইকমিশনার রিয়াজ হামিদুল্লাহকে তলব করে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। দুই দেশের সম্পর্কের ইতিহাসে একই দিনে দুই দূতকে পাল্টাপাল্টি তলবের ঘটনা এটিই প্রথম।
এরপর অবশ্য ঢাকা-দিল্লির সম্পর্কে টানাপোড়েন কিছুটা হলেও কমানোর সুযোগ আসে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া ইস্যুতে। সম্প্রতি তার প্রয়াণের পর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বার্তা নিয়ে খালেদা জিয়াকে শ্রদ্ধা জানাতে ঢাকায় আসেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর। তিনি ঢাকা সফরে এসে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছন এবং মোদির শোকবার্তা পৌঁছে দেন।
কূটনৈতিক মহলসহ বিভিন্ন পর্যায়ে ভারতের এমন ইতিবাচক মনোভাবের প্রশংসা শোনা গেছে। আগামী দিনে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক কেমন হবে- তা নিয়েও চলছিল নানা আলোচনা। তবে আইপিএলে মোস্তাফিজকে বাদ দেওয়ায় আবার পুরোনো তিক্ততা ফিরে এলো।
এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে চাইলে চীনে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সী ফয়েজ আহমেদ ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘প্রতিবেশীকে পাল্টানোর সুযোগ নেই। বাংলাদেশের যেমন ভারতকে দরকার, তেমনি ভারতেরও বাংলাদেশকে দরকার। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক ভালো যাচ্ছে না। এর কারণ হিসেবে আমার মনে হচ্ছে দুই পক্ষের আন্তরিকতার অভাব রয়েছে। মোস্তাফিজকে দল থেকে বাদ দেওয়া নিয়ে ভারতীয়রাও কথা বলছেন। সবকিছুর মধ্যে রাজনীতি টেনে আনাটা ঠিক হচ্ছে না।’
সম্পর্কে তিক্তার প্রভাব সীমান্তে?
গত ১৭ মাসে অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের তিক্ততার প্রভাব পড়েছে সীমান্তে। এই সময়ে সীমান্তে হত্যার পরিমাণ বেড়েছে। ২০২৫ সালে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) ও ভারতের নাগরিকদের হাতে বাংলাদেশিদের হত্যার সংখ্যা গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ।
মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে বিএসএফের হাতে ৩৪ জন বাংলাদেশি নিহত হন। এর মধ্যে ২৪ জন গুলিতে এবং ১০ জন নির্যাতনের ফলে মারা যান। আগের বছরগুলোতে নিহতের সংখ্যা ছিল ২০২৪ সালে ৩০, ২০২৩ সালে ৩১, ২০২২ সালে ২৩ এবং ২০২১ সালে ১৮।
এছাড়া, ২০২৫ সালে সিলেট সীমান্ত এলাকায় ভারতের নাগরিকদের, বিশেষ করে খাসি জনগোষ্ঠীর সদস্যদের হাতে অন্তত ১২ জন বাংলাদেশি নিহত হওয়ার খবর এসেছে গণমাধ্যমে।
সবশেষ, চাঁপাইনবাবগঞ্জের সদর উপজেলার নারায়নপুর ইউনিয়নের জহুরপুরটেক সীমান্ত দিয়ে ভারতে যাওয়ার পর পদ্মা নদীর ভারতীয় জলসীমায় বিএসএফর হাতে আটকের পর রবিউল নামে এক বাংলাদেশির মৃত্যু হয়েছে।

প্রভাব পড়েছে বাণিজ্যেও
এছাড়া, সম্পর্কের তিক্ততায় গত এক বছরে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক সম্পর্কের আশানুরূপ উন্নতি হয়নি। নানা প্রতিবন্ধকতায় বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে আমদানি-রপ্তানির পরিমাণ কমেছে।
গত অর্থবছরে তার আগের বছরের তুলনায় বেনাপোল বন্দরে আমদানি কমেছে ৭৫ হাজার ৭৪৬ মেট্রিক টন এবং রপ্তানি কমেছে ৭৫ হাজার ২৩২ মেট্রিক টন। রেলপথেও বাণিজ্য কমেছে ২৯ হাজার মেট্রিক টন। বেনাপোল কাস্টমসের তথ্য বলছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ভারত থেকে আমদানি হয়েছে ২০ লাখ ৩৮ হাজার ৭৮০ মেট্রিক টন পণ্য। আগের বছর ২০২৩-২৪ অর্থবছরে আমদানির পরিমাণ ছিল ২১ লাখ ১৪ হাজার ৫০৯ মেট্রিক টন।

নির্বাচিত সরকারের অপেক্ষা!
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ এ প্রসঙ্গে ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক খুব একটা ভালো গেছে, সেটা বলার সুযোগ নেই। নানা কারণে সম্পর্কে তিক্ততা দেখা গেছে। হয়তো কখনো কখনো কিছু ইস্যুতে মনে হয়েছে 'এই বুঝি সম্পর্ক ভালোর দিকে যাবে', কিন্তু যায়নি। যেমন- খালেদা জিয়াকে শ্রদ্ধা জানাতে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্করের ঢাকা সফর ইতিবাচক সাইন ছিল। তার সফরের পরই দেখা গেলো বিসিসিআইয়ের নির্দেশে মোস্তাফিজকে দল থেকে বাদ দিয়েছে কলকাতা।’
তিনি বলেন, ‘আমার মনে হয় না নির্বাচনের আগে ভারতের সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের সম্পর্ক ইতিবাচক দিকে যাবে। নির্বাচিত সরকার এলে ভারত সামনে এগোবে।’
এনআই/এমএন