৩১ বছরেও বাসযোগ্য নয় পূর্বাচল, ব্যর্থতার বোঝা বইছেন প্লট মালিকরা

ঢাকার আবাসন সংকটের সমাধান হিসেবে নেওয়া পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্প ৩১ বছরেও পুরোপুরি বাসযোগ্য হয়নি। মৌলিক নাগরিক সুবিধা, অবকাঠামো ও নিরাপত্তার অভাবে প্লট মালিকরা যেমন হতাশ, তেমনি প্রকল্প বাস্তবায়নে রাজউকের দীর্ঘসূত্রিতাও নতুন করে প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
৬ হাজার ১৫০ একর জমির ওপর গড়ে তোলা এই মেগা প্রকল্পের কাজ শুরু হয় ১৯৯৫ সালে। প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০১৩ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের কথা ছিল। পরিকল্পনায় ৩০টি সেক্টরে ২৬ হাজার আবাসিক প্লট থাকলেও এখন পর্যন্ত প্রায় ২১ হাজার প্লট হস্তান্তর করা হয়েছে। তবে বাস্তবে নির্মাণকাজ শুরু হয়েছে মাত্র তিন শতাধিক প্লটে। প্রকল্প বাস্তবায়নে এ পর্যন্ত পাঁচবার নকশা পরিবর্তন এবং সাত দফা মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। সর্বশেষ সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছিল ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। তবুও এখনো পূর্বাচল পুরোপুরি বসবাস উপযোগী হয়নি।
প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হলেও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও কার্যকর সড়ক ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। পানি, বিদ্যুৎ ও গ্যাসসহ মৌলিক নাগরিক সুবিধার অভাবে বসতি স্থাপন করতে গিয়ে নানা ভোগান্তির মুখে পড়ছেন প্লট মালিকরা। এই অবস্থায় পূর্বাচলকে বাসযোগ্য করে তুলতে নতুন করে আরও প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকার একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে রাজউক। এ লক্ষ্যে একটি উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে।
প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট নথি অনুযায়ী, পূর্বাচল উন্নয়ন প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে ৮ হাজার ৮৭০ কোটি ৩৮ লাখ টাকা। উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবে (ডিপিপি) ভূমি উন্নয়ন, সড়ক প্রশস্তকরণ, ফুটপাত নির্মাণ, মসজিদ, মন্দির, মার্কেট ও খেলার মাঠসহ মোট ১২টি খাতে ব্যয়ের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। তিন দশক পেরিয়েও ভূমি উন্নয়ন সম্পন্ন না হওয়ায় এই খাতে নতুন করে ১৮৭ কোটি টাকা বরাদ্দ ধরা হয়েছে।
পূর্বাচল নতুন শহরকে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) আওতায় আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এর পরিপ্রেক্ষিতে ডিএমপি পূর্বাচলের জন্য ৪টি থানা, ৬টি পুলিশ ফাঁড়ি ও ৪১টি পুলিশ বক্স চালুর লক্ষ্যে জনবল চেয়ে পুলিশ সদর দপ্তরে প্রস্তাব পাঠিয়েছে। পুলিশ সদর দপ্তর থেকে প্রস্তাবটি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে
ডিপিপিতে ৩৩৭ কিলোমিটার সড়ক প্রশস্ত ও মজবুত করতে ১ হাজার ৫১১ কোটি টাকা এবং প্রায় ৩২১ কিলোমিটার নতুন সড়ক নির্মাণে ৩২৩ কোটি টাকা ব্যয়ের প্রস্তাব রয়েছে। জলাবদ্ধতা নিরসনে ১০টি স্লুইচগেট ও একটি বক্স কালভার্ট নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে ১৬১ কোটি টাকা। পাশাপাশি ২০ হাজার ২১৩ দশমিক ৭ বর্গমিটার আয়তনের আবাসিক ভবন নির্মাণে ১৪০ কোটি টাকা ব্যয়ের পরিকল্পনা করা হয়েছে।

ডিপিপি অনুযায়ী, ২৭৬টি মসজিদ ও তিনটি অন্যান্য ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে ৭৬৭ কোটি টাকা। এ ছাড়া আনসার ব্যারাক নির্মাণে ১৩ কোটি টাকা এবং ৩৬৩ কিলোমিটার স্ট্রিট লাইট স্থাপনে ৫৪৫ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব রয়েছে। ১৯টি কাঁচাবাজার নির্মাণে ধরা হয়েছে ১ হাজার ৩৪০ কোটি টাকা। শিক্ষার্থীদের জন্য আধুনিক ও মানসম্মত শিক্ষা ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে ২৮৮ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হবে রাজউক পূর্বাচল স্কুল অ্যান্ড কলেজ। এই প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার সময় নির্ধারণ করা হয়েছে ২০২৮ সালের জুন মাস।
এদিকে পূর্বাচল নতুন শহরকে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) আওতায় আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এর পরিপ্রেক্ষিতে ডিএমপি পূর্বাচলের জন্য ৪টি থানা, ৬টি পুলিশ ফাঁড়ি ও ৪১টি পুলিশ বক্স চালুর লক্ষ্যে জনবল চেয়ে পুলিশ সদর দপ্তরে প্রস্তাব পাঠিয়েছে। পুলিশ সদর দপ্তর থেকে প্রস্তাবটি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে।
রাজউক ও ডিএমপি সদর দপ্তর সূত্র জানায়, এর আগে আন্তমন্ত্রণালয় বৈঠকে পূর্বাচল নতুন শহরে থানা, পুলিশ ফাঁড়ি ও পুলিশ বক্স চালুর পাশাপাশি স্কুল, কলেজ ও হাসপাতাল চালুর বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়।
তবে বাস্তব চিত্র ভিন্ন। তিন দশক পেরিয়ে গেলেও পূর্বাচলে গ্যাস সংযোগ, সড়কবাতি, খেলার মাঠ, হাসপাতাল, স্কুল কিংবা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যক্রম কার্যত অনুপস্থিত। প্রকল্পে ৯৪টি মসজিদের জমি, ৪টি থানা ও ৬টি পুলিশ ফাঁড়ির স্থান নির্ধারণ করা হলেও সেগুলোর কোনোটি বাস্তবায়ন হয়নি। পার্ক, ফুটপাত ও কমিউনিটি স্পেস এখনো নকশার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। খালি পড়ে থাকা এলাকাগুলো অযত্নে পড়ে আছে। সড়কবাতি না থাকায় সন্ধ্যার পর পুরো এলাকায় নেমে আসে ঘন অন্ধকার।

এমন পরিস্থিতিতে পূর্বাচলের ১, ২ ও ৩ নম্বর সেক্টরে বাড়ি নির্মাণে চাপ দিচ্ছে রাজউক। সংস্থাটি বলছে, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (ভূমি, প্লট, স্পেস ও ফ্ল্যাট বরাদ্দ) বিধিমালা, ২০২৪-এর ধারা ৯ অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বাড়ি নির্মাণ বাধ্যতামূলক।
বরাদ্দগ্রহীতারা প্লটের ইজারা বা লিজ দলিল নিবন্ধন সম্পন্ন করার পর পানি সরবরাহসহ অন্যান্য নাগরিক সুবিধার জন্য সংশ্লিষ্ট সংস্থায় আবেদন করতে পারবেন। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বাধ্যবাধকতা না মানলে প্লট বাতিলের হুঁশিয়ারিও দিয়েছে রাজউক। সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, পূর্বাচলের ১ নম্বর সেক্টরে ৫২৯টি, ২ নম্বর সেক্টরে ৯০৫টি এবং ৩ নম্বর সেক্টরে ৮০৪টি আবাসিক প্লট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
পূর্বাচলের ৭ কাঠার একটি প্লটের মালিক হাবিবুর রহমান। তিনি অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা। তিনি বলেন, অনেক আগে পূর্বাচলে প্লট কিনেছি, কিন্তু সেখানকার পরিবেশের কারণে এখনো বাড়ি নির্মাণের সাহস পাচ্ছি না। বেশিরভাগ এলাকা ফাঁকা থাকায় নিরাপত্তাহীনতার আশঙ্কা রয়েছে। পাশাপাশি বসবাস উপযোগী না হওয়ার অন্যতম কারণ হলো পানি, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহের ঘাটতি। যদি সব প্লট মালিক একসঙ্গে বাড়ি নির্মাণ শুরু করতেন, তাহলে অন্যরাও উৎসাহ পেতেন। কিন্তু রাজউক এখনো সে ধরনের পরিবেশ তৈরি করতে পারেনি। এ বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া উচিত বলে তিনি মনে করেন।

আরেক প্লট মালিক আবুল কাশেম বলেন, প্রায় তিন বছর আগে দুইতলা বাড়ি নির্মাণ শেষ করলেও এখনো সেখানে বসবাস শুরু করতে পারিনি। কারণ এলাকার বেশিরভাগ জায়গাই এখনো ফাঁকা। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও সন্তোষজনক নয়। চারপাশ ফাঁকা থাকায় পরিবার নিয়ে বসবাস শুরু করা সম্ভব হচ্ছে না। পাশাপাশি নাগরিক সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থাও এখনো নিশ্চিত করতে পারেনি রাজউক।
পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্প প্রসঙ্গে নগরপরিকল্পনাবিদ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, নাগরিক সেবা নিশ্চিত না হলে প্লট গ্রহীতারা বাড়ি নির্মাণে আগ্রহী হবেন না, এটাই স্বাভাবিক। রাজউকের উচিত ছিল শুরুতেই নিজেদের সক্ষমতা বিশ্লেষণ করা। তার মতে, প্লট বিক্রির বদলে ফ্ল্যাট নির্মাণ করে বিক্রি করলে আবাসন সমস্যা সমাধানে এ প্রকল্প কিছুটা হলেও কার্যকর হতে পারত। কিন্তু রাজউক তা না করে প্লট বরাদ্দ দিচ্ছে।
তিনি বলেন, প্রকল্পের নকশা বারবার পরিবর্তনের কারণেও দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও পূর্বাচল এখনো পুরোপুরি বাসযোগ্য হয়ে ওঠেনি। এর দায়ভার রাজউককেই নিতে হবে।
রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার মো. রিয়াজুল ইসলাম বলেন, পূর্বাচলকে বাসযোগ্য করে তুলতে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। পূর্বাচল নতুন শহরকে দ্রুত একটি সুন্দর ও বসবাসযোগ্য এলাকা হিসেবে দেশবাসীর সামনে তুলে ধরতে রাজউক কাজ করে যাচ্ছে। এ লক্ষ্যেই পূর্বাচল নতুন শহরের অবকাঠামো উন্নয়নে নতুন প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে।
জানা গেছে, নতুন পরিকল্পনা অনুযায়ী পুরো পূর্বাচল এলাকাকে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) আওতায় আনা হবে। সেখানে চারটি থানা, ছয়টি পুলিশ ফাঁড়ি ও ৪১টি পুলিশ বক্সসহ একটি পূর্ণাঙ্গ ও স্বয়ংসম্পূর্ণ পুলিশ কাঠামো গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। এই বিশাল কাঠামো পরিচালনার জন্য ৬ হাজার ৫২৪টি নতুন পদ সৃষ্টির প্রস্তাব করা হয়েছে।
পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পে ভবিষ্যতে ৩০ থেকে ৪০ লাখ মানুষের বসবাসের সম্ভাবনা রয়েছে। এখানে সরকারি আবাসন, কূটনৈতিক এলাকা, আন্তর্জাতিক মানের বাণিজ্যিক হাব, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। এসব বিবেচনায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পুলিশ শাখা থেকে শুরু থেকেই পুরো এলাকাকে ডিএমপির পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে এনে আধুনিক নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, পূর্বাচলে অপরাধ প্রতিরোধ, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, জরুরি সাড়া নিশ্চিত করা এবং ভবিষ্যৎ সন্ত্রাসঝুঁকি মোকাবিলায় এই বিস্তৃত পুলিশ অবকাঠামো অপরিহার্য। পুরো এলাকাকে ডিএমপির আওতায় আনতে প্রয়োজন হবে প্রশাসনিক অনুমোদন।
প্রস্তাবনা অনুযায়ী, পূর্বাচল নতুন শহরে পুলিশের একটি অপরাধ বিভাগ, একটি গোয়েন্দা বিভাগ, একটি ট্রাফিক বিভাগ, একটি পাবলিক অর্ডার ম্যানেজমেন্ট বিভাগ, একটি পরিবহন বিভাগ, একটি পুলিশ লাইনস, একটি এমআইএস বা আইটি ইউনিট, দুটি অপরাধ জোন, চারটি ট্রাফিক জোন, চারটি থানা, ছয়টি পুলিশ ফাঁড়ি ও ৪১টি পুলিশ বক্স স্থাপন করা হবে। এ কাঠামোর জন্য ডিএমপির সাংগঠনিক ব্যবস্থায় ৬ হাজার ৫২৪টি নতুন পদ সৃজন এবং বিপুলসংখ্যক যানবাহন টিওঅ্যান্ডইভুক্ত করার প্রস্তাব রয়েছে।
এএসএস/এমএসএ
